কাশ্মীরিদের উর্দু স্লোগান, আবরারের স্ট্যাটাস ও আমার দুঃখী শহীদ মিনার

আনন্দ কুটুম

মানবকণ্ঠ
আনন্দ কুটুম - ছবি: রাহমান আজাদ।

poisha bazar

  • ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:০৭

গেলো বছর বা সম্ভবত এবছর ঢাকায় অবস্থানরত কাশ্মীরি শিক্ষার্থী যারা অধিকাংশই ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, তারা মিলে জাতীয় শহীদ মিনারে একটি মানববন্ধন বা সমাবেশ জাতীয় কিছু একটা করেছিলো। তাদের স্লোগান ছিলো "লড়কে লেঙ্গে কাশ্মীর, কাশ্মীর জিন্দাবাদ, আজাদ কাশ্মীর জিন্দাবাদ" বা এই টাইপের কিছু। কাশ্মীরে একাধিক আঞ্চলিক ভাষা বা ডায়ালেক্ট থাকলেও সেখানের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা উর্দু। সুতরাং শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে তারা যে স্লোগানগুলো দিয়েছিলো সেগুলো ছিলো উর্দু ভাষায়। অবশ্য বলা ভালো তাদের মাতৃভাষায়।

এগুলোর কিছুই আমি জানতাম না। হয়ত আমার মতো এমন অনেক মানুষই এটা জানতেন না বা ওভার লুক করে গিয়েছিলেন। বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার পরেই বিষয়টি আমার দৃষ্টিতে আসে। এমনই একটা নিউজ আবরার তার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেছিলেন এবং যা লিখেছিলেন তার মোদ্যাকথা হলো- শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে উর্দুতে স্লোগান একটি সাহসী পদক্ষেপ। আবরারের মৃত্যুর পরে ঘাতকেরা সেই নিউজটি আমাদের দেখিয়ে বলার চেষ্টা করেছে যে, 'দেখুন আবরার একজন শিবির সেনা ছিলো, একজন পাকিস্তানপন্থী বা উর্দুপন্থী ছিলো।'

কাশ্মীর একটি ভয়ঙ্কর ভালনারেবল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাশ্মীরের যাদের সাথে আমার কথা হয়েছে তারা অধিকাংশ মানুষই আজাদ কাশ্মীরে বিশ্বাসী এবং তারা স্বপ্ন দেখে কাশ্মীরের স্বাধীনতার। কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণার এক বড় জায়গা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। অনেক কাশ্মীরিদের সাথেই আমার আলাপ হয়েছে। তারা একাধিকবার একথাটি বলেছে যে, বাংলাদেশ যেমন পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছিলো, সেভাবে কাশ্মীরও ভারতের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু কাশ্মীরের এই দুর্দিনে তাদের অনুপ্রেরণাদায়ক রাষ্ট্র বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘের অধিবেশনে। যদিও এদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে বা সাংগঠনিক পর্যায়ে কেউ কেউ কাশ্মীরের পক্ষে অবস্থান করছে। সম্ভবত আবরার ছিলো তাদের মধ্যেই একজন। কিন্তু সেটা আমাদের মূল আলোচনার বিষয় নয়।

আমাদের মূল আলোচনার বিষয় হলো, শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে উর্দুতে স্লোগান দেওয়া নিয়ে। যদিও শহীদ মিনার অর্জিত হয়েছে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে, কিন্তু প্রশ্ন হলো শহীদ মিনার কি আজীবনই রাজনৈতিক স্থাপনা হিসেবে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে? নাকি দল-মত-ভাষা নির্বিশেষে নিপিড়ীত নির্যাতিত মানুষের ফ্রিডম অফ স্পীচ বা ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের প্লাটফর্ম হবে?

আমাদের আরো একবার গভীরভাবে ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে যে, আমরা বাঙ্গালীরা কি উর্দু বিরোধী নাকি জোরপূর্বক উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী? যদি উত্তর হয় প্রথমটি তাহলে শহীদ মিনার বা ভাষা আন্দোলন হয়ে পরে খর্বকায় স্রেফ একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন- রিঅ্যাকশন। যদি উত্তর হয় দ্বিতীয়টি তাহলে ভাষা আন্দোলন হয়ে ওঠে সমগ্র ভাষার বিরুদ্ধে সমগ্র ভাষার স্বাধীনতার বার্তা। অর্থাৎ যেকোনো ভাষাভাষী মানুষের উপরে অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী। কারো স্বাধীনতা হরণের বিরোধী।

আপনাদের ম্যাডিসন স্কোয়ারের কথা মনে আছে। ১৯৭১ সাল। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তানের পক্ষে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ জমায়েত হয়েছে ম্যাডিসন স্কোয়ারে বাংলাদেশর পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানাতে। সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি জনগণের মতামতের প্রতিফলন নাও হতে পারে। যদি ম্যাডিসন স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়া যায় তবে কেন বাংলাদেশের শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে কাশ্মীরের অথবা পাকিস্তানের অথবা ভারতের নিপীড়িত মানুষের স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়া যাবে না?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শহীদ মিনার। যেদিন থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মেনে নিয়েছি সেদিন থেকেই আমরা এটা মেনে নিয়েছি যে, এই স্থাপনা শুধুমাত্র বাঙ্গালীর নয়, এটি সমগ্র পৃথিবীর সমগ্র ভাষাভাষী মানুষের। সুতরাং শহীদ মিনার যেমন বাঙ্গালীর, তেমনই কাশ্মীরিদের, তেমনই বেলুচদের, তেমনি বিহারিদের, তেমনি ইংরেজদের বা ফরাসিদের।

৫২'র ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমার যতটুকু পড়াশোনা তার কোথাও আমি এমন কোনো কিছু দেখিনি যেখানে লেখা আছে যে, বাঙ্গালীর উদ্দেশ্য ছিলো উর্দুভাষীদের পরাস্ত করে তাদের ডোমিনেট করা। বরং বায়ান্নর বার্তাই ছিলো এমন যে, আমরা দুনিয়ার সকল প্রকার অন্যায়, অনিয়ম ও জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে। প্রত্যেকের নিজস্বতা আছে। প্রত্যেককে বাঁচতে দিতে হবে তার নিজস্বতা নিয়ে। কোনো ভাষাভাষীর উপরে কোনোপ্রকার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মেনে নেওয়া হবে না।

তাই যদি হয়, তবে নির্যাতিত উর্দু ভাষাভাষীদের অবস্থান কি শহীদ মিনারে হবে না? নির্যাতিত হিন্দিভাষী বা নির্যাতিত ইংরেজিভাষী মানুষ কি শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে তার ফ্রিডম অফ স্পীচ ভোগ করতে পারবে না? যদি শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে কোনো বাঙ্গালী তার মাতৃভাষায় স্লোগান দিতে পারে, তাহলে কোনো কাশ্মীরি তার মাতৃভাষায় স্লোগান দিলে সমস্যা কোথায়? আমরা কি শহীদ মিনারকে ভাষার বিরুদ্ধে ভাষার ঘৃণার প্রতীক বলে প্রতীয়মান করতে চাইব? নাকি এক ভাষার প্রতি অন্য ভাষার সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে এস্টাবলিশ করব? শহীদ মিনার কি স্রেফ ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক স্থাপনা হবে? নাকি দুনিয়ার সমগ্র মানুষের ভাষার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নিয়ে মহাজাগতিক স্থাপনায় রূপান্তরিত হবে? একবিংশ শতাব্দীর তরুণদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে এসেও শহীদ মিনারের মতো সার্বজনীন একটি স্থাপনাকে কি আমরা স্রেফ আমাদের করে রাখব নাকি সবার কল্যাণে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেবো?

লেখক- আনন্দ কুটুম : চলচ্চিত্রকর্মী ও সমালোচক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...