• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
  • ই-পেপার

স্বাধীনতা ও ছাত্রলীগ একই সূত্রে গাঁথা


poisha bazar

  • অ্যাম্বাসেডর, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:০১,  আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৪৪

ইফরান আল রাফি :

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের লাল সবুজের বাংলাদেশ লক্ষ শহীদের রক্তে সিক্ত এক উর্বর ভূমি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকল পরাধীনতার শিকল ভেঙে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে এনেছিল বাংলার সূর্য সন্তানরা। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের বিদায় ঘণ্টা বাজলেও বাঙালি পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

শুরু হয় বাঙালির উপর নানা বৈষম্য, পীড়ন ও অত্যাচার। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায় ও দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি দিতে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষা শান্তি প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ। দেশমাতৃকার সকল আন্দোলনের বীজ হিসেবে পরিচিত 'মহান ভাষা আন্দোলন' যার সূচনালগ্নে গৌরবোজ্জ্বলের কৃতিত্ব ছাত্রলীগের।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্র সমাজের ডাকে হরতালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করে ছাত্রলীগ। উল্লেখ্য ১৯৫১ সালে আদমশুমারি চলাকালে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বাংলা ভাষার পক্ষে মতামত দিয়ে জনগণকে উৎসাহিত করেন। মায়ের ভাষার জন্যে আত্মত্যাগ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে রক্তে রঙিন পিচ ঢালা কালো রাস্তা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ অবধি বাঙালি জাতির মুক্তি পথের নিরন্তর সাথী এই ছাত্র সংগঠনটি। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ছাত্রলীগ।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার পক্ষে সারা দেশব্যাপী প্রচার অভিযান চালিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের অবৈধ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদের ঝড় তুলে ছিল এই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই। ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য সংস্কৃতি থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিতাড়িতকরন, রোমান হরফে বাংলা অক্ষরকে সাজানো এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে অবহেলা করার একটি চক্রান্ত শুরু করেন।

এছাড়াও বিচারপতি হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানেন।এসবের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগ অন্যান্যে ছাত্র সংগঠনকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেন। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং ছাত্রলীগের ১১ দফায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই সংগঠনটি।

একই সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। একই সময় প্রচার অভিযান ‌‘আইয়ুব খানের উন্নয়ন দশক’ এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সোনালী আঁশ বিক্রির টাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের মরু অঞ্চলে ব্যয়বহুল সেচ প্রকল্প চালু হলেও প্রতিবছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলার কৃষকদের জন্য কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।

ছাত্রলীগের কর্মীরা এসব ঘটনাবলি প্রচার করে আইয়ুব খানের শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তৃণমূলে জনমত গড়েন। ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে বন্দি করা হয়। এসময় মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা তার পিতার সঙ্গে নিয়মিত জেল গেটে দেখা করে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে আন্দোলনের যাবতীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন।

১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব এক যৌথ বিবৃতিতে ১১ দফা বাস্তবায়নে ছাত্রলীগকে আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেন এবং ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ দফা সপ্তাহ পালনের নির্দেশনা দেন।

১১ দফা সপ্তাহ পালন কালে ২০ জানুয়ারি আসাদ হত্যার মধ্যে দিয়ে শাসক গোষ্ঠী আন্দোলনকৃত ছাত্রসমাজকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তোফায়েল আহমেদ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন যার মধ্যে প্রথম দিন ছিল হরতাল, দ্বিতীয় দিন শোকদিবস, তৃতীয় দিন মশাল মিছিল।

২৪ জানুয়ারি আবারো হরতাল ডাকা হয় এবং প্রকৃতপক্ষে এ হরতালটি ছিল স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পরাজয়ের বিদায় ঘণ্টা। নব কুমার ইন্সটিটিউটের ১৪ বছরের বালক মতিউর রহমানকে সেনাবাহিনী কর্তৃক গুলি করে হত্যা করা হয়। যা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

পূর্ব বাংলায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজকে শীতল করতে ১৯৬৯ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলায় সফরে আসেন আইয়ুব খান এবং সঙ্গে কিছু প্রলোভন দেখানো প্রস্তাব নিয়ে আসেন। ছাত্র সমাজের পক্ষে ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন ১১ দফা ও নেতা মুজিবের মুক্তি ছাড়া সমাধানের কোন পথ নেই। ছাত্র সমাজের রুদ্রমূর্তি দেখে আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জুহুরুল হক কে হত্যা এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এমতাবস্থায় আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত দেন।

২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব সহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিকে মুক্তি দেয়া হয়। নেতা শেখ মুজিবকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ দেশবাসীর পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে শেখ মুজিবকে ভূষিত করেন। যা ছাত্রলীগের একটি বড় অর্জন ও সাফল্য। অবশেষে আইয়ুব খান ২৬ শে মার্চ বিদায় নেন কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর করেন পাকিস্তানের জল্লাদ খ্যাত ইয়াহিয়া খানের উপর। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের নতুন প্রজন্মের মগজ ধোলাই করার জন্য 'পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি' নামে অধ্যায় সংযুক্ত করে পাঠ্যক্রমে।

ছাত্রছাত্রীরা তা প্রত্যাখ্যান করলে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের উদ্যোগে গভঃ ল্যাবরটরী স্কুলের শিক্ষার্থী মোস্তাক আহমেদ ও আজিমপুর গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থী রোজীকে যথাক্রমে আহ্বায়ক ও যুগ্ম-আহ্বায়ক করে মাধ্যমিক স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ছাত্রলীগের উদ্যোগে এ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করলে পাকশাসক গোষ্ঠী এ বই প্রত্যাহার করেন।

এ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ছাত্রলীগ সাংগঠনিক ভাবে সমৃদ্ধ হতে থাকেন। অনেক স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রলীগে যোগদান করেন।বিভিন্ন স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয় এ আন্দোলনেরই ফসল। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা ও গণসংযোগে নামেন ছাত্রলীগ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে ছাত্রলীগ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বেশ আস্থা অর্জন করেন।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের আনাচে কানাচে প্রচার অভিযান করেন তাঁরা।উল্লেখ্য যেসব আসন অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও স্থানীয় সমস্যার কারণে প্রার্থীরা প্রচার অভিযান পরিচালনা করতে ব্যর্থ হতো সেখানে বঙ্গবন্ধু নির্দেশনায় নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগ করে ছাত্রলীগ।

ফলশ্রুতিতে এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনেন। জয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা অজুহাত দেখাতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে তা পেছানো হয়। ৩ মার্চ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ৬ দফা ও ১১ দফার প্রতি অবিচল থাকার জন্য শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ছাত্রলীগের অবদান ছিল উল্লেখ্য ও প্রশংসনীয়।ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার জন্য সতের হাজার নেতা কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছে। দেশের জন্য কোন ছাত্র সংগঠনের এ ধরনের ত্যাগ বিরল ও গৌরবময়।তাই যতদিন বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা পৃথিবীর বুকে সমুন্নত থাকবে ততদিন ছাত্রলীগ তার অতীতের গৌরবময় সাফল্য আর মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যাবে মসৃণ ভবিষ্যতের পথে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী (কৃষি অনুষদ), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর, দৈনিক মানবকণ্ঠ

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads





Loading...