manobkantha
জাতীয় নির্বাচনেও ‘গাইবান্ধা স্টাইল’

সরকারের কূটচালে কৌশলী হবে ইসি

জাতীয় নির্বাচনেও ‘গাইবান্ধা স্টাইল’

সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের কারণে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) না দিয়ে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ (আরপিও) সংশোধনের খসড়া অনুমোদন করাকে সরকারের ক‚টচাল হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা। গাইবান্ধার-৫ আসনে উপনির্বাচনের মতো পরিস্থিতি এড়াতে সরকার এ কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই গাইবান্ধার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেসময়ে ইসির নেয়া পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি হলে সরকার বিপদে পড়বে। কেননা, ইসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেটা করতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার পুরো আসনে ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দিতে চায়নি।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে বিএনপিসহ বিরোধী জোট। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়টি আরও জোরালো করছেন তারা। ইসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেয়ার বিষয়টি সামনে তুলে ধরে তারা বলছেন, ‘এটা করার মধ্য দিয়ে সরকার আবারও প্রমাণ করল, তারা একতরফা নির্বাচন করতে চায়। নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমাদের শঙ্কাও সত্যি হলো যে, এ কমিশন সরকারের বাইরে নয়।’

অবশ্য নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। আইনে থাকা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে হলেও আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রাহ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। এলক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) সব কমিশনার একমত। এজন্য প্রয়োজনে গাইবান্ধা স্টাইল ফলো করারও ইচ্ছে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রচলিত আইন বাধা হবে না বলেই মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর গতকাল সোমবার বলেন, গাইবান্ধার মতো অনিয়ম হলে নির্বাচন চলাকালে ভোট বন্ধ করা যাবে। এটা আমরা কেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তাও পারেন। ১০০টা কেন্দ্রে সমস্যা হলে ১০০টা কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তাই ভোট বন্ধ করতে পারেন। ফলাফল ঘোষণার আগেও পারেন বন্ধ করতে। আগে শুধু নির্বাচন চলাকালীন ভোট বাতিলের ক্ষমতা ছিল। এখন ভোট শেষ হলেও গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত বাতিল করতে পারবে কমিশন। তাই আগের চেয়ে ক্ষমতা আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

গত ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের কারণে একপর্যায়ে পুরো আসনের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেয় ইসি। যে প্রক্রিয়ায় ঢাকায় বসে নির্বাচন কমিশন গাইবান্ধার ভোট বন্ধ করেছে তাতে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা হতবাক হয়েছিলেন। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কমবেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও করেছিলেন তারা। তখনই আলোচনায় এসেছিল বিষয়টি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইসির সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ‘প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা আমাদের বলেছেন, ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। ডিসি বলেছেন, ভোটে কোনো অনিয়ম হয়নি। অথচ নির্বাচন কমিশন ভোট বন্ধ করে দিলো। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’

ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি দলের নেতাদের মুখ থেকে এসব বক্তব্য আসার পর আগামী জাতীয় নির্বাচনে সরকারের অবস্থান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে ইসি। তাই নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১(এ) ধারায় একটি উপধারা সংযুক্ত করে প্রস্তাব পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এই ধারায় বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশন যদি সন্তুষ্ট হয় যে, নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিরাজমান অপকর্মের কারণে যুক্তিযুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং আইনানুগভাবে নির্বাচন পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে না, তাহলে যেকোনো ভোটকেন্দ্র বা ক্ষেত্রমতো সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে ভোটগ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে।’ এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এ বিধানের সঙ্গে আরেকটি উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসি, কিন্তু তা আমলে নেয়নি সরকার।

এরপরই ইসির ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে সরব হয়ে ওঠে বিরোধী দলগুলো। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু এ বিষয়ে বলেন, এটা করার মধ্য দিয়ে সরকার আবারও প্রমাণ করল, তারা ফের একতরফা নির্বাচন করতে চায়। নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমাদের শঙ্কাও সত্যি হলো যে, এ কমিশন সরকারের বাইরে নয়। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, সরকার অতীতে, বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেটি প্রমাণিত হলো। তাই এ ইসির অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া আত্মহত্যার শামিল। কারণ এ কমিশন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

ইসিকে ক্ষমতায়ন না করার বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না বিশ্লেষকরাও। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইসির ক্ষমতা প্রয়োগের অবারিত সুযোগ আছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর তারা কী করবে সেটা এখন দেখার বিষয়। ইসির ওপর যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাচ্ছে সেটা পরিষ্কার। এদিকে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে দুটি বিষয় সামনে এলো। প্রথমত ইসির দাঁত-নখ কেটে ফেলা হলো। দ্বিতীয়ত ইসি যাতে দানব হয়ে উঠতে না পারে, মানে ইসি চাইলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের ভোটও বাতিল করতে পারে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হলো।’

নির্বাচন কমিশন অবশ্য এসব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। নির্বাচনে কোনো অনিয়ম মেনে নেয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো কমিশন। এ বিষয়ে ইসি মো. আলমগীর গতকাল বলেন, ইসি কোনো পোস্টবক্স নয় যে, অন্যায় হবে আর তা মেনে নেবে। অন্যায়ভাবে একটা জিনিস (নির্বাচনী ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য) আসবে আর নির্বাচন কমিশন সেটা মেনে নেবে, এটা হবে না। এখানে যারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন তারা তো অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদে আছেন এবং এটা সাংবিধানিক পদ। এ রকম একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। রাবার স্ট্যাম্প তো হতে পারে না তারা। অবশ্যই দেখবে। তবে তারা সিদ্ধান্ত (গেজেট প্রকাশ করলে) নিয়ে ফেললে একবার আর পরিবর্তন করতে পারবে না। তখন সেটা আদালতে যেতে হবে।

মো. আলমগীর বলেন, একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। বারবার মিডিয়া ভুল নিখেছে যে, গেজেট প্রকাশের পর আমরা ফলাফল বাতিল করতে চাই। অনেকে আর্টিকেলেও তাই লিখছেন। একজন প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারও লিখেছেন যে, গেজেট হওয়ার পর ফলাফল বাতিল করতে চায়, এটা কোন অধিকারে। অনেকে মিডিয়ায় দেখে কনফিউজড হয়েছেন। তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল পাঠালে তা কমিশন গেজেট আকারে প্রকাশ করবে। গেজেট প্রকাশ মানেই হলো সেটা কমিশনের সিদ্ধান্ত। সেটা তো আর পরিবর্তন করা যাবে না। তখন আদালতে যেতে হবে। আমরা যেটা চেয়েছি, তা হলো রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো ফলাফল পাঠিয়েছেন, কিন্তু আমাদের কাছে অভিযোগ বা তথ্য আছে, যে নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপি হয়েছে, যা রিটার্নিং কর্মকর্তা আমলে নেয়নি। তখন আমরা সেই ফলাফল স্থগিত রেখে তদন্ত করব। এরপর যদি সেই অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া যায় তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার ফলাফলটাই গেজেট আকারে প্রকাশ করব। আর যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে গেজেট না ফলাফল বাতিল করব। এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ভোট চালকালীন ভোট বাতিলের যে ক্ষমতা [আরপিও-৯১(ক)], সেটা তো আছেই। কোনো খর্ব করা হয়নি। সেটা নিয়ে তো আমরা কোনো পরিবর্তন চাইনি। আমরা প্রস্তাব না দিলে সেটাতে পারিবর্তন আসবে না। আমরা যেসব বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি, মন্ত্রিপরিষদ কেবল সেগুলোই পরিবর্তন, পরিমার্জন করতে পারবে। এমনকি সংসদও তাই করবে।

মানবকণ্ঠ/এআই