মফস্বল সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জের নাম

সোহেল রানা সোহাগ

মানবকণ্ঠ
সোহেল রানা সোহাগ - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৫৯,  আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ২২:০৫

সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জের নাম। সাংবাদিকদের প্রতিটা দিন, প্রতিটা সময় এক একটি চ্যালেঞ্জ। সংবাদপত্রে কাজ করব বা একজন সাংবাদিক হব- এমন স্বপ্ন দেখতাম সবসময়। আগ্রহটা সৃষ্টি হয়েছিল এলাকার এক বড় ভাইকে দেখে। তিনি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতেন। একদিন নিজ জেলা থেকে অন্য এক জেলায় জরুরী কাজের যাই। সেখানে চোখে পড়ে পত্রিকার পাতায় নিজ এলাকার একটি উন্নয়নের সংবাদ। পাশেই লেখা সেই বড় ভাইয়ের নাম। মনের ভিতর কী যে আনন্দ লাগলো। তারপর থেকেই সবসময় ভাবতাম কবে একটি পত্রিকায় কাজ করব। কিভাবে একজন সাংবাদিক হব। সারাদেশের মানুষকে পত্রিকার মাধ্যমে নিজ হাতে লেখা সংবাদ দেখাতে পারব। তখন থেকেই বিভিন্ন পত্রিকার চিঠিপত্র কলামে লেখা পাঠাতাম। মাঝে মাঝে দু’একটা লেখা ছাপা হতো। পত্রিকার পাতায় চিঠিপত্র কলামে নিজ লেখা দেখার কী যে আনন্দ তা তখনই বুঝতে পেরেছি। আগে ভাবতাম সকাল থেকে একটি ডায়েরী, কলম ও ক্যামেরা হাতে কেন একজন সাংবাদিক সংবাদের পেছনে ছুটেন। মফস্বল সাংবাদিকের তো তেমন বেতন ভাতাও পান না। তাহলে তাদের লাভটা কী? তবে এখন বুঝি লাভটা কী। হাজার টাকার নোট হাতে পেলে যে আনন্দ না পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি আনন্দ তখন পাওয়া যায় যখন একজন সাংবাদিকের লেখা নিউজ পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়।

স্থানীয় একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় সিভি জমা দিলাম। কাজ করার সুযোগ করে দিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক। সেই দিন থেকেই আমি ছুটতে শুরু করলাম সংবাদের পেছেনে। এলাকার উন্নয়নের সংবাদের পাশাপাশি যখন দুর্নীতির সংবাদ লেখা শুরু করলাম। তখন দেখি অনেক বাধা আমার সামনে। নিতে হচ্ছে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ সাথে ঝুঁকিও। তবুও থেমে থাকেনি আমার কলম। কারণ স্বপ্ন ছিল একজন ভালো সাংবাদিক হওয়ার। তারপর সুযোগ হয় একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করার। তবে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না। তখনই বুঝলাম মফস্বলে যারা সাংবাদিকতা করে তারা অবশ্যই নেশার কারণেই সাংবাদিকতা করেন। পেশা হিসেবে নয়। অনেকটাই নিজের খেয়ে বনে মহিষ তাড়ানোর মতো। তবুও ভালো লাগে যখন পত্রিকাতে আমার লেখা একটা সংবাদ একজন অসহায় মানুষের একটু উপকারে আসে। অনেকবার চেষ্টা করেছি এ পেশা থেকে ফিরতে। বাবা-মা’র ও অনেক বকা শুনেছি। তারা সব সময় বলতেন, কবে দেখিস তোকে মেরে গুম করে দেবে। অনেক সাংবাদিকের উদাহরণ দিতো। বছরের পর বছর সাংবাদিকতা করলেও দেখা যায় অনেক চুলায় আগুন জল্বে না। এতকথা শোনার পরেও আমি ফিরতে পারিনি সাংবাদিকতা থেকে। কারণ, পেশা হিসেবে নয় আমার যেন নেশা হয়ে গেছে সাংবাদিকতা।

একজন দুর্নীতিবাজের তথ্য যখন পত্রিকার কাগজে ছাপা হয়, তখন বড় কোনো নেতা, এমপি, মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় থাকা সেই দুর্নীতিবাজ শুধু সেই সাংবাদিক নয় তার পরিবারের সদস্যদের খুনের হুমকি দেয়। দূর্নীতির সংবাদটি না প্রকাশ করতে ফোনও দেন বড় কোনো নেতা। আর প্রাণের ভয়ে সংবাদটি না ছাপলেই সকাল বেলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জনগণ বলবে সাংবাদিকরা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু সংবাদটি ছাপার কারণে যখন রাস্তায় ধরে সাংবাদিকের বাবাকে অপমান, লাঞ্ছিত করা হবে তখন কিন্তু চায়ের দোকানে বসা একজনও মুখ খুলবেন না। তখন আবার কেউ কেউ বলবে বিষয়টা তো পত্রিকা অফিস দেখবে, দেখবে সম্পাদক। আছে পুলিশ প্রশাসন।

যাক অন্য বিষয়ে বলি, এলাকায় বড় কোনো ঘটনা ঘটলে অফিস থেকে ফোনের উপর ফোন। নিউজ কই, এত দেরি কেন, কী করছেন সারাদিন, আর কতক্ষণ?

অফিসে সংবাদ পাঠানো পরে যখন বাসায় গিয়ে পরিবারের সাথে একটু সময় দেব ঠিক তখনই ছোট কোনো পাতি নেতার ফোন, একটু পরে আবার বর্ষিয়ান কোনো নেতার ফোন- সংবাদটি যেন ছাপা না হয়, তার লোক। একটু পরে আবার দালাল প্রকৃতির কিছু লোক ফোন করে বলবে- সাংবাদিক ভাই কিছু চা-মিষ্টি খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবো সংবাদটি করার দরকার নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। সকালে সংবাদটি পত্রিকার পাতায় দেখে সাংবাদিককে দেখে নেওয়ার হুমকি। কিছুক্ষণ পর আবার মামলার হুমকি। পরেরদিন চাঁদাবাজির বা মানহানির মিথ্যা মামলা সাংবাদিকের ঘারে। তখন পত্রিকা অফিস বলবে- আরে বিষয়টিতে যখন রিস্ক ছিলো তখন তো ছবি তুলতে গেলেন কেন? সংবাদটি না পাঠালেই পারতেন। এই হলাম আমরা মফস্বল সাংবাদিক। আমাদের প্রতিটা সময়ই এক একটি চ্যালেঞ্জ।

সমাজ বদলানোর দায় কি শুধু সাংবাদিকদের? কী দরকার সমাজকে বদলাতে যাওয়ার? আমার জীবনের কি মায়া নেই? আমার বাবা-মা’র কি আমাকে ঘিরে কোনো আশা নেই? স্বপ্ন নেই? আমরা যারা মফস্বল সাংবাদিকতা করি তারা কি মানুষ না? অনেকেই ভাবছেন- তাহলে করছেন কেন, ছেড়ে দিন। ঠিক তখনই মনে হয়- পেশা নয়, এ যে এক বড় নেশা! এটাই যে মফস্বল সাংবাদিকের জীবন।

লেখক- সোহেল রানা সোহাগ: গণমাধ্যম কর্মী, তাড়াশ-সিরাজগঞ্জ।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...