manobkantha

রক্ষা পাক নদী, ফিরে আসুক প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য

আবু সুফিয়ান সরকার শুভ: নদীমাতৃক আমাদের এ জš§ভূমিতে ছোট বড় নদীগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেহের শিরা উপশিরার মতো। নদীমাতৃক এ দেশে নদীর ভূমিকা ঠিক দেহের শিরা উপশিরার মতোই যার প্রবাহের মাধ্যমে এক বৈচিত্র্য রূপ ফুটে ওঠে প্রাকৃতির আবর্তন সঠিকভাবে ঘুরতে থাকে। নদীগুলোর মায়ের মতো করে পুরো স্থলকে যেন আগলে রেখেছে। এ জন্য বাংলাদেশের পথচলায় নদীর ভূমিকা অপরিসীম।

আমাদের দেশের বৃহত্তম নদী বলতে গেলে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র,সহ কয়েকটা নদীর নাম উঠে আসে কিন্তু বাংলাদেশের আনাচে কানাচে প্রবহমান নদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। এ সকল নদীর মাঝে আমাদের বসবাস। কিছুপথ পারি দিলেই কোনো না কোনো নদীর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ। প্রবহমান এ সকল নদী বয়ে আমাদের জীবন বৈচিত্র্য এক ভিন্ন মাত্রায় প্রতিফলিত করছে। নদীর প্রবহমান স্রোত আমাদের পারাপারের সুবিধা, হাজার রকমের মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণ, নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষদের জীবিকার জোগান দান, এমনকি নদীর চর হাজার হাজার মানুষের বাসস্থানে সুযোগ করে দিচ্ছে।

নদীর তীর কোনো সভ্যতা গড়ে ওঠার উৎকৃষ্ট জায়গা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রাচীন যুগের বেশি ভাগ সভ্যতা এ নদীর পার্শ্ববর্তী জায়গায় গড়ে উঠেছে। মানব সভ্যতার শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত নদী সর্বদাই উপকারের পথ পাড়ি দিয়ে আসছে। বর্তমানে সভ্যতার অস্তিত্ব বিবেচনায় নদীর গুরুত্ব ও ভূমিকা প্রকাশ করার মতো নয়। বাংলাদেশের বেশ ক’টি বড় শহরের নির্ভরশীলতা নদীর ওপর যেমন ঢাকা বুড়িগঙ্গা, চট্টগ্রাম পশুর, বগুড়া করতোয়া, গাইবান্ধা ঘাঘট ইত্যাদি। বৃহত্তম দুই শহরের সমস্ত নির্ভরশীলতা নদীর ওপর। যদি কোন কারণে নদী বন্ধ হয় তবে পুরো বাংলাদেশ থমকে দাঁড়াবে।

বর্তমানে সবচেয়ে একটা আলোচিত বিষয় নদী দূষণ এবং নদী দখল। বর্তমান সময়ে নদীকে অপব্যবহার করে নদীর ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা এবং নদীর পথচলাকে থমকে দিতে তৈরি হচ্ছে বাঁধ। শহরের পাশে নদী কে স্থলে পরিণত করতে বিভিন্ন স্থান থেকে বালি সংগ্রহ করে নদী ভরাট করে নদীকে সংকোচিত করে প্রবাহ নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। ফলে আজ প্রবহমান নদীর বর্তমান নাম মৃত নদী। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য, ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলা নিত্যদিনের কর্মে পরিণত হয়ছে। অপচনশীল দ্রব্য নদীতে নিক্ষেপের ফলে নদীর ভিতর জীব বৈচিত্র্য হুমকি স্বরূপ। বুড়িগঙ্গার পাশে অবস্থিত ঢাকা শহরের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি আজ বুড়িগঙ্গার ভুলের পরিণাম কি।  পুরো ঢাকা শহরের বর্জ্য, কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এবং শহরের পুরো আবর্জার ডাস্টবিন যেন বুড়িগঙ্গা। আজ বুড়িগঙ্গা নদী নয় যেন ঢাকা শহরের ডাস্টবিন।

এছাড়া ছোট শহরগুলো দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই নদীগুলো মৃত। বগুড়ার করতোয়া আজ পানিশূন্য। কোনো প্রবাহ নেই। যেখানে সেখানে অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলনের ফলে নদী কোনে জায়গায় গভীর আবার কোনে জায়গায় চর। যার পরিণামে নদী আজ মৃত্যু। এছাড়া গাইবান্ধার পাশে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের জীবন আজ মৃত্যুশয্যা। নদীতে অসংখ্য বাঁধের ফলে বর্ষাকালে বন্যা এবং গ্রীষ্মকালে নদী হয়ে ওঠে ধু-ধু বালিময়। এ রকম আশে পাশে শত শত নদী খাল বিলের করুণ অবস্থা বিদ্যমান। এছাড়া নদীতে নির্ভর কৃষি সমাজ আজ ভীষণভাবে বিপন্ন। প্রয়োজনের সময় পানির অভাব এবং অসময়ে বন্যা সব ফসল বিনষ্ট করে ফেলছে।

এখনই সময় আমাদের সবাইকে নদী বিষয়ে সচেতনা অবলম্বন করা। নদীতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নদীর পরিবেশ ঠিক রাখা। প্রশাসনের নজরদারি খুবই জরুরি, নদী থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় বালি উত্তোলন বন্ধ করে নদীতে প্রয়োজনীয় স্থানে খনন করা, অযথা বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ ব্যাপারে সচেতনতাও জরুরি। বুড়িগঙ্গায় মতো নদীর অবস্থা পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে নদীর প্রবাহ তৈরি করা অতিব জরুরি। নদী যাতে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহƒত না হয় এ বিষয়ে নজরদারিসহ নদী উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজনে কলকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা রোধ করতে জরিমানা আরোপসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি সকলের নজরদারি ও সচেতনতায় নদীগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক:শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মানবকণ্ঠ/এআই