manobkantha

সারের দাম বাড়ালে বাড়বে ফসলের দাম

আশিকুর রহমান: কৃষিজাত পণ্য নিয়ে একের পর এক নৈরাজ্য লেগেই আছে। এ দেশ এখনও কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি এ দেশের প্রাণ। কিন্তু সংকটের বিষয় হলো- কৃষি সিন্ডিকেটের ছোবল থেকে মুক্ত হতে পারছে না। কৃষক ঘাম শ্রম ব্যয় করে কৃষিকাজ করে, কিন্তু যে বছর তার বাম্পার ফলন হয় সেবার সে না খেয়ে থাকে। বাজারে দাম কিন্তু বাড়তিই থাকে শুধু ঠকে কৃষক। এবারে বছরের শুরুতে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন কৃষক। তখন ডিজেলে ভর্তুকির দাবি জানানো হলেও কৃষিমন্ত্রী সারে ভর্তুকি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরের তুলনায় ভর্তুকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে চলতি বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সারের দাম বাড়ানো হবে না। প্রয়োজনে ভর্তুকি আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু হঠাৎ গত ১ আগস্ট ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ছয় টাকা বাড়ানো হয়। দাম বৃদ্ধির খবরে বাজারে শুরু হয়েছে নৈরাজ্য। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। আবার কোথাও কোথাও বেশি দামে সার মিলছে না। সরকার শুধু ইউরিয়ার দাম বাড়ালেও অন্যান্য সারের দামও কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় প্রান্তিক কৃষকরা রয়েছেন উদ্বেগ উৎকণ্ঠায়। কৃষিমন্ত্রী  যদিও বলেছেন দাম বৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদনে পড়বে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হবে তা বলা যায় না। আমরা দেখেছি দেশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়ে এখানের সিন্ডিকেট শক্তিশালী।

ইউরিয়ার দাম বাড়ানোর কারণে ফসলের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। এতে খাদ্য সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। একথা যেমন ঠিক তেমন এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সংকট বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে তোলার একটি মহল মুনাফা লুটবে। সে সুযোগ যাতে না পায় সে বিষয়টি দেখতে হবে।

কৃত্রিম সংকট ইতিমধ্যে মফস্বলের বাজারগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার এক কৃষকের বক্তব্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে. মঙ্গলবার স্থানীয় বাজারে সার কিনতে গেলে প্রথমে বলা হয় সার নেই, পরে দাম বেশি দিলে সার দেয়া হয়। একই অবস্থা বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের দশমাইল এলাকায় সাথী এন্টারপ্রাইজের নামে একটি সারের ডিলারের। ওই লাইসেন্সে সরকারি বরাদ্দের ইউরিয়া সার উত্তোলন করছেন। জুন-জুলাইয়ে বরাদ্দের অবিক্রীত ইউরিয়া সার প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি বিক্রি করছেন তিনি। পুরো উপজেলার অধিকাংশ ব্যবসায়ী বাড়তি দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা।

সরকার শুধু ইউরিয়ার দাম বাড়ালেও অন্যান্য সারের দামও কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করছেন সারাদেশের ব্যবসায়ীরা। কুষ্টিয়ার শহরতলিতে ১৫ টাকার পটাশ ১৭ টাকায়, এক সপ্তাহ আগে কেনা ১৬ টাকার ইউরিয়া ২০ টাকা ও ১৬ টাকার ফসফেট বা ডিএপি কিনতে হয়েছে ২২ টাকায়। যে সার কিনতে আগে ১ হাজার টাকা লাগত, এখন লাগছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সব ধরনের সারের দাম ডিলার কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি রেখেছেন। ১০ কেজি সার চাইলে পাওয়া যাচ্ছে ৫ কেজি। তাও ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বাজারে পটাশ সারের ভয়াবহ সংকট বলে চালানো হলেও বেশি দাম দিলে এটা পাওয়া যাবে এটা নিশ্চিত।

সবজি চাষি সাদ্দাম হোসেন বলেন, সরকার বাড়ালো ইউরিয়া সারের দাম। আর ব্যবসায়ী ও ডিলাররা বাড়িয়েছেন সব সারের দাম। ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ৬ টাকা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনে প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন কৃষিমন্ত্রী । আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম কমলে দেশেও সারের দাম কমানো হবে বলেও বলেছেন তিনি। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- বিশ্ববাজারে বস্তুর দাম বাড়লে আমাদের দেশেও বাড়বে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের বস্তুর দাম দেখিয়ে ৩ গুণ দাম বাড়ানো হয়েছে এর আগেও। সারের দাম এর আগে বাড়েনি কিন্তু সবজির দাম কেন বাড়তি? করোনার পরে মানুষের অর্থনীতির বুনিয়াদ আর চাঙ্গা হয়নি শুধুমাত্র অস্থিতিশীল বাজার ব্যবস্থার কারণে। রমজানের ভিতরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমবে বলা হয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এবারে সারের দাম নিয়ন্ত্রণ না করলে ও কৃষকের সার প্রাপ্তি নিশ্চিত না করলে শীতের সবজি চাষ অসম্ভব হয়ে যাবে। তাই কৃষকের সার পাওয়া নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এআই