প্রসঙ্গ ই-কমার্স, ডোমেইন ও আমাদের সরকার

আনন্দ কুটুম

মানবকণ্ঠ
আনন্দ কুটুম - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০২,  আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১০

কুটুমের ই-কমার্স সাইটের জন্য আমরা ডটকম ডোমেইন নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইন্ডিয়ান একটি কোম্পানি আগেই কিনে রেখেছে ডোমেইনটা। টিমের সবার পরবর্তী পছন্দ 'ডট কম ডট বিডি' ডোমেইন যেটা বাংলাদেশ সরকার বিক্রি করে থাকে। কিন্তু অনলাইন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের যে ননসেন্স এক্টিভিটিস সেটা আমাকে বরাবরই বিরক্ত এবং ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। সুতরাং আমার কোনো মতেই মন সায় দিচ্ছে না সরকারি কোনো সার্ভার থেকে ডোমেইন কেনাটা উচিৎ হবে।

আমরা খুবই একটা অদ্ভুত দেশে বসবাস করি যেখানে সরকারি ব্যাংক, সরকারি হাসপাতাল, সরকারি প্লেন, সরকারি বিমা, সরকারি খাবার, সরকারি ঔষধ, সরকারি টিভি, মোদ্দাকথা সরকারি কোনো সেবার উপরেই আমাদের আস্থা নেই। এক্সেপ্ট সরকারি চাকুরি। কারণ সরকারি চাকুরিতে দুর্নীতি করার বা দ্রুত ধনী হবার সুযোগ বেশি। ইনফ্যাক্ট যারা সরকার চালায় তারা নিজেও সরকারি কোনো সেবার উপরে আস্থা রাখে না। অর্থাৎ সরকার রাষ্ট্রের যে যে বিষয় হ্যান্ডেল করে সেখাই ৯-৬, দুর্নীতি, ভ্যাজাল, অনিয়মে ভরা। স্বভাবতই যে একটু স্বচ্ছল সে কখনোই সরকারের দ্বারস্থ হয় না। আর যার কোনো গতি নেই তারই শেষ আশ্রয় সরকার বা সরকারি সেবা।

গত দশ বছরে দেখেছি যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ করার নামে সরকার কী কী স্টুপিডিটি করেছে। যখন মন চেয়েছে তখন ইউটিউব বন্ধ করে দিয়েছে, ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছে। ডেইলিস্টার আর্মির দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলেছে, ওমনি ডেইলি স্টারের সার্ভিস উড়িয়ে দিয়েছে। মুক্ত চিন্তার মানুষের লেখালেখি পছন্দ হয়নি বলে গোটা দশেক ব্লগই দেশে বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করে দিয়েছে, যদিও এদেশের মানুষের পর্ণদেখা বন্ধ হয়নি। কোনো সুরক্ষা ছাড়াই সরকারি কনফিডেনশিয়াল ডাটা সার্বারে আপ করে দিয়েছে। স্যাটেলাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রাইভেট কোম্পানির হাতে দিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ফিঙ্গার প্রিন্ট তুলে দিয়েছে বিদেশি কোম্পানির হাতে। সরকারি উদ্যোগে ব্যক্তিগত কথপোকথন লিক করে দিয়ে পাবলিক ট্রায়েলের মতো ভয়ংকর ঘটনার বারংবার পুনরাবৃত্তি। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই যে হয় কথা নয় হইতেই সরকার পাগলা ষাড়ের মতো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয় বা দিতে চায় এগুলো দেখার পরেও সরকারি ডোমেইন কেনার শখ থাকার কথা নয় কারোরই। টেলিকমিউনিকেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা অত্যাধুনিক মন্ত্রণালয় যারা চালান তাদের বেশির ভাগেরই ইন্টারনেট দুনিয়া সম্পর্কে খুব একটা ক্লিয়ার ধারণা আছে বলে আমার মনে হয় না। এই যে গতকাল গেলাম অফিসের জন্য টি&টি লাইন নেওয়ার জন্য। যিনি ব্রিফ করবেন, তিনি নিজেও বিষয়টা সম্পর্কে ক্লিয়ার না। কী অদ্ভুত ব্যাপার। (এই যে না জেনেও যে সরকারি চাকুরি করা যায় এজন্যই মূলত সরকারি চাকুরিতে আমাদের আস্থা বেশি)।

এই যে সরকার বাহাদুর দুম দাম করে কোনো নীতিমালা ফলো না করে নিজেদের মেজাজ মর্জি অনুযায়ী চাইলে যেকোনো কিছু যেকোনো সময় বন্ধ করে দিতে পারে এমন অরাজক পরিস্থিতি এদেশে মোঘল আমলেও ছিলো না, ব্রিটিশ আমলেও ছিলো না। কিন্তু অদ্ভুত হলো বাংলাদেশ আমলে আছে। পাকিস্তান আমলেও কিছু কিছু ছিলো বটে।

একটা মজার ঘটনা বলে শেষ করি। আপনারা নিশ্চয় জানেন যে, ৫৭ ধারা, ৩২ ধারার মতো গলাটিপে ধরার কত কৌশল সরকার ওভার নাইট সংবিধানে সংযোজন করে ফেলেছে। কিন্তু সারা দুনিয়ায় যখন ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলছে, এমন কী বাংলাদেশও যার বাইরে নয়, সেই ই-কমার্স ব্যবসা নিয়ে সরকারের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই, আইনও নেই ইনফ্যাক্ট এই ব্যবসার কোনো আইনগত ভিত্তিই নেই এদেশে। ই-কমার্স ব্যবসা ক্যাটাগরিতে কোন ট্রেড লাইসেন্স নেই। অথচ এই ব্যবসাকে স্বীকৃতি দিয়ে, এই ব্যবসা থেকে কয়েকশত কোটি টাকা ট্যাক্স ইনকাম করা সম্ভব সরকারের জন্য।

সরকার ব্লগের ব্যপারে যতোটুকু মনোযোগ নষ্ট করেছে তার অর্ধেক মনোযোগ ই-কমার্স ব্যবসার দিকে দিলেও কিন্তু এই ব্যবসার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত তৈরি হতো।

যত গভীরে যাচ্ছি ততো বুঝতে পারছি একটা দেশ পুরো টিকেই আছে হাওয়ার উপরে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সরকারকে বিশ্বাস করতে পারছি না। বরং মনে হয় মাঝে মাঝে সরকার বিষয়টাকে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দিয়ে দিলেও দেশটার অন্তত স্ট্রং কোনো ভিত্তি তৈরি হয়ে যেতো এতোদিন।

লেখক- আনন্দ কুটুম : চলচ্চিত্রকর্মী ও সমালোচক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...