manobkantha

কুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ চান শিক্ষকরা

আলমগীর হান্নান, খুলনা

ছাত্রলীগের নেতাদের জেরা, অপমান, অবরুদ্ধ করে রাখা ও মানসিক নির্যাতনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পর কুয়েটের সকল প্রকার ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এদিকে শিক্ষক মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে।

বুধবার (১ ডিসেম্বর) দুপুরে এ ঘোষণা দেন শিক্ষকরা। একই সঙ্গে তারা একাডেমিক কার্যক্রমেও অংশ নেবেন বলে ঘোষণা দেন। এদিন সকালে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশ নেননি।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে একটি সাধারণ সভা করে কুয়েট শিক্ষক সমিতি। এতে সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সুষ্ঠু সমাধানের আগ পর্যন্ত সকল ক্লাস ও ল্যাব কার্যক্রমে শিক্ষকরা অংশ নেবেন না। শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচারসহ কয়েকটি দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত ক্লাস ও ল্যাব বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।

দাবিগুলো হল, শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আগামী পাঁচদিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। তদন্ত কমিটির সদস্য পরিবর্তন করে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষকদের অন্তুর্ভুক্ত করতে হবে। তদন্ত সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তদন্ত কমিটির সদস্যদের তালিকা নোটিশ বোর্ডে টানাতে হবে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের আজীবন ছাত্রত্ব বাতিলসহ বহিস্কারের ব্যবস্থা নিতে হবে ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নিহত শিক্ষকের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি হলের সকল অংশ সিসিটিভির আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষকদের নিরাপত্তায় সিকিউরিটি গার্ড নিযুক্ত করতে হবে। লালন শাহ হলে যে কারণে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে।

গত মঙ্গলবার (৩০ নভেম্বর) দুপুর ৩টার দিকে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান কুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন।

জানা গেছে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। বর্তমান ছাত্রলীগ সভাপতি সরকারি চাকরি পাওয়ার পরপরই নতুন কমিটি আসার আগমুহুর্তে নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর ভেতর একটি প্রভাবশালী উপদল বর্তমান কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সম্প্রতি কুয়েটের লালন শাহ হলে ডিসেম্বর মাসের খাদ্য-ব্যবস্থাপক (ডাইনিং ম্যানেজার) নির্বাচন নিয়ে সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান প্যানেলের বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার অভিযোগ ওঠে।

ওই প্যানেলের সদস্যরা হলের প্রাধ্যক্ষ ড. সেলিম হোসেনকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিলেন তাদের মনোনীত প্রার্থীকে নির্বাচন করার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের একটি ক্যাডার গ্রুপ ক্যাম্পাসের রাস্তা থেকে ড. সেলিম হোসেনকে জেরা করা শুরু করে। পরবর্তীতে তারা  শিক্ষককে অনুসরণ করে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) এ প্রবেশ করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা আনুমানিক আধাঘন্টা ওই শিক্ষকের সঙ্গে রুদ্ধদার বৈঠক করে। এতে তিনি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন ও অসুস্থ হয়ে যান।

পরবর্তীতে ড. সেলিম হোসেন দুপুরে খাবারের উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাস নিকটস্থ বাসায় যাওয়ার পর দুপুর আড়াইটার দিকে তার স্ত্রী লক্ষ্য করেন তিনি বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন না। পরে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড. সেলিম একজন অত্যন্ত সজ্জ্বন, সৎ ও মেধাবী শিক্ষক। ছাত্রবান্ধব হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত অল্প বয়সে তিনি দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ২০২০ সালে অধ্যাপক পদোন্নতি পান৷ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এ বিষয়ে জানতে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানের নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

কুয়েট ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক ড. ইসমাইল সাইফুল্লাহ বলেন, এ ঘটনায় ড. রজিবুল আহসানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত তাদের রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।