manobkantha

বায়ু দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

আবীর সুজন: পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। এসব ভোগান্তির অন্যতম কারণ বায়ু দূষণ, যা আমাদের জীবনকে করে তুলছে অসহনীয়। ধুলাবালি মিশ্রিত বাতাসের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা দিনদিন বেড়েই চলছে। এই সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও, আমাদের কিছু সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ তা অনেক কমিয়ে আনতে পারে।

বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আমাদের রাজধানী প্রথম দিকেই রয়েছে। বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে ধুলাবালি। নির্মাণকাজের কারণে বাতাসে প্রচুর ধুলা যুক্ত হয়। এরপরে রয়েছে যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানি। এছাড়া নতুন একটি কারণে বাতাস দূষিত হচ্ছে, তা হলো বর্জ্য পোড়ানো। ঢাকায় এখন নানা ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হয় এবং এটা দিনদিন বাড়ছে। শিল্প কারখানার মধ্যে স্টিল রিরোলিং মিল বায়ু দূষণ করে, এরপরে আছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। এর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে চলছে চরম দায়িত্বহীনতার প্রতিযোগিতা। ঢাকা শহরের ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় এমন কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে ময়লার স্তূপ নেই। তা থেকে প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

এছাড়াও রাস্তার উন্নয়নের নামে কাজের দীর্ঘসূত্রতাও বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। বছরের পর বছর ওয়াসার কাজ, গ্যাসের লাইনের কাজ, ম্যানহোলের কাজ চলতেই থাকে। যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বায়ু দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। তাছাড়াও ঢাকার বাইরে থেকে আসা হাজার হাজার ট্রাক ও দূরপাল্লার যানবাহনের ধুলা ও ধোঁয়া এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজের ধুলার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত বায়ু দূষণের জন্য এখানকার বায়ু দূষিত হচ্ছে।

বায়ু দূষণ এক নীরব ঘাতক। দূষিত বায়ুর কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ু দূষণের জন্য শ্বাসকষ্ট ছাড়াও পেটের সমস্যা, ফুসফুসজনিত সমস্যা, চামড়ার সমস্যা, হাঁপানি বা এলার্জিজনিত সমস্যা, চোখ ও নাকের সমস্যা, যে কোনো সংক্রমণ, গর্ভকালীন সমস্যা এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এ দূষণ খুব মারাত্মক প্রভাব ফেলে যা তাদেরকে সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বে দূষিত বায়ূর শহরগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান।

১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ু দূষণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতেও রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জলবায়ু তথা প্রকৃতির এই যে পরিবতর্ন তা মানবসৃষ্ট। এই পরিবতের্ন প্রকৃতি কোনোভাবে দায়ী নয়, মানুষই দায়ী। বতর্মানে মানুষ নিজেদের স্বার্থের প্রকৃতির ওপর যেভাবে নিযার্তন চালাচ্ছে অতীতে এতটা বিধ্বংসীরূপে দেখা যায়নি কখনো।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বায়ু দূষণ রোধে ৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি বছরও এক দিনের জন্য নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী, যা অত্যন্ত  দুঃখজনক।

ইটভাটা থেকে সৃষ্ট দূষণ বন্ধে মালিকদেরকে জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে ও শুষ্ক মৌসুমে ধুলার দূষণ প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশনকে সঠিকভাবে রাস্তা পরিষ্কার এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ধুলা ছড়িয়ে পড়া বন্ধে নিয়মিত রাস্তায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তা-ঘাট ও ভবন নির্মাণের সময় নির্মাণকারীদের  নির্মাণের এলাকা ঢেকে রাখতে হবে এবং পানি ছিটানোর পাশাপাশি দূষণসংক্রান্ত নিয়মাবলি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে।

যত্রতত্র সিটি কর্পোরেশনের সংগৃহীত বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে হবে, শিল্পকারখানর বায়ু দূষণ কমাতে ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে, যানবাহন ও নৌযান থেকে দূষণ এবং কালো ধোঁয়া নির্গমন রোধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর খোঁড়াখুঁড়ি কাজের সমন্বয় সাধন করা ও বায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ঢাকার বায়ু দূষণ রোধে বেশি বেশি গাছ লাগানো দরকার। দূষণের জন্য দায়ী বিষয়গুলো সেগুলো এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই ঢাকাবাসীরা চরম দুর্দশায় পড়ে যাবে। এ জন্য চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, বায়ু দূষণ বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞজনদের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ আমলে নিতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/এআই