সোলাইমানির হত্যা ইরাক-ইরানের ঐক্য বাড়াল!

মানবকণ্ঠ
কাশেম সোলাইমানি - ছবি : সংগৃহীত।

poisha bazar

  • আরিফুল ইসলাম সাব্বির
  • ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৬:৩৩,  আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৬:৪০

ইরানি সামরিক কমান্ডার নিহতের পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই উত্তেজনা যুদ্ধে রূপ নেবে কি না তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস বা তাদের লড়াইয়ের মোটো থেকে জানা যায়, তাদের এই লড়াই মোটেই কোন আধিপত্যবাদী যুদ্ধ নয়। বরং ইসলামি বিপ্লব থেকে জন্ম নেয়া দেশটি নিজেদের জাতীয়তাবাদকে সুসংহত রাখতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিজেদের বন্ধুত্ব ছড়িয়ে দেয়ার কাজই করেছে। একারণেই সক্ষমতা থাকা সত্বেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোকে এড়িয়ে গিয়েছে ইরান।

ফলে আমেরিকার কাছে লড়াইটা যেখানে দখলদারিত্বের সেখানে ইরানের লড়াই প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের কাঁধকে শক্তিশালী করে নেয়া, নিজের পক্ষে নিয়ে নেয়া। এবং এরমধ্য দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখা। ইরানের নিহত কমান্ডার হাজী কাশেম এতোদিন সেই কাজটিই করেছেন অনুঘটক হিসেবে।

বাগদাদে ৩ জানুয়ারি এমনই এক বার্তা বহন করছিলেন ইরানি এই সামরিক কর্মকর্তা। কিন্তু ড্রোন হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে মার্কিন বাহিনী। ইরাকে সোলাইমানির কফিন থাকতেই সেখানকার প্রেসিডেন্ট জানান, 'ইরাকের মাধ্যমে ইরানকে সৌদি যে বার্তা দিয়েছিলো, সেই বার্তার জবাব বহন করছিলেন সোলাইমানি'।

পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-সৌদি বিরোধিতার ঘটনা সবাই জানেন। তবে সেই বিরোধ হয়তো নিকট ভবিষ্যতে প্রশমন হতে পারতো। আগেই বলেছি, ইরানের রাজনীতি দখলদারির নয়। বরং অবরোধের মধ্যেও তারা নিজেদের অর্থনীতিকে আশেপাশে ছড়িয়ে দিতে কাজ করে গেছে দেশটি। মাত্র ৩০ বছর আগেও ইরান-ইরাক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে লাখো মানুষের রক্ত ঝড়িয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে বৈরিতাই থাকার কথা ছিলো। কিন্ত সেখান থেকে এই দশকে এসে দুই দেশের সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌছেছে যে ইরাকের লাখ লাখ সাধারণ জনতা সোলাইমানির মৃত্যুতে রাজপথে নেমে এসেছে, কেঁদেছে, মাতম করেছে। চিরবৈরীতা থেকে জনগণের এমন শোকাভিভূত হওয়ার ঘটনা নিশ্চয়ই বড় অর্থবহ। এমন কূটনৈতিক কারিশমা পুরো বিশ্ব ইতিহাসেই বিরল।

ফলে গুপ্তহত্যার মধ্য দিয়ে সোলাইমানি নিহত হয়ে ওই অঞ্চলের মুক্তিকামী জনতার আদর্শ হয়ে উঠেছেন। সোলাইমানির মৃত্যুর পর সৌদির প্রভাবশালী পত্রিকা আল আরাবিয়া বলেছে, 'একজন সন্ত্রাসীর মৃত্যু হয়েছে। সে আর কাউকে হত্যা করতে পারবে না'। তবে সেই বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের মুক্তিকামী জনতার মাতমের মিছিল। তারা সোলাইমানির মতো করে নিজেকে গড়ে তোলার স্লোগান দিয়েছেন।

গত দুই বা তিন দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন ইরানি রেভ্যুলেশনারী গার্ডের প্রধান কমান্ডার কাশেম সোলাইমানি। তিনি যতটা না সামরিক কর্মকর্তা তার চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছেন কূটনীতিক হিসেবে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোয়।

ফলে যেখানে পরমানু কার্যক্রম চালানোর মধ্য দিয়ে ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলে ইরান নিজেকে আধিপত্যবাদী বা যুদ্ধবাজ করে গড়ে তুলেছিলো বলে ভয়ের উদ্রেক হয়েছিলো। সেই আধিপত্যবাদের ভয়কে ছাড়িয়ে ধর্মকে সামনে রেখে শান্তিকামী জনগণের সঙ্গে ব্যবসার সম্পর্ক ও প্রতিবেশী দেশের বিপদের দিনে পাশে দাড়িয়ে ভয় দূর করে আস্থাশীল বন্ধুর প্রমান দিয়েছে ইরান। আর সেই আস্থা রাখ সবার কাছে পৌছেছেন যে দূত তিনিই সোলাইমানি।

নিজেদের জাতীয়তাবাদকে টিকিয়ে রাখতে, খোমেনি (রহঃ) এর ইসলামি ইরানকে নিরাপদ করতে মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামি আদর্শের জোট গড়ে তুলতে কাজ করেছে ইরান। ফলে দেশটি সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে কূটনৈতিক তৎপরতায় ভরসা রেখেছে। অপরদিকে প্রতিবেশী বন্ধুদের সহযোগিতা করে মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন।

একারণেই হাজী কাশেমের মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাভি, ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান ইসমাইল হানিয়া, কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুর রহমান আলে সানি, ইরানের প্রভাবশালী আলেম ও তেহরানের জুমা নামাজের অস্থায়ী খতিব আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমাদ খাতামি, লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ'র মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ, বাহরাইনের প্রভাবশালী শীর্ষ আলেম শেখ ইসা কাসিম। ইরানের পাশে প্রকাশ্যে এতো সরাসরি এর আগে কেউ কখনো দাড়ায়নি।

এছাড়া সোলাইমানির মৃত্যুতে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ হয়েছে ইয়েমেন, খোদ যুক্তরাষ্ট্র, লেবাননসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। রাশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশ সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ইরানের জাতীয়তাবাদী জনতার প্রতি। হত্যাকাণ্ডের পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা না পাওয়ার কথা। সবমিলিয়ে একজন জেনারেলকে হারানোর মধ্য দিয়ে ইরানের যতটা ক্ষতি, তার সঙ্গে অনেকটা লাভ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সুসংহত করার লড়াইয়ে। যেখানে পৃথিবীর মুক্তিকামী বহু মানুষের হৃদয় সমব্যথী হয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনির চোখের জলের মতো করে। এখানে পরাজয় ঘটেছে আমেরিকার।

ইরাক ঐতিহাসিকভাবেই সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। সে শত্রুকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে দ্বিতীয় শক্তি দিয়ে। সেই যুদ্ধ চলমানই ছিলো। ফলে তার কাছে নতুন করে যুদ্ধ আহ্বান বা সাড়া দেয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই।

বরং ইরান মনযোগ দেবে নিজেদের জাতীয়তাবাদকে টিকিয়ে রাখতে যে লড়াই তাকে এগিয়ে নিতে সমব্যথী জনতাকে এক ধারায় নিয়ে আসার। এরমধ্যে দিয়ে নিজেরা নিরাপদ হবে এবং প্রতিবেশীদেরকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসবে। যে লড়াই হাজী কাশেম আমৃত্যু করে গেছেন।

ইরাকে ভুয়া অভিযোগে সাদ্দাম সরকার উৎখাত বা হালের আইএসের কাছ থেকে গোপনে তেল কেনার ঘটনা ও আইএসের সঙ্গে মার্কিন যোগাযোগের খবর এখন ওপেন সিক্রেট। ইরানি-রাশান ও সিরিয়ান মিলিশিয়ার অব্যাহত হামলায় আইএসের পতনের পরে ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যে যে স্থিতাবস্থা আসা শুরু করেছিলো তা মার্কিনিদের প্রধান দুই ব্যবসার জন্য ক্ষতিকারক ছিলো। যুদ্ধ থাকলেই আরবদের কাছে সহজে অস্ত্র বিক্রি করা যায়, আবার সহজে তেল কেনা যায়। ফলে ইরানকে উস্কে দিয়ে নতুন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো। একইসঙ্গে সৌদির সঙ্গে ইরানের যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিলো তাতে স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল ও মার্কিন শক্তির ভয়ের কারণ তৈরি হয়েছিলো। কারণ সোলাইমানির তৎপরতায় ব্যর্থতার স্বাদ নেই। ফলে এর প্রধান অনুঘটককে সরিয়ে দেয়াটা জরুরিই হয়ে পড়েছিলো।

সোলাইমানির মৃত্যুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলের তেল পরিবহনের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালীতে রয়েছে ইরানের প্রভাব। এই ঘটনায় তারা তাই স্বয়ংক্রিয় ভাবেই চাপে পড়েছে পুরো বিশ্ব। এই চাপ অব্যাহত রাখবে ইরান।

এতোদিন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সবার পাশে দাড়িয়েছে। এবার ইরানের বিপর্যয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য তাদেরকে সমর্থন দিয়েছে। সেই সমর্থন থেকে যে বার্তা সেটা নিশ্চয়ই ইরানি জাতীয়তাবাদের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেখানে হয়তো সোলাইমানির মৃত্যু আরো মহিমান্বিত হয়ে উঠবে!

এরইমধ্যে ইরাক থেকে মার্কিন বাহীনিকে চলে যাবার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। সিরিয়ায় আসাদও ঘুরে দাড়িয়েছেন। সোলাইমানির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের সবার চোখের জলে অতলে হারাবে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা! সেজন্য যুদ্ধ নয়, বরং সর্বস্তরের জনগণের একতার প্রয়োজন ছিলো। সেই একতার পথচলা শুরু হয়েছে এতে দ্বিমত করার সুযোগ আছে কী?

লেখক- আরিফুল ইসলাম সাব্বির : সংবাদকর্মী।




Loading...
ads






Loading...