শিক্ষা

মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান


poisha bazar

  • ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫০

কেবল জাগতে বললেই জাতি জাগে না। গণজাগরণের জন্য প্রত্যেকের মনে মনুষ্যত্ব ও জ্ঞানার্জনের স্বাভাবিক ব্যকুলতা জšি§য়ে দেয়া প্রয়োজন। জাতি যখন চৌকস ও জ্ঞানী হয় তখন জাগার জন্য সে কারো তাড়া দেয়ার অপেক্ষা করে না, কারণ জাগরণই হয় তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। শিক্ষিত নাগরিক ছাড়া শক্তিশালী দেশ আশা করা যায় না। জাতির সর্বসাধারণকে কেবল জ্ঞান দেয়ার দায়িত্ব শিক্ষক সম্প্রদায়ের। তারাই জাতির আত্মা, তারাই বিশ্ব সভ্যতার নির্মাতা। তাদের এ মহান অবদান অস্বীকার করে মানব কল্যাণের নামে বিকল্প যে কোনো প্রচেষ্টাই নিষ্ফল। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আছে, শিক্ষা নীতি আছে, শিক্ষা ব্যবস্থা আছে এবং শিক্ষক আছেন, তবে আমরা সাম্প্রতিক বিশ্ব সভ্যতার তুলনায় কেন অনগ্রসর? কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে হয়তো সবই আছে, শুধু নেই প্রকৃত শিক্ষা। কোনো দেশ কত উন্নত সে দেশের প্রশস্ত রাজপথ, আকাশচুম্বী অট্টালিকা দেখে জানা যায় না; রাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিকের মনোজগৎ জ্ঞানসম্পদে কতটা পরিপূর্ণ তাই জাতীয় উন্নয়ন পরিমাপের যথার্থ মাপকাঠি। বিধ্বস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, অসার শিক্ষানীতি, অবাধ দুর্নীতির বিষবাষ্পে আচ্ছাদিত অপশিক্ষার দুষ্টচক্রে আক্রান্ত আমাদের শিক্ষা।


আমাদের দেশের মা-বোন দারিদ্র্যের অসহনীয় কষ্টে শেষ সম্বল দুষ্ট দালালের হাতে সমর্পণ করে মাতৃভ‚মি ত্যাগ করে বিদেশের গৃহকর্তার ঘরের কাজ করার উদ্দেশে এবং প্রতারিত হয়ে ফিরে আসে অমানবিক, নৃশংস, পাশবিক অত্যাচার, উৎপীড়নের মানসিক ও শারীরিক ক্ষত নিয়ে, যা জানামাত্র যে কোনো মানুষের মন সহানুভ‚তি ও লজ্জার আবেগে আহত না হয়ে পারে না। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় হতাশায় সর্বহারা যুবক-যুবতীরা শিশু সন্তানসহ খাদ্যের প্রত্যাশায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে বিপদসংকুল সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য হয় বিদেশে আশ্রয়ের প্রত্যাশায়। দুর্দশাগ্রস্ত সে সব মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের অসহায় মর্মান্তুদ দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই চোখে বেদনার অশ্রæ আসে। আপনজনদের প্রতিপালনের উদ্দেশে বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থ উপার্জনে প্রবাসীদের প্রতিক‚ল পরিবেশে যে দুর্বিষহ পরিশ্রম করতে য় তা শুনে আমাদের হƒদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়। প্রচলিত শিক্ষার স্বনির্ভর রাষ্ট্রগঠনের সামর্থ নেই বলেই নাগরিকদের এমন দুর্গতি।
যে সমাজের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত সেখানে মানুষ মানুষকে পণ্য করে। ত্রæটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠে না। শিক্ষার আলোবঞ্চিত বিশাল জনগোষ্ঠী অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের নেশায় খাদ্যে ভেজাল মেশায়, নকল ওষুধ তৈরি করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিয়ে অনেকে ডাক্তার সেজে ভুল চিকিৎসায় রোগী মারে, অর্থলোভী অনেক ডাক্তার রোগীর রোগ বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আতঙ্কিত করে তার কাছ থেকে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ আদায় করে। এমন লজ্জাজনক ঘটনাগুলো শিক্ষার অভাবেই ঘটছে।


পুঁজিবাজার ও ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি শিক্ষিত সুনাগরিকের কাজ নয়। অথচ এসব গর্হিত কাজে লিপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ নিজ পদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত। তবে ব্যক্তির ঘৃণিত আচরণ যদি মূর্খের মতো হয় তাহলে তার সার্টিফিকেটের মূল্য কী?


জাতি তখনই সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় উপনীত হয় যখন নির্দোষ শিক্ষিত সাধারণ মানুষ সুবিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হয়ে চরমভাবে প্রতারিত হয়-নিঃস্ব হয়। পৃথিবীর সব শিক্ষিত সমাজ আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অসভ্য, বর্বর, বর্ণজ্ঞানহীন ব্যক্তির মন পশুত্বে পরিপূর্ণ। এদের কাছে নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই; পৈশাচিকতা, দুর্বৃত্তি, লুটপাট, ব্যাভিচার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, গুম ইত্যাদি ঘৃণিত কাজই এদের আচরণের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। গণধর্ষণ, খুন, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা, শিশুশ্রমিকের পায়ুপথে পাম্প মেশিনের পাইপ ঢুকিয়ে বাতাস ছেড়ে তাকে নির্দয়ভাবে মারা এবং এসব বিভৎস্য দৃশ্যের ভিডিও করা বিকৃত মানসিকতা ছাড়া আর কি!
এসব অসভ্য-ভয়াবহ-বিপজ্জনক পরিস্থিতি ত্রæটিপূর্ণ শিক্ষার পরিনাম। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বÑশিক্ষিত সুনাগরিক গড়া, কিন্তু সেখানেই মাদকের বড় বাজার; শিক্ষার্থীরাই এর বিশেষ ভোক্তা-ক্রেতা এবং তারাই ইয়াবার ব্যবসায় জড়িত। সরিষাতেই যদি ভ‚ত থাকে তাহলে তা দিয়ে ভ‚ত তাড়ানোর চেষ্টা বৃথা। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, আদালত আছে কিন্তু কিছুতেই মাদকের ব্যবহার, ব্যবসা ও এর পাচার বন্ধ হচ্ছে না। বরংতা দ্রæত গতিতে সর্বত্র অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে মহামারীর মতো।
আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে এ দেশে শাসকদের উপমুক্ত চাকর বানানোর জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল তা আজও তেমনি আছে। তাই এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী শিক্ষিত চাকর হওয়ার জন্য, কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় লাভের আশায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। তাই তাকে কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব হয় না যে, মনুষ্যত্বের শিক্ষাই চরম শিক্ষা, আর সবই এর অধীনে।


পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, ব্যবহারিক পরীক্ষায় যথার্থ মূল্যায়ন ছাড়াই যথেষ্ট নম্বর প্রদান, পরীক্ষার কেন্দ্রে কক্ষ পরিদর্শকের সম্মতিতে সহজে নকল করার উৎসবমুখর পরিবেশ এখন স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এমন গর্হিত পরিবেশে শিক্ষার্থীরা অসৎ কার্যকলাপের প্রতি প্রলুব্ধ হয়। তারা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে দুর্নীতির সহজ উপায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পদচারণার এই প্রবণতা জাতীয় মহা দুর্যোগের ইঙ্গিত। বিদ্যাপীঠ অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কিছু অসাধু অর্থলোভী পুঁজিপতির উদ্যোগে তা পরিণত হয়েছে সাধারণ ব্যবসায়। তাই সেখানে শিক্ষাপণ্য; আর শিক্ষকরা শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার এই অবমূল্যায়ন অত্যন্ত দুঃখজনক! যে জাতির শিক্ষক সম্প্রদায় অবহেলিত সে জাতিনিঃসন্দেহে নিচ-অসভ্য।


আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, মনোহর সাজসজ্জা, সর্বোচ্চ ফল দানের প্রতিশ্রæতি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রলোভনের শিকার অভিভাবক সন্তানের সুশিক্ষার প্রত্যাশায় বিপুল অর্থের অপচয় করছেন। শুধু তাই নয় এ প্রতারণামূলক প্রক্রিয়ার ফাঁদে পড়ে শিক্ষার্থীদের সামর্থের তুলনায় অনেক নম্বর পাওয়ার জন্য বেশি বই-খাতার ভারি বোঝা বহন করতে হচ্ছে শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে। কেবল অনেক নম্বর শিক্ষার্থীকে সার্বক্ষণিক বিনোদনহীন শিক্ষার প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে শিশুর স্বাভাবিক সুষম মানসিক বিকাশ বিঘিœত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় উন্নততর প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বের দেশে-দেশে দূরত্বের বিষয়টি ক্রমান্বয়ে দ্রæত কমে আসছে। তাই প্রত্যেকটি দেশ জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার প্রতিযোগিতায় যথেষ্ট সচেতন। তা না হলে শিক্ষায় পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের দুর্বলতায় স্বাধীনতা হারাবে।

লেখক-মোহাম্মদ মতিয়ার রহমান: সহকারী শিক্ষক, মামস্-এমএ আউয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।  




Loading...
ads





Loading...