manobkantha

শিক্ষায় সংকট এবং সমাধান

সজীব ওয়াফি : পার্থ রায়। বাংলাদেশ করোনা আক্রমণের শুরুর সময়ে পড়ত ক্লাস সেভেনে। ক্লাস পরীক্ষা ছাড়াই এখন অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো। ওর বাবা ফড়িয়ার গাছ কাটার কামলা দেয়। করোনাকালে তার আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের পেটই চলে না, কে কিনবে কাঠ! কাঠ কেউ না কিনলে ফড়িয়া গাছ কিনবে কি করে; আর কামলাই বা দিবে কিভাবে!

করোনা অতিমারীর সময়ে ওদের পেট বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে। ছুটির শুরুতে পার্থ ঘুড়ি আর নাটাই নিয়ে থাকতো। এখন বাবার কাজে সাহায্য করে। দেড় বছরে বইখাতা ছোঁয়াও হয়নি। ওর বোন পূজা ক্লাস ফাইভে, তারও একই অবস্থা। ওদের মায়ের আশঙ্কা ছেলে-মেয়ে দুটোর লেখাপড়া আর বুঝি হলো না। বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মিম আক্তারের। অথচ মেয়েটা মাত্র এবারে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা। মিমের বাবা নেই।

মা গার্মেন্টস কর্মী। মামার বাড়ি থেকে এতদিন পড়াশোনা চালিয়েছে মিম। কিন্তু এবারে বাদ সেধেছে মামারা। তাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে, টানাটানির সংসারে বোনের মেয়েকে পড়ানোর আর শক্তি নেই তাদের। দীর্ঘদিন ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় বিয়ের তোড়জোড় চলছে। অথচ মিমের মায়ের অন্তিম ইচ্ছা তার মেয়েটা শিক্ষিত হবে, তার মতো গার্মেন্টস কর্মী যেন হতে না হয় মেয়েটার।

মামাদের কথা- বিয়ে না দিতে চাইলে তোমার মেয়ে তুমি নিয়ে যাও, আমাদের সাধ্যে আর কুলায় না। ওর মা নিজের কাছে রেখে খরচ চালাতে ব্যর্থ। ফলে বিমর্ষ মেয়েটার মা। দেশের প্রথম সারির একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোশারুল। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শেষ পর্বে আছে সেই কবে থেকেই।

পেটের দায়ে বই খাতা ছেড়ে তাকেও চালাতে হচ্ছে ভ্যান। লড়াই করতে হচ্ছে জীবন সংগ্রামের। টিউশনি করিয়ে নিজের পড়ার খরচ জোগানো হামিদও হতবিহ্বল। শিক্ষণপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় টিউশন নাই। পড়াশোনা যেন মোর্শেদুল-হামিদদের জন্য বিলাসিতা মাত্র। পৃথিবী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে পড়লে এক শতাধিকেরও বেশি দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকেও নিতে হয়েছে বন্ধের সিদ্ধান্ত। তরুণ-তরুণীরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন থেকে হয়েছে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘকাল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ক্ষতিগ্রস্ত ৯৯ ভাগই নিম্ন বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। নানান সংকটে এই শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশই আর কখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবে না।

পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনায় তথ্যপ্রযুক্তির ওপর হয়েছিল জোরদার। অনলাইনে ক্লাস পরীক্ষা হবে বলা হলে শুরুতে আগ্রহ ছিল ছাত্রদের। পরিকল্পনায় অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। কারণ টেকনোলজি পদ্ধতি কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র বা শহরের স্কুলগুলোতেই ছিল। হাওরের, দুর্গম পাহাড় বা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এর ছিটেফোঁটাও পৌঁছেনি।

নেটওয়ার্কের সংকট সেখানে প্রবল। তার ওপর অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ভালোভাবে নেয়নি শহুরে ছাত্ররা। মোটকথা কিছুদিন অতিবাহিত হলে দূরশিক্ষণে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ছাত্রদের ভিতরে আসে অনীহা এবং একঘেয়ে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিটি পলিসি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লার্ন এশিয়ার পরিচালিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ হয় মহামারী আক্রান্তের কিছুদিন আগে। সেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশর মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

এবং ইন্টারনেট জানাশোনা রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। শহরের ১৯ শতাংশ এবং গ্রামের ১১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যয় অন্যান্য দেশের চেয়ে বহুগুণে বেশি। মহামারির প্রেক্ষাপটে প্রতিনিয়ত ইন্টারনেট কেনার ব্যয় সামলানো গ্রামের দারিদ্র্য মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

অনলাইনে দূরশিক্ষণে অংশ নিতে হলে কেবলমাত্র ইন্টারনেট কিনলেই চলবে না। লাগবে মোটামুটি মানের ডিভাইস বা কম্পিউটার। যাতে ব্যয় হবে বড় অঙ্কের অর্থ। পেটেই যেখানে ভাত পাওয়ার চিন্তামগ্ন, সেখানে দারিদ্র্য জনগোষ্ঠী তাদের ছেলে মেয়েদের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে ডিভাইস কিনবে কি করে? ছাত্রদের বিনা সুদে ঋণের কথা বলা হলেও সেটা শুধুমাত্র নামকরা হাতেগোনা কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের জন্য।

একমাত্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যেটা শতভাগ পেরেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাম পর্যায়ের স্কুল কলেজগুলোতে চেষ্টা করলেও এই প্রকল্প মোটেই শতভাগ সম্ভব নয়। ফলাফলে শহরের বা আর্থিক সচ্ছলতা আছে এ রকম পরিবারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সচল আছে। সচল ছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। চোখের অলক্ষ্যে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামের সঙ্গে শহর এবং ধনীর সঙ্গে দারিদ্র্যের বিশাল বৈষম্য।

উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষারত সব ছাত্রদের আর্থিক অবস্থা সমান নয়। কেউ টিউশনি করে, কেউবা খণ্ডকালীন কাজ করে নিজেদের পড়ার ব্যয় মেটায়। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এবং যানবাহন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আয় রোজগারের পথও শূন্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ছাত্ররা শুরু থেকেই বাড়িতে আছেন।

কেউ আবার দীর্ঘ একটানা ছুটিতে অবসাদে ভুগছেন। পরিবারের অর্থনীতি খারাপ থাকলে সম্পর্কও খারাপ হতে বাধ্য। অস্বাভাবিক বিরতিতে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। স্কুল নেই, খেলার মাঠে যেতে বারণ, একারণে বদ্ধ ঘরে আটকে থাকায় মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পরছে ছোটদের। শিক্ষকরা যেন ফিরতে চায় তাদের চিরচেনা রূপে।

নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য হতে না পারলে প্রভাব পড়ছে তাদেরও। ডিজিটাল পদ্ধতিতে একটানা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে চোখে। সমস্যা হচ্ছে মেরুদণ্ডে। মহামারী করোনা ভাইরাস আবির্ভাব ও টানা লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। ছাঁটাই এবং বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে নতুন করে নেমেছে ২.৫ কোটি মানুষ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোনো ধরনের চাকরির পরীক্ষাও হচ্ছে না। নতুন করে শিক্ষাজট এবং যোগজট তৈরি হচ্ছে নতুন বেকারে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী তো শেষ করতেই পারছেন না শিক্ষার চৌকাঠ। বাল্যবিবাহ বেড়েছে আশঙ্কাজনক। অথচ এই প্রজন্মের হাত ধরেই নির্মাণ হওয়ার কথা আছে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব।

বিগত দেড় বছরে অফিস, আদালত, ব্যাংক, যানবাহন, কলকারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস, শপিংমলসহ সব কিছুই খোলা। বন্ধ ছিল না রাজনৈতিক কর্মসূচী। শুধুমাত্র বন্ধ ছিল শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিদ্যানিকেতন। পুঁজিবাদী চিন্তায় মহামারীর এই সময়েও তুলনামূলক কমানো হয়েছে কর্পোরেট ট্যাক্স, বাড়ানো হয়েছে তেলের দাম, চালের দাম, প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের, কর্পোরেট ঋণে দেয়া হয়েছে সুবিধা, শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত পড়েছে সংকটে। তাদের জন্য কেউ নেই।

গরিব আরো গরিব হচ্ছে। বড়লোক আরো বড়লোক। শিক্ষা ব্যবস্থার শিকার প্রাইমারি পড়ুয়া এই যে হাজার হাজার অভি-অনুরা পড়া ভুল গেল শেষ দু’বছরে, এর দায়িত্ব কে নেবে? জীবনের অনিশ্চয়তা, গরিব বাবার মোবাইল না কিনতে পারার অসামর্থ্য, মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর জীবনের দাম চোকাবে কে? অবসাদ আর শিক্ষায় দীর্ঘ জটের অস্থিরতা তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে যে শিক্ষার্থীর জীবন, তার দায় কেউ নেবে না?

বর্তমানে বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে জনসংখ্যার বোনাস যুগ। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যা, নির্ভরশীল জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। জনসংখ্যার এই বোনাস যুগ যথাযথ কাজে লাগানো গেলে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটে দ্রুত। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা যদি পঙ্গু হয়ে যায় তখন উল্টো অভিশাপ তৈরি হবে। নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে পড়াশোনায় জং ধরেছে গ্রামাঞ্চলের অনেক বাচ্চার।

অথচ বর্তমানের কর্মক্ষম মানুষগুলোই ভবিষ্যতে বর্তমান কিশোর কিশোরীদের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষায় খুঁড়িয়ে হাঁটা একটি জাতি বেশিদূর একপায়ে আগাতে পারবে না। অটোপ্রমোশন, অটোপাস বা অ্যাসাইনমেন্টে শিক্ষার মূল্যায়ন মেরুদণ্ড নড়বড়ে হওয়ার নামান্তর। তারপরও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার মানসিকতা এবং প্রতিবেশগত প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের।

বিপদের দিনে কঠোর মনোবল, ধৈর্য এবং নব উদ্দীপনায় দৃঢ়তায় দাঁড়াতে হয়। হতে হয় সক্রিয় সাহসী সহযাত্রী। শিল্প, অর্থনীতিসহ অন্যান্য খাতের ক্ষতি চোখে দেখা যায়; কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান হয় ধীরে ধীরে। করোনায় যে ক্ষতি আমাদের হয়ে গেছে তা অপূরণীয় এবং উদ্বেগজনক। কোভিড ভাইরাস সঙ্গে নিয়েই আমাদের চলতে হবে।

নতুনভাবে উঠে দাঁড়াতে দরকারে স্কুলগুলোয় একসঙ্গে সব ব্যাচ না এনে, সময় ভাগ করে আলাদা আলাদা ব্যাচের ক্লাস পরীক্ষা নেয়া যায়। নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। অথবা একদিনে এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খুলে, আলাদা আলাদা দিন ভাগ করে সমন্বয় করা যেতে পারে। তারপরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলুক। শিক্ষা মানুষের মননের বিকাশ ঘটায়।

রূপকল্প-৪১-এ বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পদার্পণ করতে হলে কাঠামোগত উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন; তেমনি প্রয়োজন আছে মানসিক বিকাশের। অনলাইনে ক্লাস হওয়ার শত পরামর্শ দিয়ে দেড় বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। ছাত্রদের আর্থিক সংকটের শতভাগ ডিভাইসের ব্যবস্থা করাও যায়নি। দুর্গম অঞ্চলের নেটওয়ার্ক সমস্যাও রাতারাতি সমাধান হওয়ার নয়।

পার্থ-পূজাদের এবার স্কুলে ফেরার পালা। দ্রুত শিক্ষার্থীদের টিকা দিন। পাশাপাশি ভগ্নশেষ স্কুলছুটদের জন্য ব্যবস্থা করুন বিশেষ রোডম্যাপের। পূজার বাবাদের পায়ের তলার মাটির দায়িত্ব সরকার নিক। বাকিটা ওরা বুঝে নিবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার প্রক্রিয়া শুরু করা এখন উপযোগী সিদ্ধান্ত।

লেখক: কলামিস্ট।