manobkantha

উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন দেশের ২৫ শতাংশ মানুষ

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অন্তত ২৫ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। এর কারণে স্ট্রোকসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। এই অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ সঠিক পদ্ধতিতে নির্ণয় জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (৮ জানুয়ারি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এ ব্লক মিলনায়তনে সেন্ট্রাল সাব কমিটির উদ্যোগে 'ইপারটেনশনসংক্রান্ত মাসিক সেন্ট্রাল’ সেমিনারে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ একটি বড় বোঝা। হাইপারটেনশনসহ সব রোগের চিকিৎসা শুরু হয় রোগ নির্ণয়ের প্যারাম্যাটার বা পরিমাপ দিয়ে। এজন্য পরিমাপটা যথাযথ হতে হয়। রক্তচাপ মাপার পূর্ব শর্ত হলো, সঠিক মাপের কাপ ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক কাপ ফলো করা উচিত।

রক্তচাপ মাপার পদ্ধতির বিষয়ে আলোচকরা বলেন, রক্তচাপ অবশ্যই দুই হাতের বাহুতে মাপতে হবে। যদি দুটি হাতের প্রেসারের তারতম্য থাকে তবে অবশ্যই যেটির প্রেসার বেশি সেটি সঠিক পরিমাপ হিসেবে নিতে হবে। যখন রোগীর প্রেসার মাপা হয় তখন রোগীকে অবশ্যই তার পেছনে ভরের সাপোর্ট নিয়ে বসতে হবে, পা আড়াআড়ি করে বসা যাবে না। ব্লাড প্রেসার মাপার আগে অবশ্য পাঁচ মিনিট আরামে চুপচাপ বসে থাকতে হবে।

বক্তারা বলেন, প্রেসার পরিমাপের জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন গাইডলাইন আছে। আমেরিকান কলেজ ও কার্ডিওলজির গাইডলাইন মতে সাধারণ সিস্টোলিক প্রেসার ১২০ মিমিএইচজি এর কম ও ডায়াস্টোলিক ৮০ মিমিএইচজি বেশি প্রেসার। এটিকে ইলেভেটেড হিসেব করা ধরা হয় সিস্টোলিক ১২০-১২৯ মিমিএইচজি এবং ডায়াস্টোলিক ৮০-৮৯ মিমিএইচজি। তবে হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রে স্টেজ -১ এর ক্ষেত্রে সিস্টোলিক ১৩০-১৩৯ মিমিএইচজি এবং ডায়াস্টোলিক ৮০-৮৯ মিমিএইচজি। হাইপারটেনশন স্টেজ-২ এর ক্ষেত্রে সিস্টোলিক ১৪০ মিমিএইচজি এবং ৯০ মিমিএইচজি সমান বা কম প্রেসার। চিকিৎসার সময় ঠিকমত প্রেসার না মাপতে পারলে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

প্রেসার মাপার দুই ধরনের বিপি মেশিন রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, এর একটি হলো ম্যানুয়াল স্ফিগমোম্যানোমিটার। এর আবার দুটি ধরন আছে- ক. মার্কারি স্ফিগমোম্যানোমিটার: পারদস্তম্ভের উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে রক্তচাপ পরিমাপ করার যন্ত্রকে বলে মার্কারি স্ফিগমোম্যানোমিটা; খ. অ্যানেরয়েড স্ফিগমোম্যানোমিটার: এটি মার্কারি স্ফিগমোম্যানোমিটারের তুলনায় অধিকতর নিরাপদ।

অপরটি হলো ডিজিটাল স্ফিগমোম্যানোমিটার। প্রেশার সেন্সর ও মাইক্রোপ্রসেসরের সমন্বয়ে এটি একধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই এটি ব্যবহার করা যায়। তবে পরিবেশের কথা চিন্তা করে ধীরে ধীরে মার্কারি স্ফিগমোম্যানোমিটার বাদ দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো প্রেসার মাপার যন্ত্র আসছে সেগুলো চাহিদা মাফিক মানদণ্ডের নয়। দিন দিন যত মেশিনপত্র বাইরে থেকে আসছে ততো মান খারাপ হচ্ছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় ডিজিটাল প্রেসার মেশিনের চাহিদা বাড়ছে। এমন দিন আসবে যেদিন সকলেই ঘরে বসে ব্লাড প্রেসার মাপবে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নানা পরামর্শ দিয়ে সেমিনারে বলা হয়, রোগীর জন্য নির্ধারিত প্রেসক্রাইভড ওষুধ খেতে হবে। এজন্য সকল জায়গায় সরকারি ওষুধ সরবরাহ বাধ্যতামূল করতে হবে। হাইপারটেনশন প্রতিরোধের জন্য ধূমপান গ্রহণ বন্ধ করা, এলকোহল খাওয়া বন্ধ করা এবং নিয়মিত শরীর চর্চা করা উচিত। এছাড়া ওজন কমানো, হৃদরোগ প্রতিরোধে খাবার লবণ কম খাওয়া, প্রতিদিন সবজি বা ফল খেতে হবে। খাদ্যে স্বাস্থ্যসম্মত তেল ব্যবহার, লাল মাংস কম খাওয়া, সুগার কম খাওয়া, মাছ খাওয়া এবং ওমেগা ও ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার সপ্তাহে অন্তত দুইবার খেতে হবে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা সেন্ট্রাল সেমিনারে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করে থাকি, যা সবার জন্য প্রযোজ্য। আজকের বিষয় হাইপারটেনশন। হাইপারটেনশন নিয়ে জানাশোনা কোনো বিভাগের যেন না লাগে। আমাদের এখানে ৫৭টি বিভাগের সবার এ নিয়ে জ্ঞান থাকতে হয়। অপারেশন করার আগে ব্লাড প্রেসার বেশি থাকলে অপারেশন করা যায় না। যে রোগীকে ট্রিটমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন, সে রোগীকে কত পর্যন্ত ব্লাড প্রেসার রাখা লাগবে তা অবশ্যই চিকিৎসককে জানতে হবে। যারা মোটা তাদের প্রেসার একরকম, স্মোকারদের প্রেসার একরকম হবে।

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ হাইপারটেনসিভ। হাইপারটেনশন যাতে না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। হাইপারটেনশন হলে হার্ট অ্যাটাক হবে, কার্ডিও মাইয়োপ্যাথি হবে, নিউরোলজিক্যাল ডিসওর্ডার হয়ে স্ট্রোক হবে, চোখে রেটিনোপ্যাথি হবে, নেত্রোপ্যাথি হবে।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, যারা বয়স্ক তাদের অবশ্যই নিয়মিত ব্লাড প্রেসার মাপতে হবে। যাদের বয়স তিন থেকে দশ বছর তাদের ব্লাড প্রেসার মাপতে হবে। যারা মোটা তাদের নিয়মিত প্রেসার চেক আপ করতে হবে। যারা সুগার খান তারা মাঝে মাঝে প্রেসার চেক আপ করতে হবে। কাঁচা লবণ খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে।

বিএসএমএমইউএ সেন্ট্রাল সাব কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, ইউজিসি অধ্যাপক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সজলকৃষ্ণ ব্যানার্জী প্রমুখ।

মানবকণ্ঠ/এসআরএস