manobkantha

সৈয়দপুরে চাকরি ছেড়ে আকতারের কৃষি খামার

করতেন লোভনীয় বেতনে আকর্ষণীয় চাকরি। সেই চাকরি ছেড়ে নিজেই কিছু করার চেষ্টা তাঁর। তাই এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার একটা উদ্যোগ নিলেন। নকল ও ভেজালের ভিড়ে মানুষ প্রকৃত জিনিসটি সঠিক দামে পৌঁছানোর ব্রতে যোগ দিলেন কৃষি, মাছ ও মুরগি খামারে। তিনি হলেন আকতার হোসেন। নিজস্ব পৈতৃক জমিতে এসব করে লাভবান ও সফল তিনি। নাম ছড়িয়ে পড়েছে সৈয়দপুর ছাড়াও বাইরের জেলাগুলোতেও।

১২ বছর আগে লোভনীয় বেতনের এ চাকরি ছেড়ে নিজ এলাকা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার পল্লীতে এসে ৩৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন বহুমুখী কৃষি খামার।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের পৈতৃক জমিতে গড়ে তোলেন গ্রীন গ্লেবাল এগ্রো লিমিটেড নামে কৃষি প্রতিষ্ঠান। পৈতৃক জমিতে ব্রি-২৯, ব্রি-৩৪, চিনগুড়াসহ মৌসুমী ধানের আবাদ করছেন। সেই ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর নিজস্ব চাতালে শুকান ও ধান বাছাই প্রক্রিয়া শেষে স্থানীয় মিলে ভাঙ্গান। এ থেকে ধানের বীজ ও চিনিগুড়া চাল তৈরি করে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছেন। তাঁর ধানের বীজ ও চিনিগুড়া চালের কদর বেড়েই চলেছে সর্বত্র।

খামারের মালিক কৃষিবিদ আকতার হোসেন বলেন, ঢাকায় চাকরি করতাম। কিন্তু মন পড়েছিল গ্রামের মাঠে ঘাটে। আমি স্বপ্ন দেখতাম, গ্রামে ছোট্ট একটি খামার গড়ে তুলব। যেখানে উৎপাদন হবে নিরাপদ খাদ্য। এমন স্বপ্নের কথা অবসপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা আমজাদ হোসেন সরকারকে জানালে বাবা এক বাক্যে রাজি হয়ে যান। বলেন, চলে আয়- আমাদের জমিতে খামার গড়ে তোল বাবা।

সরেজিমনে গিয়ে দেখা যায়, অভিজ্ঞ কৃষিবিদগণের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ মে বীজ ও চালের গুনগত মান নিশ্চিত করা হয় সেখানে। সনাতন পদ্ধতিতে ঝাড়াই ও বাছাইকৃত চাল পরিস্কার ও সাদা করার জন্য ইউরিয়া যুক্ত করা হয়না। চাল সংরক্ষণকালীন সময় কোনো প্রকার ফিউমিগেশন বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। চালে সুগন্ধি তৈরির জন্য কোনো প্রকার কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ যুক্ত করা হয় না। ফলে চালে প্রাকৃতিক সুগন্ধ অটুট থাকে। পলিশ বা কৃত্রিম ফ্লেভার মুক্ত হওয়ায় প্রাকৃতিক স্বাদ ও সঠিক মানের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।

এখানে প্রায় সাড়ে ৮ একর জমিতে কয়েকটি বড় বড় পুকুরে মাছ চাষ করছেন তিনি। সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প প্রভূতি জাতের মাছ চাষ করছেন। কৃত্রিমতা ছাড়াই মাছ বড় করছেন পুকুরে। তাঁর মাছের খামারের বৈশিষ্ঠ গুণগত মানসম্পন্ন ফিডের ব্যবহার। এছাড়াও খৈল, রাইস ব্রান ও মোলাসেস বাড়তি খাবার হিসাবে নিয়মিত দেয়া হয়। তাই পুকুরে মাছের মুল খাবারের সাথে প্রাকৃতিক খাবারের মজুদও থাকে পর্যাপ্ত। মাছ তাড়াতাড়ি বড় করার জন্য কোনো প্রকার কেমিক্যাল/ গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয় না। তাই নিরাপদ হিসাবে মাছ স্বাদ ও গুণাগুন সম্পন্ন। কোনো রেসিডুয়াল ইফেক্ট নেই। সঠিক ওজনের নিশ্চয়তা।

একই কায়দায় গড়ে তুলেছেন মুরগির খামার। মুরগির খামারেও গুণগত মানসম্পন্ন ফিড ব্যবহৃত হয়। নুন্যতম এন্টিবায়েটিক ব্যবহৃত হয়। কোনো রেসিডুয়াল ইফেক্ট নেই। দোকানে মুরগি বিক্রির আগমুহূর্ত পর্যন্ত ঠেসেঠেসে মুরগিকে খাওয়ানো হয় ওজন বাড়ানোর জন্য, কিন্ত এখানে তা করা হয় না।

জেলায় ব্যাপক সাড়া ফেলা আমজাদের খামার পরিদর্শনে প্রতিদিন কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজন আসছেন। আবার অনেকে নিজ উদ্যোগেও আসছেন খামার দেখতে। বোতলাগাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান জুন বলেন, আকতার হোসেনের কৃষি খামার অন্যান্য উদ্যোক্তদের জন্য একটি সফল উদাহরণ বটে। বড় অংকের চাকুরি ছেড়ে সফল কৃষি উদ্যোক্ত তিনি। তাকে দেখে অনেকে উৎসাহিত হচ্ছেন গ্রামে।

সৈয়দপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক শিউলী বলেন, খামারটি পরিদর্শনে গিয়ে অভিভূত হয়েছি। আকতারের মতো শিক্ষিত তরুণরা যদি এভাবে নিরাপদ খাদ্য যোগান দেন, তাহলে সুস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হবে না।

আলাপকালে আকতার হোসেন আরও জানান, সামাজিক দায়বদ্ধ থেকে ইস্পাহানীর লোভনীয় চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্ত হয়েছি। মানুষকে ভালো কিছু উপহার দেওয়ার জন্য কৃষি, ধান, চাল ও মাছ চাষের মতো ব্যবসা করছি। এতে স্বাধীনতা রয়েছে। আমার কাজ দেখে এলাকার মানুষ অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। শিক্ষিত চাষির কাজে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন এলাকার মানুষ। ফলে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনায় কাজ করছেন আকতার হোসেন।

কৃষিবিদ আকতার ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকত্তর করেছেন। তিনি ইস্পাহানি কোম্পানির সিনিয়র সাইনটিস্ট ছিলেন। এখন চাকরি ছেড়ে হয়েছেন উদ্যোক্তা।

তিনি মনে করেন, হাইব্রিড পদ্ধতির চাষ ব্যবস্থা সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জমিতে যথেচ্ছভাবে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার মানবদেহের জন্য ভয়াবহ। তাই তিনি তার পুকুরে কোনো কেমিক্যাল ফিড ব্যবহার করেন না।
অনেক ভালো ব্যবস্থাপনায় গড়া ভবিষ্যতে তার খামারটি অ্যাগ্রো ট্যুরিজমের (কৃষি পর্যটন) একটি খাত হয়ে উঠবে বলে বনে করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।