manobkantha

শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক

আশিকুর রহমান: নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনা আর সাভারে ছাত্রের মারধরে শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ-প্রতিবাদের ঝড় বইছে। এর মধ্যেই গত বুধবার শ্রেণিকক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের একজন অধ্যাপককে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। কেন শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে- প্রশ্নটি জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে দেশজুড়ে। শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো ঘটনার লাগাম টানতে তাগিদও দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশিষ্টজনেরা এসব ঘটনায় সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে পুরো সমাজেই অস্থিরতা বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষাঙ্গনে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করেন তারা।

বারবার শিক্ষকদের উপর হামলার ঘটনার নেপথ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের দ্ব›দ্ব এবং স্থানীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবকেও দায়ী করা হচ্ছে। নীরবে বেশ বড়সড় বদল ঘটে চলেছে পরিবারে, সমাজে। কোমলমতি বলে সমাজে চিরকাল প্রশ্রয় পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলাই যেখানে বেয়াদবি বলে বিবেচিত হতো এই সমাজে, সেখানে হরহামেশা অনেক শিক্ষক হচ্ছেন লাঞ্ছিত নিজেরই ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা। ছাত্রের অসত্য অভিযোগে মুন্সিগঞ্জের স্কুলশিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে জেলে নেয়ার ঘটনা ঘটল এই সেদিন। এটাই প্রথম ঘটনা ছিল না শিক্ষক হেনস্তার। শেষ ঘটনাও নয়। ঘটনা ঘটেই চলেছে, বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মহাবিদ্যালয়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও। ঘটনা আজকাল আর বেয়াদবি কিংবা হেনস্তায় সীমিত থাকছে না। এমনকি ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে নিজ ছাত্রের বেপরোয়া হামলায় গুরুতর আহত হন ঢাকার আশুলিয়ার শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান তিনি। উৎপল সরকার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতুকে গত বুধবার গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বাবা মোহাম্মদ উজ্জ্বলকেও গ্রেপ্তার করা হয় গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি তার ছেলেকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, সহায়তা করেছেন পালাতে। গত সোমবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিক্ষক মারা যান। এদিকে নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় শিউরে উঠেছে মানুষ। একটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের উপস্থিতিতে জুতার মালা পরিয়ে দিয়েছে তারই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এ সময় সামনে না থাকলেও ক্যাম্পাসেই উপস্থিত ছিলেন। নড়াইলে শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এত আলোচনা-সমালোচনার পরেও শিক্ষক লাঞ্ছনা থেমে নেই। এবারের ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

গতকাল শ্রেণিকক্ষের দরজায় আইন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক বেগম আসমা সিদ্দীকার গতিরোধ করেন একই বিভাগের ছাত্র আশিক উল্লাহ। তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং হত্যার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ আছে। আশিক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। আশিককে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।  কিন্তু কেন এসব ঘটনা ঘটে চলেছে? কেন বেপরোয়া হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীরা। এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভ‚মিকাই প্রধান উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী। তারা বলেন, পরিবারে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। বাচ্চারা সঠিক শিক্ষা পায় না। অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের রোল মডেল হতে পারছেন না। এ পরিবর্তনের পেছনে শিক্ষকদেরও কিছু দায় আছে জানিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, ঠিকমতো পাঠদান না করাসহ নানা কারণে অনেকে শিক্ষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক গতকাল এক বিবৃতিতে সাভারে উৎপল সরকারের হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে করা এবং তার পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া নড়াইলে অধ্যক্ষ স্বপন কুমারকে স্বপদে ফিরিয়ে আনাসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে এ সংগঠন। শিক্ষকদের ওপর হামলার পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনায় ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকার তেজগাঁও কলেজশিক্ষক ড. লতা সমাদ্দার, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের রুমা সরকার, নারায়ণগঞ্জ স্কুলশিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্জয় সরকার ও উমেশ রায়, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার স্কুলশিক্ষক মিলটন তালুকদার এবং নওগাঁ স্কুলশিক্ষক আমোদিনী পাল। পিতা-মাতার মতো শিক্ষকদেও উপরে এই আচরণ কোনো ভালো কাজের লক্ষণ নয়। পরিবার থেকে সমাজ সবখানে মানুষের সম্পর্কের যে ভাটা পড়ছে এসব তারই ফলাফল। শিক্ষদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক নিয়ে আমরা সবাই সচেতন। তারপরও এমন ঘটনা কেন ঘটে? এ ব্যাপারে পরিবারগুলোকে যেমন সতর্ক হতে হবে তেমনই শিক্ষক লাঞ্ছনার কুশীলবদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা একান্ত জরুরি।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এআই