manobkantha

অপরূপা বাংলাদেশ; যেখানে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়!

ফজলে এলাহী আরিফ

৬৪ জেলা ভ্রমণ! অনেকের কাছেই সামান্য হলেও, আমার কাছে অসামান্য। ঘুরতে ঘুরতে এক সময় মনে হলো- পুরো দেশটা ভ্রমণ করতে না পারলেও, অন্তত ৬৪টি জেলা শহর তো ভ্রমণ করতে পারি। যেই ভাবনা, সেই কাজ! আমার ভ্রমণের প্রধান ও সবসময়ের সঙ্গী আমারই একমাত্র পুত্র ও আমার সর্বকনিষ্ঠ বন্ধু আদিব; তারপর আমার বন্ধুদ্বয় বাবু ও লিমন ছিলো আমার সাথে অধিকাংশ জেলায়; কখনো কখনো অন্য বন্ধুরাও ছিলো। কখনো কখনো বাবু আমাদের যাত্রার সময় যোগ দিতে পারেনি; সেসময় সে আমাদের নিকটস্থ বিমানবন্দরে উড়ে গিয়েছে। আমরা বাবুকে সাথে নিয়ে আবার ছুটেছি কোন নতুন জেলায়। ন্যূনতম পেশাগত কারণে নয়, শুধুমাত্র ভ্রমণপিপাসা থেকেই ৬৪ জেলা ভ্রমণের নেশা। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া- সর্বত্রই ভ্রমণ করেছি। কোন জেলা শহরে লাঞ্চ করেছি, আবার কোন জেলা শহরে রাত্রিযাপন করেছি। স্বল্পসময়ে যতুটুকু সম্ভব হয়েছে, প্রতিটি জেলার উল্লেখযোগ্য স্থান ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছি। আজ খাগড়াছড়িতে এসেই পূর্ণ করেছি আমার ৬৪ জেলা ভ্রমণ।

নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুরের প্রত্নসম্পদ অতুলনীয়। নওগাঁর পাহাড়পুর না দেখলে পালযুগের গৌরবকে, বৌদ্ধদের গৌরবকে আমার দেখা হতো না। নওগাঁর নিভৃতপল্লী ঘুঘুডাঙ্গার নয়নাভিরাম তাল সাম্রাজ্যে যতদূর চোখ যায় কেবল তালগাছ আর তালগাছ; সবগুলো তালগাছ যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধবিহারও ঠিক এমনই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড় আর অরণ্য। এ যেন আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমাচ্ছে! নিসর্গ চট্টগ্রামকে ভূস্বর্গ না করলেও বাংলাদেশকে করেছে অদ্বিতীয়। কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় খুঁজে পেয়েছি শ্যামল বাংলার রূপ লাবণ্য আর হাওরের বিস্ময় অল-ওয়েদার সড়ক। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধার মতো সুন্দর নিসর্গ আর কোথাও কী আছে! গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, শেরপুর, জামালপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ি জেলায় রয়েছে বিস্তৃত চরের অঞ্চল।

পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, নীলফামারী জেলায় দেখেছি মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, পেয়েছি প্রবল আনন্দ। মহানন্দা নদীর তীরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখেছি আমবাগানের ছড়াছড়ি। রাজশাহীর পদ্মা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ‘পদ্মার ঢেউরে’ গানের কথাগুলো মনে মনে গেয়েছি। পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরীয়তপুরে দেখেছি পদ্মা নদী। এই পদ্মায় এক পাড় ভাঙে, আরেক পাড় গড়ে; একটা চর ডুবে, আরেকটা চর জাগে। রাজবাড়ি, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, যশোরের সৌন্দর্য অতুলনীয়। যশোর জেলার গদখালী তো বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী হিসাবে সুপরিচিত। ফরিদপুরের কুমার নদীর পাশে পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের বাড়ি ও নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরের চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের বাড়ি আমাকে কল্পনাবিলাসী করে তুলেছিলো; মেহেরপুরে এসে মুজিবনগরে ছুটে গিয়েছি। নদীর জেলা চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠির তুলনা হয় না। বাংলার ভেনিস খ্যাত বরিশাল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীর জলরাশির ঢেউ আর শান্তির সুবাতাসের নৈসর্গিকরূপ আমাকে টেনে নিয়েছে বেশ কয়েকবার।

উত্তরবঙ্গের তিস্তা নদীর প্রশস্ততা, কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদের গতিশীল স্রোত আর সিরাজগঞ্জের যমুনা জল দেখে হয়েছি বিমোহিত। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেই গোপালগঞ্জে যেতে মন চাইলো; গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ঘুমিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সিলেটে রয়েছে হযরত শাহজালাল (র:) ও হযরত শাহপরানের (র:) মাজার; বাগেরহাটে আছে খান জাহান আলীর (র:) মাজার। বগুড়ায় আছে মহাস্থানগড় আর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিশাল পৈতৃক বাড়ি। ঝিনাইদহ ও জয়পুরহাটের সবুজ শ্যামল শোভাও দেখার মতো।

দিনাজপুরের লিচু বাগান, সুনামগঞ্জের তরমুজ ক্ষেত, মাগুরার আখের ফুল, চুয়াডাঙ্গার কমলা বাগান আর গাজীপুরের ত্বীন ফলের বাগানে কাটানো সময় কখনো ভুলবো না। নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবই ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঢেউ খেলানো চা-বাগান দেখার জন্য মৌলভীবাজারে গিয়েছি বহুবার। আর পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা-বাগান দেখে অনেকটা বিস্মিতই হলাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি ও আধ্যাত্মিক সাধক লালন শাহ'র মাজারে কাটানো সময়ের কথা মনে হলেই কুষ্টিয়ায় যেতে ইচ্ছা করে। সুনামগঞ্জের মরমী কবি হাছন রাজা ও বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক), বারিক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান ও টাঙ্গুয়ার হাওরে কাটানো সময়গুলো ভুলার মতো নয়।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার; সাগর-কন্যা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ও লাল কাঁকড়ার চর; বরগুনার শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত ও গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত; সুন্দরবনের দক্ষিণ পূর্বকোনের কটকা সমুদ্র সৈকতে কাটানো সময়গুলো কী কখনো ভুলতে পারবো! দিগন্ত জোড়া জলরাশি আর বিস্তীর্ণ সমুদ্র পাড়ের বালুর বুকে নানা আল্পনায় অলংকৃত করেছি আমার কল্পনাগুলোকে। বর্ষায় দেখেছি চেনা সমুদ্রের এক অনন্য রূপ। কালো মেঘ, মুষলধারে বৃষ্টি, বিশাল আকাশে বজ্রপাতের ঝলকানি আর দিগন্ত বিস্তৃত উত্তাল ঢেউ আমাকে করেছে মন্ত্রমুগ্ধ। সমুদ্রের উত্তাল গর্জনে আমার কানে ভেসে এসেছে ভাষার অব্যক্ত ছন্দময়তা।

নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন; বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ কক্সবাজারের মহেশখালী, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটার চরগঙ্গামতি, ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন ছবির চেয়েও সুন্দর; এগুলো যেন অপূর্ব সুষমামণ্ডিত।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবন, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সিলেটের সুন্দরবন খ্যাত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ও খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান, বরগুনার টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান, গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও শ্রীপুর বনাঞ্চল, টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় উদ্যান, কক্সবাজারের হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান, শেরপুরের গজনী অবকাশ কেন্দ্র ও মধুটিলা ইকোপার্ক- এর মনোরম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত নয়নাভিরাম দৃশ্যে আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করেছে বহুবার। চারদিকে সবুজের সমারোহ, গাছে গাছে পাখিদের সুমধুর গান, হিমেল হাওয়া আর সবুজের সুবিশাল ক্যানভাস আমাকে দেখিয়েছে প্রকৃতির ভিন্ন এক রূপ বৈচিত্র্য।

চট্টগ্রামের ফয়’স লেক ও মহামায়া লেক; রাঙামাটির পাহাড়ের বাঁকে কাপ্তাই লেক, বান্দরবানের বগালেক, মৌলভীবাজারের মাধবপুর লেক ও সিলেটের লালাখাল- নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি। পাহাড়ের কোলঘেঁষে আঁকাবাঁকা অপরূপ সুন্দর লেকগুলো। স্বচ্ছ পানির জলাধারের চারপাশ যেন সবুজ চাদরে মোড়া; দেখে মনে হয়েছে যেন কোনো শিল্পীর সুনিপুণ কারুকাজ! তৃষ্ণার্ত চোখে নেশা নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এগুলোর সর্বত্র।

রাঙামাটির ছাদ সাজেক ভ্যালী, সিম্বল অফ রাঙ্গামাটি খ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজ, চাকমা রাজার বাড়ি, প্যাদা টিং টিং, রাজবন বিহার ও সুবলং ঝর্ণা; বান্দরবানের নীলগিরি ও মেঘে ঢাকা নীলাচল; সিলেটের দীর্ঘতম চা-বাগান, পাথর বিছানো বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ ও জাফলং; মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড জলপ্রপাত;

গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক; বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ; সাতক্ষীরার চিংড়ি-কাঁকড়ার ঘের; কুমিল্লার ময়নামতি যাদুঘর, শালবন বিহার, লালমাই পাহাড়, ২য় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের সমন্বিত স্থল (ওয়ার সিমেট্রি) ও ধর্মসাগর দিঘী; চাঁদপুরে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া তিন নদীর মিলনস্থল চাঁদপুর মোহনা, চট্টগ্রামের বায়জীদ বোস্তামীর (রঃ) মাজার ও কুমিরা ঘাট; কক্সবাজারের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও মহেশখালী আদিনাথ মন্দির; বান্দরবানের মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স; রাজশাহীর বাঘা মসজিদ ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর; নাটোরের রাজবাড়ি ও চলনবিল; বরিশালের ইতিহাসের সাক্ষী ভৌতিক দুর্গাসাগর, ঝালকাঠীর কৃত্তিপাশা খালের শতবর্ষের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বাজার; সিলেটের সুরমা নদীর উপর স্থাপিত কিনব্রিজ;

সুনামগঞ্জের শাহ আরেফিনের মাজার; রংপুরের বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বাড়ি; দিনাজপুরের রামসাগর দিঘী; ঠাকুরগাঁও জেলার ৩০০ বছর বয়সী সূর্যপুরী আম গাছ; ময়মনসিংহের শশী লজ, মুক্তাগাছা রাজবাড়ি, শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা, গারো পাহাড় ও ভালুকা বনাঞ্চল; নেত্রকোণার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বিরিশিরি, সুসং দুর্গাপুর, বিজয়পুর চীনামাটি ও সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র:) মাজার; নারায়ণগঞ্জের পানাম সিটি, লোকশিল্প যাদুঘর, বাংলার তাজমহল ও জামদানি শাড়ি বিক্রয় কেন্দ্র; নরসিংদীর উয়ারি বটেশ্বর ও লালমাটির পাহাড়; মাদারীপুরের বানরের রাজ্য চরমুগরিয়া এবং সাতক্ষীরার ৩০০ বছর বয়সী বনবিবির বটগাছ দেখেছি। দেশের প্রায় সব বড় বড় স্থল বন্দর, নৌ-বন্দর ও সমুদ্র বন্দর কৌতূহলবশত পরিদর্শন করেছি। সবই তো আজ আমার স্মৃতিপটে ভাসছে। অধিকাংশই যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব রঙ্গশালা! শুধু প্রাকৃতিক নয়, বরং অনেক ঐতিহাসিক স্থানেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ আমার বাংলাদেশ। প্রকৃতি যেন আপন হাতে এ দেশকে মনের মতো করে সাজিয়েছেন। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, সবুজ গাছপালা, পাখপাখালি রূপের মাধুর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এদেশে দেখেছি উঁচুনিচু পাহাড়, সুনীল সাগর, অবারিত মাঠ, সুবিস্তৃত সুনীল আকাশ– যা এক অপূর্ব চিত্তহারী সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। রাস্তার দুই ধারে নানা রকমের গাছ মাথা উঁচু করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় যেন এরা এখানকার চিরন্তর প্রহরী; আমাদেরকে স্বাগতম জানাচ্ছে। খাল-বিল, নদ-নদী, মাঠ-ঘাট সব মিলে এদেশকে বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের অধিকারী করেছে। এদেশের সব জেলাতেই পেয়েছি নদী। যেন নদীর বুকেই এদেশ ভাসমান। অসংখ্য খালবিল, নদীতে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য যে কী অপূর্ব হতে পারে তা নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এছাড়া বাংলাদেশের যে দিকেই তাকিয়েছি- শুধু সবুজ আর সবুজ। প্রত্যেকটি ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যেতে দেখেছি নতুন রূপে, নতুন বৈশিষ্ট্যে। ঋতু বদলের সাথে সাথে বদলিয়েছে আমার দেশের রং, রূপ, লাবণ্য। শুধু ঋতু নয়, অঞ্চলভেদেও দেশের সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য্ লক্ষ্য করার মতো।

৬৪ জেলা ঘুরে বুঝতে পারলাম- আমার দেশটি শুধু সুন্দর নয়; এটি অপূর্ব, অতূলনীয় ও অসাধারণ সুন্দর। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কবিতায় বাংলাদেশের প্রকৃতির আপন বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে-
“ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা”

আমি দেখেছি- আমার দেশের অপার সৌন্দর্য কত নয়নাভিরাম ও বৈচিত্র্যরময়! যদিও ক্রমাগত নগরায়নের ফলে দেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এখন হুমকির মুখে; অনেক ঐতিহ্য, রূপ আর সৌন্দর্য আমাদের চোখে পড়েনি। তবুও যতটুকু টিকে আছে, ততটুকু তো উপভোগ করতেই পারি। অনেকবার চেষ্টা করেছি প্রকৃতির কোলে নিশ্চিন্তে হারিয়ে যেতে; উপভোগ করতে চেয়েছি প্রকৃতিকে। ভরা পূর্ণিমায় গভীর রাতে একা হাঁটতে সাহস পাইনি; কোন গভীর নির্জনে একা বসে থাকার সাহস পাইনি; ঘুট ঘুটে অন্ধকারে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে সাহস পাইনি। কোন হিংস্র জীবজন্তুর ভয়ে নয়, একদল নষ্ট মানুষের ভয়ে প্রকৃতির মোহনীয়তাকে আমি পুরোপুরি উপভোগ করতে পারিনি। কোথাও কোথাও নষ্ট মানুষের ভয় না থাকলেও, মশার অত্যাচারে উপভোগ করতে পারিনি রাতের নীরবতার সৌন্দর্য।

পুরো ভ্রমণে আমার নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তেমন একটা নেই। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় অনেক অনেক আনন্দের বার্তা নিয়েই গিয়েছি। এত আনন্দের মাঝে একটি বিষয়ে নিজেকে নিন্দাবাদ জানিয়েছি বেশ কয়েকবার। ঘুরতে ঘুরতে দেশের বিভিন্ন জেলায় পেয়েছি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর (রাখাইন পল্লী, খাসিয়া পল্লী, মনিপুরী পল্লী, ইত্যাদি) বসতি। আমরা বাঙালিরা তাদেরকে দেখতে যাই। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পল্লীতে গিয়ে বাঙালিরা এমনভাবে তাকায় যেন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা মানুষ নয়, চিড়িয়াখানার প্রাণী। দ্বিতীয়বার কোন এক পল্লীতে গিয়ে নিজেকে ধিক্কার দেই। এরপর থেকে আমি আর কোন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পল্লীতে যাইনি; তাদেরকে বিব্রত করিনি।

৬৪ জেলার আংশিকমাত্র আমি দেখেছি। আংশিক দর্শনের অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যটিও ভাষায় আমি ফুটিয়ে তুলতে পারছি না। শুধু এতটুকু বলতে পারি- বাংলাদেশের যেকোন জায়গায় দাঁড়িয়ে যেকোন দিকেই দৃষ্টিপাত করেছি না কেন, আমার চোখ দুটো প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে ধন্য হয়েছে, মনপ্রাণ আনন্দে নেচে উঠেছে।
কবি দ্বিজেন্দ্রলালের ভাষায় আমিও বলতে পারি-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি”

লেখক- আয়কর উপদেষ্টা