মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কষ্ট করে বিচারের দায় কাঁধে নিতে হবে না

আনন্দ কুটুম

মানবকণ্ঠ
আনন্দ কুটুম - ছবি: রাহমান আজাদ।

poisha bazar

  • ১২ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:২১,  আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০১:০৩

দলদাস বুদ্ধিজীবীরা এক প্রশ্নে ফেসবুক সয়লাব করে ফেলছে। এই একই প্রশ্ন দেখলাম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীও করলেন জাতির উদ্দেশ্যে। প্রশ্নটা অনেকটা এরকম, রফিকের হত্যার বিচার তো চাও নাই, শফিকের হত্যার বিচার চাও কেন? মখলেসের হত্যার বিচার তো চাও নাই, কুলসুমের হত্যার বিচার চাও কেন?

এই কথা দ্বারা ঠিক কী বোঝানো হয়? কী বোঝাতে চায় তারা? এর অর্থ কি এরকম যে, শফিকের হত্যার বিচার যেহেতু তুমি চাওনি, শফিকের হত্যার বিচারও চাইতে পারবে না। সুতরাং বিচার-বুচার কিচ্ছু নাই। খুনের বদলে খুন হয়েছে এবং এই খুন চলতেই থাকবে।

সবার সতর্কতার জন্য বলে রাখছি, এমন কোনো কথা যদি কেউ বলে তবে বিনাতর্কে তাকে কষে একটা চড় মারুন। কারণ, এগুলো সবই পরোক্ষ খুনি। এরা একটি খুনকে আরেকটি খুন দিয়ে জাস্টিফাই করার নামে খুনাখুনিকেই মূলত প্রোমোদ দিচ্ছে। খুন মূলত খুনই। সেটা বঙ্গবন্ধু খুন হলেও খুন, অভিজিৎ খুন হলেও খুন, জিয়াউর রহমান খুন হলেও খুন। একটি খুনের বিচার সঠিকভাবে কার্যকর করা মানেই বাকি অপরাধীদের জন্য সতর্কবার্তা। একটি খুনের বিচার করা মানেই বাকি খুনের বিচারের পথে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাওয়া।

যেসকল আওয়ামী দলদাসেরা বলছে, কই অভিজিৎ-এর খুনের বিচার তো চাওনি? আজ কেন আবরারের হত্যার বিচার চাইতে আসছ? সেই সকল দলদাসের উদ্দেশ্যে বলি, বিচার চাইতে হবে কেন? বিচারকাজ তো এমন জিনিস যেটা অটোমেটিক রাষ্ট্র তার ক্ষমতাবলে পরিচালনা করবে। সরকার আছে, আদালত আছে। তাদের কাজ কী? সরকার কেন বিচার করছে না? নাগরিকদের চাওয়া না-চাওয়ার উপর তো বিচার নির্ভর করে না। কিন্তু আফসোস হলো, এদেশে নির্ভর করে। সরকার, আদালত, এমন কী পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এতো করাপ্টেড যে এদেশে বিচার চাইতে হয়, তবুও বিচার হয় না।

সেদিন প্রধানমন্ত্রী তৃপ্তির ঢেকুর তুলে কথায় চিড়ে ভিজিয়ে দিলেন। তিনি বললেন- বিএনিপির আমলে ওমোক, ওমোক খুন হয়েছে; লীগের ওমোক, তোমোক খুন হয়েছে; কই তাদের তো বিচার হয়নি।

এই কথা দ্বারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চাইছেন? তারমানে কি আবরারের খুনের বিচারও হবে না? নাকি বিচার চেয়ে আমরা পাপ করছি? আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উল্টা প্রশ্ন করতে চাই। ১২ বছর ধরে আপনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায়ও কেন বিএনপির আমলে যারা খুন হয়েছে তাদের খুনের বিচার হয়নি? কেন আপনি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই খুনগুলার বিচার করতে পারেন নাই?
একে তো আপনি খুনের বিচার করতে পারেন নাই অর্থাৎ (অবশ্যই আপনি একজন ব্যর্থ সরকাার প্রধান)। উপরন্তু আপনি বড় গলায় বলছেন, ঐ ঐ ঐ খুনের বিচার তো হয়নি। আমাদের প্রশ্ন হলো, হয়নি কেন?? তাহলে আপনি আছেন কেন? খুনের বিচার করতে পারেন না তাহলে আপনি কিসের আদর্শিক রাষ্ট্র নায়ক? দায়িত্ব ইস্থফা দেন। যে বিচার করতে পারবে তেমন একজনকে আমরা সবাই রাষ্ট্র পরিচালনার ভার দেই। নাকি আপনি চান না যে বিচার হোক? তাতে রাজনৈতিক ফায়দা আছে।

এখানেই হলো একজন সভ্য রাষ্ট্রনায়কের সাথে অসভ্য রাষ্ট্রনায়কের পার্থক্য। নিজের প্রশংসা করা থেকে অপরের দুর্নাম করতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

একজন আদর্শিক রাষ্ট্রনায়ক যখন কথা বলেন তখন এভাবে বলেন- বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির আমলে অনেক হত্যা হয়েছে, আপনারা সবাই দেখেছেন। এর অনেক হত্যারই বিচার হয়নি। আগের আমলগুলোতে যে অবিচার আপনারা সহ্য করেছেন আমাদের সময়ে তা আপনাদের আর সহ্য করতে হবে না। আমরা সেটা হতে দেবো না। দেশে আইন আছে, আদালত আছে। আদালতই জুরিকডিকশন মেনে বিচার করবে। বিচার যেন দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি হয় সে বিষয়ে সরকার আদালতকে সহযোগিতা করবে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। এক্ষেত্রে খুনিরা আমাদের সহযোগী দল হলেও আমরা আইন ও আদালতের উপরে কোনো প্রভাব খাটাবো না। আপনারা ধৈর্য ধরুন। আইনের উপর বিশ্বাস রাখুন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বললেন পুরো উল্টো কথা। প্রথমত প্রধানমন্ত্রী বিচার করার কেউ না। বিচার করবে আদালত। 'আমি বিচার করব' এই কথা বলার মধ্য দিয়ে তিনি আদালত অবমাননা করেছেন। কিন্তু অদ্ভুত হলো তাঁর সামনে বসে থাকা একজন সাংবাদিকও শিরদাঁড়া উঁচু করে বলতে পারল না যে, আপনি তো বিচার করার কেউ না। আপনি বিচার করবেন কীভাবে?

দেশটাকে একদম মগের মুল্লুক বানিয়ে ফেলেছে সবাই। আদালতের উপর এই যে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ, যার যা দায়িত্ব নয় তা করতে যাওয়া, এগুলোই মূলত এদের জাস্টিস পলিসিকে ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বছরের পরে বছর চলে যায়, ন্যায় বিচারের জন্য মানুষ কাঁদতে কাঁদতে চোখের দরিয়া শুকিয়ে ফেলে, কিন্তু বিচার পায় না।

যেসকল দলদাসেরা লাফাচ্ছে যে অভিজিৎ হত্যার বিচার কেন চাওনি? তাদের বলতে চাই যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে গত ১৫ বছরে ঘটে যাওয়া সলক অন্যায়, অবিচার, হত্যার বিচার চেয়েছি। সেটা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও চেয়েছি, সেটা শিবিরের ক্ষেত্রেও চেয়েছি। দল মত নির্বিশেষে অন্যায় আসলে অন্যায়ই। অন্যায়ের বিচার চাইতে আমার অন্তত দলের লেজুড়বৃত্তি লাগে না। কিন্তু এই ব্যর্থ বিচার ব্যবস্থার বিচার করতে দলের লেজুড়বৃত্তি লাগে। এবং সরকারই অভিজিৎ-এর হত্যার বিচার করেনি তার রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য। সুতরাং বিচার না চাওয়ার যে অপরাধ তার থেকে ঢের বেশি অপরাধ সরকারের, আদালতের- যে, তারা বিচার করতে চায়নি।

এখানেই হলো দেশরত্ন, মাদার অব হিউম্যানিটি, শেখ হাসিনার সীমাবদ্ধতা যে, তিনি লাশের গায়েও দলের গন্ধ খোঁজেন। কিন্তু যারা ন্যায়ের পক্ষে তারা সকল হত্যাতেই ব্যথিত হয়।

সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে বলি। জীবনে তো বহুবার প্রধানমন্ত্রীর নিকট ন্যায় বিচার চেয়েছেন। পেয়েছেন কখনো? পাননি তো, তাই না? আজ থেকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে কষ্ট করে বিচারের দায় কাঁধে তুলে নিতে হবে না। বিচার করার জন্য আদালত আছে। আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ হলো, দয়া করে আদালতকে তার দায়িত্ব পালনে শুধু বাধা দিয়েন না। আইন ও আদালতকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেন। এটুকুতেই আমরা আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকব।

ধন্যবাদ!!

লেখক- আনন্দ কুটুম : চলচ্চিত্রকর্মী ও সমালোচক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...