manobkantha

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আরেক নাম

বঙ্গবন্ধুর সকল ভাবনার মূলে ছিলেন সাধারণ মানুষ। সেই শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি কৃষকের কল্যাণ, শ্রমিকের কল্যাণ, সাধারণের মঙ্গল-ভাবনায় ছিলেন সমর্পিতপ্রাণ। প্রশাসক হিসেবেও সর্বক্ষণ তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল সাধারণের দিকে। তাঁর দেয়া সংবিধানই এর বড় প্রমাণ। সাধারণ মানুষকে তিনি প্রজাতন্ত্রের মালিক বানাতে চেয়েছেন ওই সংবিধানের মাধ্যমে। তাঁর শাহাদাতবরণের পর স্বদেশ হাঁটতে থাকে অন্ধকার ও অনিশ্চিত এক গন্তব্যের দিকে। দীর্ঘ একুশ বছর ধরে উল্টোপথে হাঁটা সেই বাংলাদেশকে ফের ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সড়কে তুলে আনেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর গরিব-হিতৈষী কৃষক ও উদ্যোক্তা-বান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে’ তুলে আনেন তিনি। সর্বত্রই অর্থনীতির গতিময়তা চোখে পড়ছে। যা ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আরেক নাম। তিনি বাঙালি জাতির পিতা। মানুষ ভালোবেসে তাঁকে জন-উপাধি দিয়েছে বঙ্গবন্ধু। এই নাম এখন সর্বদাই ‘স্বতোৎসারিত’। কবি মহাদেব সাহার কথাই ঠিক, ‘লিখি বা না লিখি শেখ মুজিব বাংলা ভাষায় প্রতিটি নতুন কবিতা।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘মুজিব গোলাপ হয়ে ফোটে, লাল পদ্ম হয়ে ফোটে হৃদয়ে হৃদয়ে।’ কেউ চাইলেই কি সেই হৃদয়কে অস্বীকারের উপায় আছে? তিনি যে রয়েছেন সর্বত্র।

তিনি তাঁর নান্দনিক নেতৃত্বের গুণে বাংলাদেশের ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ও উন্নয়নের সংগ্রামে ভরসার ছায়া হয়ে আছেন। সংগ্রামী এই রাজনৈতিক শিল্পীর ক্যানভাসে উদ্ভাসিত হয়ে আছে বাংলাদেশ নামক এক রঙিন মানচিত্র। এই শিল্পীর ক্যানভাসে লেপ্টে আছে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিসংগ্রাম ও দরদি নেতৃত্বের অসামান্য সব প্রতিচ্ছবি। একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। দেশটিকে কী করে সমৃদ্ধ ও জনবান্ধব করা যায় সেই অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামেও তিনি ছিলেন অবিচল। আর তাই অল্প সময়ের মধ্যেই একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল। ছিল খাদ্যাভাব। ছিল দারিদ্র্য। ছিল দুর্নীতি। কিন্তু তিনি পুরো সমাজের ও প্রশাসনের খোল-নলচে বদলে দেয়ার আমূল সংস্কারবাদী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। নয়া ব্যবস্থায় খাদ্যোৎপাদন বাড়ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম এবং পাশাপাশি তেল ও খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। তাই খাদ্যসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম হয়ে উঠেছিল আকাশছোঁয়া। ঘাটতির অর্থনীতিতে চোরাকারবারি, মজুদদার ও দুর্নীতিবাজরা ছিল সক্রিয়। আর উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পাকিস্তানি নষ্ট ক‚টনীতিতে প্রভাবিত বিশ্ব মোড়লদের একাংশের খাদ্য সাহায্যকে ঘিরে চলছিল ভয়ংকর সব ভ‚রাজনৈতিক খেলা। তা সত্তে¡ও বঙ্গবন্ধু ঘরে ও বাইরে সাহসের সঙ্গে তাঁর গণমুখী রাজনীতি, অর্থনীতি ও ক‚টনীতি সচল রেখেছিলেন। বিচক্ষণ মুদ্রানীতি, ডিমনিটাইজেশন, খাদ্য ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।

তবে দলের ও দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মীরজাফরদের শিরোমণি ছিলেন খন্দকার মোশতাক। এ ছাড়া অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরাও বিপ্লবোত্তর একটি দেশের পুনর্নির্মাণে সহযোগিতার বদলে সর্বক্ষণ সমালোচনাই করছিলেন। অস্থির তরুণদের আরও অস্থির করে তুলছিলেন। আর আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর অন্দরমহলে তো চলছিল ষড়যন্ত্রের নানা কসরত। এমন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী রূপান্তরবাদী নেতৃত্বের গুণে দেশ দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন তিনি। কৃষি উন্নয়নের জন্য বীজ, সার ও ঋণ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন দ্রæত। কৃষকদের ছাড়াও নগরের বেশির ভাগ মানুষের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাতে তিনি ছিলেন খুবই তৎপর। প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ ছাড়াও গ্রামগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রাধিকার দেন। আর নিজ নিজ ধর্ম পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার দিয়ে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার না করার নীতি গ্রহণ করেন। সমাজের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতার কারণে যাতে শান্তি বিনষ্ট না হয় সে জন্যই তিনি এই উদারনীতি গ্রহণ করেছিলেন। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন সম্প্রতি এলএসইতে এক ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেছেন যে শুধু এই নীতির কারণেই বঙ্গবন্ধু বিশ্ববন্ধু হওয়ার অধিকার রাখেন। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও তিনি শিক্ষা কমিশন, ইউজিসি স্থাপনসহ অনেক সংস্কারধর্মী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষিতে ২৪ শতাংশ বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে ৭.১ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছিলেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনে মনোযোগী হয়েছিলেন। সব ধরনের অবকাঠামো পুনর্বাসনে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। সারা দুনিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে তিনি ছিলেন খুবই তৎপর।

আমাদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে এ দেশেরই কিছু ক্ষমতালোভী কুসন্তান-পিশাচ বাঙালির মুক্তির এই মহানায়ককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওরা ভেবেছিল এই হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে চিরদিনের জন্য তাঁকে মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন আমাদের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে। তিনি চিরজাগ্রত আমাদের গল্পে, কবিতায়, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে। আছেন তিনি বাংলাদেশের অসংখ্য নদীর স্রোতোধারায়, পাখির ডাকে, রবীন্দ্রনাথের গানে, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় আর বিশাল সবুজ প্রান্তরে। দিন দিন তিনি আরও বড় হচ্ছেন। বিরাট হচ্ছেন। ব্যাপক হচ্ছেন। তিনি আছেন, থাকবেন চিরদিন বাংলাদেশের এবং সারা বিশ্বের বঞ্চিত মানুষের স্বপ্নপূরণের ভরসার প্রতীক হিসেবে।

নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর জীবন, তাঁর চিন্তা ও কর্ম তরুণ প্রজšে§র জন্য উপযুক্ত পাঠক্রম হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর শৈশব-কৈশোর থেকে শুরু করে কলকাতা ও ঢাকায় তাঁর ছাত্রজীবন এবং নেতৃত্বের ইতিহাস আমাদের তরুণদের উৎসাহিত করবে। তরুণ বয়সেই ভাষা-প্রশ্নকে রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে তিনি যে ভ‚মিকা পালন করেছেন এটি দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধিতার জায়গা থেকে নিজ দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে তিনি উদার ধর্মনিরপেক্ষ প্রধানতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে তিনি প্রতিফলিত করেছিলেন। শুরু থেকেই তাঁর এমন অসাম্প্রদায়িক অবস্থান আগামী প্রজš§গুলোকেও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়তে উৎসাহিত করবে।

স্বাধীনতা-পূর্বকালে অর্থনীতি তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর গভীর চিন্তা এবং এ দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও চাহিদার প্রতি বঙ্গবন্ধুর সংবেদনশীলতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন তাঁর ছয় দফা কর্মসূচি। উন্নয়নের সুফল সবার কাছে, বিশেষত প্রান্তে থাকা নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে তা যে বৃথা হয়ে যায়, তা তিনি জানতেন। তাই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণকে কেন্দ্রে রেখে ছয় দফা কর্মসূচি সামনে নিয়ে এসেছিলেন বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে। এই কর্মসূচি পুরো দলকে উজ্জীবিত করার পাশাপাশি পূর্ববাংলার শ্রমিক কৃষক-সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন পায়। আজকের তরুণরাও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে ভাবার সময় ছয় দফার পেছনে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ও এটি বাস্তবায়নে তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তা থেকে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

ছয় দফার প্রতিশ্রæতিগুলো বাস্তবায়নের জন্যই বঙ্গবন্ধু ১৯৭০-এ নির্বাচন করেছিলেন। জয়ী হয়ে খসড়া শাসনতন্ত্র তৈরির কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা মেনে নিতে পারেনি। তাই বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। তার আগেই বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন আর সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহŸান জানান। প্রকৃত অর্থেই গণমুখী নেতা ছিলেন বলেই তাঁর আহŸানে দল-মত-ধর্ম-নির্বিশেষে পুরো জাতি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।

স্বাধীন দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু স্বভাবতই সবাইকে নিয়ে কল্যাণমুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের অভিযাত্রা যদি অপশক্তিগুলো থমকে না দিত, তাহলে আজ আমরা কোথায় থাকতাম তা কল্পনা করাও কঠিন! তবু সান্ত¡না এই যে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম শেষে ফের দেশ ফিরেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে। বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে। বিশ্ব মহামারী ও মন্দা সত্তে¡ও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সাহসের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে। চ্যালেঞ্জ প্রচুর সামনে। তবু আমরা এই কারণে আশাবাদী যে প্রতিক‚ল পরিবেশকে বাগে এনে এগিয়ে চলার সংস্কৃতিকে পাথেয় করে নিশ্চয় পৌঁছে যেতে পারব আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। নাগরিক জীবনের কোলাহল, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বার্থের হানাহানি, ভণ্ডামি থেকে অনেক দূরে ছায়াঘেরা শান্তশীতল গ্রামীণ এক পরিবেশে তিনি এখন শায়িত। যাঁদের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, তাঁরাই তাঁকে সাধারণের বেশে পরম আদরে শুইয়ে রেখেছেন। আজ তাই আমাদের একান্ত প্রচেষ্টা হওয়া উচিত কী করে আমাদের নীতিতে ও কর্মে তাঁর আজীবনের স্বপ্ন-সাধারণের কল্যাণ-ভাবনাকে যুক্ত করা যায়। উদ্যোগ নিতে হবে আমাদের সমকালীন উন্নয়ন নীতি কৌশলকে কী করে বঙ্গবন্ধুর ভাবনাপ্রসূত সাংবিধানিক অঙ্গীকার-নির্ভর জনকল্যাণধর্মী, কৃষক ও  শ্রমিকদের জন্য আরও মঙ্গলাশ্রয়ী করা যায়। সেলক্ষ্যে আমাদের ফিরে আসতেই হবে। মুষ্টিমেয় কল্যাণের ঘোর বিরোধী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সর্বসাধারণের মঙ্গল-ভাবনায় সবসময় নিমগ্ন থাকা ছিল তাঁর স্বভাবের অন্তর্গত। তাই আজ আমরা যদি সত্যি তাঁর আদর্শের রূপায়ণ চাই, তাহলে আমাদের স্বতন্ত্র স্বদেশচিন্তায় উদ্ভাসিত উন্নয়ন-কৌশলকে আরও গরিবহিতৈষী ও লক্ষ্যভেদী করতে হবে। একই সঙ্গে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আগামীর উন্নয়ননীতিকে আরও উদ্যোক্তা-বান্ধব করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ।

মানবকণ্ঠ/এআই