manobkantha

আগামী নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

আদিত্য রহমান: গত ১৫ বছরে পৃথিবীর যত দেশ ইভিএম গ্রহণ করেছে, তার চেয়ে বেশি দেশ ইভিএম বাতিল করেছে। বাতিল করেছে এমন দেশের তালিকায় ইউরোপের বহু দেশসহ মালয়েশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্য রয়েছে। সম্প্রতি ভারতেও বিরোধী দলগুলো ইভিএমের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে। বর্তমানে পুরোপুরি ইভিএম চালু আছে শুধুমাত্র ভারত, ব্রাজিল, ফিলিপাইন এবং এস্তোনিয়ায়। তবে মূল কথা কিন্তু ইভিএম মেশিন নয়।

ক্ষমতাসীন দল যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ না চায় হাতে ভোট দিলেইবা যাবে আসবে কি? বিভিন্ন নিবন্ধ ও তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, ভোটব্যবস্থাপনাকে সহজতর করার লক্ষ্য থেকেই সর্বপ্রথম ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম পদ্ধতি চালু হয়। ইভিএম পদ্ধতির সময়কাল প্রায় ৬০ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিশ্বের অজস্র দেশে পুরোপুরি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তবে এটা মেশিনারি সংকট নয়। ইভিএমে ভোট টেম্পারিং করা যায়।

এ সংকট তো মেশিনের নয়। সংকট সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া তৈরি না করতে পারার। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইভিএমে  ভোট হয়, তাতে মেশিনের কোনো সংকট আছে বলে কেউ বলেনি। বলেছে টেম্পারিংয়ের কথা। ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডস ইভিএম ব্যবস্থা বাতিল করেছে কারচুপির কারণে নয়, বরং এই মেশিন টেম্পারিং করা যাবে না এ ধরনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না বলে। অর্থাৎ এখানে সংকট মেশিন নয়, সংকট কোনো দলের কারচুপি বা টেম্পারিং করার অভিযোগ। সেটা তো ইভিএম ছাড়াও হতে পারে। তাহলে ইভিএম সংকট কোথায়? তবে ব্যালটের চেয়ে ইভিএমের খরচ একটু বেশি হলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন।

বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় ইভিএমও অরক্ষিত। বিগত সময়ে ভোটের রাতে কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটলেও এখন দিনে কেন্দ্র দখল করে ইভিএমে জাল ভোট দেয়া সম্ভব। ইভিএমে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। ভোটের অনিয়ম দূর করার জন্যই ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে।

ভোটদানের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা না থাকায় অনেক দেশ ইভিএম পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং একথা স্পষ্ট যে, নির্বাচনের পরিবেশ যদি স্থিতিশীল থাকে তাহলে, ইভিএম কোনো সংকট নয়। সংকট নির্বাচনী পরিবেশ। সেটা ঠিক থাকলে যেকোনো পদ্ধতিতে ভোট নেয়া যায়। আর ঠিক না থাকলে কোনো পথই আশঙ্কামুক্ত নয়। তবে আমাদের দেশে ভোটকেন্দ্রের গোপন কক্ষে সন্ত্রাসী-ডাকাত দাঁড়িয়ে থাকাটাই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএমের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবীব খান।

সোমবার (৩০ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

আহসান হাবীব বলেন, ইভিএমের মধ্যে কোনো চ্যালেঞ্জ আমি দেখি না। চ্যালেঞ্জ একটাই। একটা ডাকাত-সন্ত্রাসী গোপন কক্ষে একজন করে দাঁড়িয়ে থাকে-আপনার ভোট হয়ে গেছে, চলে যান। তবে নির্বাচনে সেটা হবে না। সিসি ক্যামেরা থাকবে, সাংবাদিকদের অ্যালাউ করা হবে। ভেতরে ঢোকেন, ছবি দেন, সঙ্গে সঙ্গে ভোট বন্ধ করে দেয়া হবে। নির্বাচনে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আমরা টোটাল স্বাধীন। দুর্বলতা নেই। কোনো চাপ নেই। স্বাধীনভাবে কাজ করব, আমরা চেষ্টা করব সব প্রার্থী নিয়ে কাজ করার। যার ভোট সে দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে। সবকিছুর পরও নির্বাচন কমিশনারের কথায় এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগ কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ভোট কেন্দ্রের ভেতরে থেকে যদি কেউ কাউকে ভোট দিতে বাধ্য করেন বা বলেন আপনার ভোট হয়ে গেছে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক। নির্বাচন কমিশনার যদি প্রার্থী ও ভোটারকে তার ভোট যথাযথভাবে হবে তা নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে সে সংকট মত প্রকাশ অধিকারের। সংকট জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রকাশের। কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশে জনগণ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না-এটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতপ্রকাশের সুষ্ঠু পরিবেশ গঠন গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণের প্রথম শর্ত। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি দেশবাসীর সঙ্গে আমাদেরও।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এআই