manobkantha
‘গুম’ প্রতিরোধ দিবসে স্বজনদের কান্নাভেজা আকুতি

শিশুদের সঙ্গে বড়রাও কাঁদলেন

‘গুম’ প্রতিরোধ দিবসে স্বজনদের কান্নাভেজা আকুতি

‘সবাই সবার বাবার সাথে স্কুলে যায়। আমিই শুধু যেতে পারি না। আমি কি আমার বাবার সঙ্গে স্কুলে যেতে পারব? আমার কি দোষ যে আমি আমার বাবার সাথে স্কুলে যেতে পারব না!’ বাবাকে ফিরে পেতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ আকুতি ১১ বছর বয়সী আদিবা ইসলামের। বাবাকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এভাবেই আকুতি জানায় অবুঝ শিশুটি। ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধনে আরও অনেকের সঙ্গে কাঁদছিল শিশুটি, যাদের স্বজনরা ‘গুমের’ শিকার হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। একই উপলক্ষে নয়া পল্টনে বিএনপি আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেয় বংশাল থানা ছাত্রদলের সভাপতি মো. সোহেলের ছোট্ট মেয়ে সাফা ও পল্টন থানা ছাত্র দলের সভাপতি পারভেজ রেজার মেয়ে হৃদি।

কান্না কণ্ঠে সাফা বলে, ‘আমার বাবাকে ওরা নিয়ে গেছে। আমি বাবাকে একবারও দেখি নাই। আমার বাবাকে দেখতে ইচ্ছা করে আমি দেখতে পাই না।’ চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে তার ‘পাপা’কে না পাওয়ার বেদনার কথা তুলে ধরে ছোট্ট এই শিশুটি। আরেক শিশু হƒদি বলে, ‘‘আমার পাপাকে ফিরিয়ে দেন, প্লিজ আমার পাপাকে ফিরিয়ে দেন আপনারা। আমি ছোট্ট থেকে বড় হয়ে গেছি বলতে বলতে।’ ‘গুম’ হওয়া বাবাকে ফিরে পেতে সন্তান ও স্বজনদের কান্নাভেজা আকুতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও কেঁদেছেন। নয়াপল্টনে উপস্থিত অন্যান্য নেতা-কর্মী অনেককে নাড়া দেয়।

গতকাল ৩০ আগস্ট ছিল আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। সারা পৃথিবীতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হচ্ছে আজ। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়্যারেন্স’ সম্মেলনে যে আন্তর্জাতিক সনদ কার্যকর হয় তাতে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং একই সঙ্গে তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

এদিকে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষ্যে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। আসকের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ২৮ জন গুমের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ৫ জন ফেরত এসেছে। এখনও ১১ জন গুম রয়েছেন। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্বজনরা অভিযোগ তুলেছেন। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ৫৭ জন ফেরত এসেছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার, স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন যে, বিশেষ বাহিনী-র‌্যাব, ডিবি পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচয়ে সাদা পোশাকে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তুলে নেয়ার অভিযোগ ভিকটিমের স্বজনদের।

মেরে ফেললে কবর দেয়ার জন্য লাশটা ফেরত দিন: বাবা মো. সোহেল যখন নিখোঁজ হন, তখন সাদিকা সরকার সাফার বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। সেই সাফার বয়স এখন ৯ বছর। সে ঢাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দীর্ঘ ৯ বছরে সাফার বাবা সোহেলের খোঁজ মেলেনি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মা নিলুফা ইয়াসমিনের হাত ধরে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে আসে সাফা। ফুটপাতে একটি চেয়ারে বাবার ছবি হাতে নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই সাফা বলে, ‘আমার বন্ধুদের সবার বাবা আছে। বাবার সঙ্গে তারা স্কুলে আসে। আমি কখনোই বাবাকে দেখিনি। বাবা ফিরে এলে তার হাত ধরে স্কুলে যাব।’

সাফাদের মতো আরও ৬৫টি পরিবার প্রিয়জনের খোঁজ পেতে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে। এই পরিবারগুলোর সদস্যরা শাহবাগের মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আয়োজিত এই মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তারা তাদের গুম হওয়া স্বজনদের ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। মানববন্ধনের আয়োজক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। সোহেল ছিলেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেয়া হয়। তার পর থেকে আর খোঁজ মেলেনি। তার স্ত্রী নিলুফার বলেন, সোহেলের খোঁজে কত জায়গায় গিয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। আমার বিশ্বাস, সোহেল একদিন ফিরে আসবে।

জানি না, বাবা জীবিত নাকি মৃত: ২০১৯ সালের ১৯ জুন ‘গুম’ হন মিরপুরের কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন। সে সময় তার মেয়ে আনিশা ইসলাম সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এখন সে দশম শ্রেণিতে পড়ে। বাবার খোঁজ পাওয়ার দাবি নিয়ে সে আজ তার মা নাসরিন জাহানের সঙ্গে  মানববন্ধনে এসেছিল। আনিশা বলে, ‘তিন বছর ধরে বাবার জন্য কাঁদছি। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আমি হতভাগ্য সন্তান। মোনাজাতে বসে বাবার জন্য কি দোয়া করব, তা নিয়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই। আমি একবার দোয়া করি, আল্লাহ, তুমি আমার বাবাকে বেহেশত নসিব করো। আবার দোয়া করি, আল্লাহ, তুমি আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও। আমি জানি না, আমার বাবা জীবিত নাকি মৃত। আমি আবার বাবার সন্ধান চাই।’

মৃত্যুর আগে মা ডাক শুনতে চাই: ২০১৬ সালে বাড্ডার বাসা থেকে রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন তপুকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তপুর মা সালেহা বলেন, ‘আমার সন্তান কেন গুম হলো, তা সরকারের কাছে জানতে চাই। তার কি দোষ ছিল, কি অন্যায় ছিল, তা জানতে চাই। অন্যায় করলে তার বিচার হোক।’ তিনি বলেন, ‘এখন যে ‘আয়নাঘরের’ কথা শুনতেছি, সেটির তদন্ত করা হোক। আমি এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি। কখন মারা যাই জানি না। মারা যাওয়ার আগে একটিবার সন্তানের মুখে মা ডাক শুনতে চাই।

মেরে ফেললে ভাইয়ের লাশটা ফেরত দেন: ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকার ইন্দিরা রোড থেকে ‘নিখোঁজ’ হন বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। মানববন্ধনে তার ভাই খুরশিদ আলম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাদাপোশাকে থাকা লোকজন চৌধুরী আলমকে তুলে নেন। অনেক কাকুতি-মিনতি করে বলেছি, আমার ভাইকে যদি মেরে ফেলে থাকেন, তাহলে কবর দেয়ার জন্য লাশটা ফেরত দেন। সরকারের কাছে কিছু চাই না, কিছু চাওয়ার নেই। আমরা বিচারও চাইব না। তবু ভাইয়ের লাশটা ফেরত দেন।’

স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাবি: মানববন্ধনে মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন বলেন, ‘গুমের শিকার হওয়া যারা ফিরে এসেছেন, তারা কোনো কথা বলছেন না। এমন একটা পরিবেশে তারা ছিলেন, যেখান থেকে ফিরে এসে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের যেখানে রাখা হয়েছে, সেটি আয়নাঘর হোক বা অন্য কোনো সেফ কাস্টডি হোক, সেখান থেকে ফিরে তারা একটি শব্দও বলতে চান না। সরকারের পক্ষ থেকে এখন উদ্যোগ গ্রহণ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে হবে। আর যেসব গোপন বন্দিশালার তথ্য পাওয়া গেছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এই বন্দিশালাগুলো যারা পরিচালনা করছেন, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক।’

আমাকেও এমন ঘরে রাখা হয়েছিল-মান্না: ‘আয়নাঘর’ প্রসঙ্গ টেনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমাকেও এই রকম একটা ঘরে রাখা হয়েছিল। দুই ঘণ্টা চোখ বেঁধে আমাকে ঘোরানো হয়। তারপর ওই ঘরে আমাকে তোলা হলো। সেই ঘরে কোনোরকমে একটা চৌকি ফেলা যায়। ওই ঘরের কোনো জানালা নেই। একটা দরজা আছে, সেটি বন্ধ করে দিলে নিশ্বাস নেয়ার পর্যন্ত জায়গা নেই।’ গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব নুরুল হক বলেন, ‘গুম হওয়া ব্যক্তিরা আয়নাঘরে বন্দি আছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সুস্পষ্ট বক্তব্য চাই। সুস্পষ্ট বক্তব্য না পেলে সেই আয়নাঘর ঘেরাও করে বন্দিদের মুক্ত করতে হবে।’

নিখোঁজদের ফিরে পেতে পল্টনেও স্বজনদের কান্নাভেজা আকুতি: আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপি আয়োজিত মানববন্ধনে ছাত্র দলের গুম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য তাদের শিশু সন্তানরা আকুতি জানালে তাদের কান্না দেখে বিএনপি মহাসচিবকেও আবেগপ্রবণ হতে দেখা গেছে। এ সময় বংশাল থানা ছাত্র দলের সভাপতি মো. সোহেলের ছোট্ট মেয়ে সাফা ও পল্টন থানা ছাত্রদলের সভাপতি পারভেজ রেজার মেয়ে হƒদিসহ অনেকেই ছিল। তারা তাদের মনের কষ্টের কথা বলে সাবলীলভাবে। হƒদি ও সাবা ছাড়াও গুম হওয়া ছাত্রদলের সাইফুর রহমান সজীবের বাবা শফিকুর রহমান, সেলিম রেজা পিন্টুর বোন নদী, সাজেদুল ইসলাম সমুনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলিও তাদের মনের কষ্টের কথা বলেন। মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে গুম হওয়া, বিচারবহিভর্‚ত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়ে নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে। অনুষ্ঠানস্থলে গুম ও বিচারবহিভর্‚ত হত্যার দৃশ্য নেতা-কর্মীরা অভিনয় করে প্রদর্শন করলে নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি কাড়ে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গুম করে নিয়েছে যাদেরকে, তাদের অপরাধ কি ছিল? তাদের অপরাধ ছিল একটাই। সেটা হচ্ছে- স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে তাদের অধিকার নিয়ে বাস করতে চেয়েছিল। আজকে এই আওয়ামী লীগের সরকার, শেখ হাসিনার সরকার গত ১৫ বছর ধরে আমাদের সেই অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছে।’ ভিকটিম পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গুম হওয়া পরিবার যারা এসেছে এখানে তাদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, তোমরা একা নাও, তোমাদের সঙ্গে সারা বাংলাদেশের মানুষ আছে, সবাই লড়াই করবে।’  

মানবকণ্ঠ/এআই