manobkantha

জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা কাটছেই না

আশিকুর রহমান: করোনার পর থেকে মানুষের অর্থনীতির বুনিয়াদ সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই বিভিন্ন অজুহাতে পণ্যমূল্য বেড়েছে। সয়াবিন নিয়ে যে তুঘলকি কাণ্ড চলেছে তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বাজার নিয়ন্ত্রণে অপারগ। রমজানের ভিতরে বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল সেজন্য টাস্কফোর্স নিয়োগ, গোয়েন্দা বিভাগের নজরদারির কথা শুনে জনগণ আস্বস্ত হয়েছিল, সরকার ৪০টি পণ্যের দামও বেঁধে দিয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বিশ্ববাজারে মূল্য বৃদ্ধিও কথা বলে বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ল, আমাদের সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এমনকি আমাদের দেশের ক্ষেত- খামারে উৎপাদিত ধান- সবজির দামও বাড়ানো হলো। এখানেও নিয়ন্ত্রণের কোনো কিছুই চোখে পড়ল না। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ানোর কথা বলে আমাদের দেশের পণ্যমূল্যের দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু দাম কমলে কমে না। রমজানে যেসব পণ্যের দাম বাড়ল তা এখনও কমেনি বরং বিভিন্ন অজুহাতে বেড়েছে। একই ভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের বাজার দর আগে থেকেই বাড়ছিল, এবার নিম্বিনত্তের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানো হলো অনেকটা।

ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা (৪২.৫%), অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা (৫১.৬৮%) আর পেট্রোলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা (৫১.১৬%) বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে ভোক্তাপর্যায়ে খুচরা মূল্য ডিজেল ও কেরোসিন প্রতি লিটার ১১৪ টাকা, অকটেন প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা। ওই সময় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। তাতে দাম হয়েছিল ৮০ টাকা লিটার। তার আগে এই দুই জ্বালানি তেলের দাম ছিল লিটারে ৬৫ টাকা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) পরিশোধিত এবং আমদানি/ক্রয়কৃত ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলে মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তা পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, জনবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় আমজনতার স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।

যতদিন সম্ভব ছিল ততদিন সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির চিন্তা করে নাই। অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকটা নিরুপায় হয়েই কিছুটা এডজাস্টমেন্টে (সমন্বয়) যেতে হচ্ছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত তেলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে। ভারত ২২ মে থেকে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২.৭৬ রুপি এবং পেট্রোল প্রতি লিটার ১০৬.০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে, যা এখনও বিদ্যমান আছে। এই মূল্য বাংলাদেশি টাকায় যথাক্রমে ১১৪.০৯ টাকা এবং ১৩০.৪২ টাকা। (১ রুপি = ১.২৩ টাকা হিসাবে)। অর্থাৎ বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ৩৪.০৯ এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ৪৪.৪২ টাকা কমে বিক্রয় হচ্ছিল। মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা থেকেও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া সময়ের দাবি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিগত ৬ মাসে (ফেব্রæয়ারি ২২ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত) জ্বালানি তেল বিক্রয়ে (সব পণ্য) ৮০১৪.৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। বর্তমানে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার পরিস্থিতির কারণে বিপিসির আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাতে যৌক্তিক মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব আমাদের দেশের বাজারে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেভাবে তেলের দাম বাড়ানো হলো এভাবে না বাড়িয়ে আস্তে ধীরে বাড়ানো যেত বলে আমরা মনে করি। এখানে বলা হয়েছে ভারতে তেলের দাম বেশি, বাংলাদেশে কমের কথা। কিন্তু ভারতে বিশ্ব বাজারে দাম কমলে তো দাম কমবে। আমাদের দেশে এই রীতি তো নেই। ইতোমধ্যে গাড়িতে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছে। করোনার পরে মানুষকে জিম্মি করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। এবারও সে প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? জ্বালানি তেল নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট।  

মানবকণ্ঠ/এআই