manobkantha

পরিবেশ সুরক্ষায় চাই সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

মঞ্জুরি আক্তার মিথিলা: আয়তনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯২তম হলেও জনসংখ্যায় অষ্টম এবং ৬টি ক্ষুদ্র দ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন ২০১৯ সালের উপাত্ত অনুযায়ী বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৭ লাখ এবং এ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৩৩%।

বাংলাদেশে মাথাপিছু বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৫০ টন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য তৈরির হার বেড়েই চলেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০২৫ সালে দৈনিক প্রায় ৪৭০৫৪ টন বর্জ্য উৎপন্ন হবে এবং তখন বর্জ্য উৎপাদনের হার বেড়ে মাথাপিছু ২২০ কিলোগ্রাম হবে। এই হার বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে কোভিড-১৯ মহামারী সময়কালীন সৃষ্ট বর্জ্য পদার্থ।

বর্জ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও বেড়ে চলেছে, বিশেষত বড় শহরগুলোতে। ইউএনএফপিএ-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম প্রধান দূষিত নগরী এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এর একটি বড় সমস্যা। বিশাল জনসংখ্যার অধিকাংশেরই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ঢাকায় বর্জ্য সংগ্রহের হার মাত্র ৩৭%।

সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে অশোধিত অবস্থায় পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে বর্জ্য। যার ফলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে। স্বাস্থ্যকর জীবন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।

প্রাথমিক ব্যবহারের পর যা ফেলে দেয়া হয়, যা মূল্যহীন এবং ত্রুটিযুক্ত তাই বর্জ্য। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন- এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বুঝায়। পরিবেশের অবনমন রোধ, জীবদেহকে বিভিন্ন রোগের আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাই হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকরী উপাদানগুলোর মধ্যে মৌলিক উপাদানগুলো হচ্ছে বর্জ্য উৎপাদন, নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং সঞ্চয়, সংগ্রহ, স্থানান্তর ও পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিষ্পত্তি।

বর্জ্য উৎপাদন : বর্জ্য উৎপাদন প্রাকৃতিক, মানব ও প্রাণী এ তিনের কার্যকলাপের ফলস্বরূপ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, নকশা ও পরিচালনাতে বর্জ্য উৎপাদনের জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্জ্য উৎপাদন এর দুটি দিক রয়েছে : একটি হলো কঠিন বর্জ্যের গুণমান এবং অন্যটি হলো বর্জ্যরে পরিমাণ। বর্জ্যের প্রকৃতির মধ্যে বর্জ্যের উৎস, প্রকার এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার সঙ্গে বর্জ্যরে পরিমাণ মিলিতভাবে বর্জ্য উৎপাদনের হারকে উপস্থাপন করে। উৎস থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পূর্বে স্থানান্তর, সংরক্ষণ এবং বিচ্ছিন্নকরণ স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন গড়ে প্রায় ২৫,০০০ টন, যা প্রতি বছর মাথা পিছু ১৭০ কেজি রূপান্তর করে। ঢাকা শহর দেশের সমস্ত বর্জ্যের এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করে। বর্জ্য আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিল্প উৎস থেকে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহুরে বর্জ্যের ধরন বদলে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে বর্জ্যরে সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে হাসপাতাল এবং ক্লিনিক।

করোনাকালীন এক জরিপে দেখা গেছে যে, করোনা শুরু হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে মোট বর্জ্যে উৎপাদন হয়েছিল ৫,৮৭,৭৭৭ টন যার মধ্যে ৩,০৯৯ টন প্লাস্টিকের গ্লোভস থেকে এবং বাকি ২,৮৮৮টি ছিল অস্ত্রোপচারের গ্লোভ থেকে ছিল। ঢাকা একাই ৩,০৭৬ টন বর্জ্য তৈরি করেছে- গ্লোভস থেকে ১,৯১৬, সার্জিক্যাল মাস্ক থেকে ৪৪৭, পলিথিন শপিং ব্যাগ থেকে ৪৪৩ এবং ব্যবহৃত হ্যান্ড স্যানিটাইজার কনটেইনার থেকে ২৭০টি বর্জ্য তৈরি হয়েছে।

বর্জ্য পরিচালনা: বর্জ্য উৎপাদনের স্থানে বা তার নিকটে বর্জ্য পরিচালনা ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিয়াকলাপগুলো এই ধাপে করা হয়। সাধারণত পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বর্জ্যগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়। বর্জ্য পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ক্রিয়াকলাপগুলো পুনর্ব্যবহারের জন্য বর্জ্য থেকে পৃথক করা পদার্থের প্রকার এবং পদার্থগুলো বর্জ্য থেকে কতটা পৃথক করা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।

আবাসিক বর্জ্যের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে অনসাইট হ্যান্ডলিং। এতে স্বতন্ত্র পরিবারের সদস্য, পরিবার এবং সম্প্রদায় জড়িত, যাদের সবার এই স্তরে কীভাবে সঠিকভাবে বর্জ্য পরিচালনা করতে হবে তা জানতে হবে। ‘হ্যান্ডলিং’ এর অর্থ হলো বর্জ্যগুলো তাদের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে আলাদা করা। উপযুক্ত অনসাইট হ্যান্ডলিং বা যথাস্থানে বর্জ্য সরানোর সুবিধা হলো বর্জ্য হরাস এবং পুনরুদ্ধার।

ঝুড়ি, প্লাস্টিকের বালতি বা ধাতব পাত্র বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। খাদ্য বর্জ্যের জন্য ব্যবহৃত বড় পাত্র বা ডাস্টবিনগুলোর শক্ত ঢাকনা থাকা উচিত এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত। প্রতিদিন একটি পরিবারে কমপক্ষে যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয় তা ধারণ করার জন্য ধারকটির আকার যথেষ্ট হওয়া উচিত। দক্ষ বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষণ পাত্রের সঠিক অবস্থান এবং খালি করার প্রবণতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্জ্য সংগ্রহ : জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশগত মানের সুরক্ষার জন্য যথাযথ বর্জ্য সংগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সংগ্রহ বলতে কেবল বিভিন্ন উৎস থেকে বর্জ্য বা আবর্জনা সংগ্রহ করা বুঝায় না, বর্জ্যগুলোকে নিষ্পত্তিস্থল বা স্থানান্তর স্টেশনে স্থানান্তর এবং সেখানে নামানোও বুঝায়। বর্জ্য সংগ্রহ একটি নিবিড় কার্যকলাপ।

সরকারি কর্মচারীদের প্রায়ই এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তবে কখনো কখনো বেসরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষে চুক্তির অধীনে পৌরসভায় কাজ করা বা বাড়ির মালিকের দ্বারা ব্যক্তিগত বেসরকারি সংগ্রহকারীদের অর্থ প্রদান করা হয়। একজন ড্রাইভার এবং একটি বা দুটি লোডার বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করে।

সাধারণত ৩০ ঘনমিটার ক্ষমতাযুক্ত নিন্সদ্র ট্রাক এই কাজগুলো করে। বর্জ্য সংগ্রহের যানবাহনটি সাধারণত বর্জ্যগুলোকে একটি স্থানান্তর কেন্দ্রে নিয়ে যায় যেখানে বর্জ্যগুলোকে বৃহত্তর গাড়িতে বোঝাই করা হয়। খাদ্য বর্জ্য দ্রুত পচে যায় বলে সাধারণত প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার সংগ্রহ করা হয়।

অনেক সম্প্রদায় এখন বর্জ্য উৎসেই বর্জ্য বিচ্ছিন্নকরণ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে বাড়ির মালিকরা এবং ব্যবসায়ীরা আবর্জনা থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণগুলো পৃথক করে আলাদা পাত্রে রাখা হয়।

স্থানান্তর ও পরিবহন: বর্জ্য সংগ্রহের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে বর্জ্য স্থানান্তর ও পরিবহন যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য উপাদান। স্থানান্তর ও পরিবহন বলতে যেসব উপায়, সুবিধা এবং সংযোজন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বর্জ্য স্থানান্তরিত করতে ব্যবহƒত হয়, সেগুলোকে বুঝায়।

সাধারণত দূরবর্তী স্থানে বর্জ্য প্রেরণের জন্য তুলনামূলকভাবে ছোট সংগ্রাহক যানবাহনগুলোর বর্জ্য বড় যানবাহনে স্থানান্তর করা হয়। বর্জ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনগুলো সাধারণত ৭৬ ঘনমিটার (১০০ ঘন গজ) অসম্পৃক্ত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বা নিষ্পত্তি স্থানে বহন করার জন্য ডিজাইন করা থাকে।

বর্জ্য সংগ্রহ এবং পরিবহনের জন্য প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে কর্মীদের নিয়োগ দেয়া হয়। বড় স্থানান্তর কেন্দ্রগুলো প্রতিদিন ৫০০ টনেরও বেশি বর্জ্য পরিচালনা করতে পারে। হতাশাব্যঞ্জক বিষয় হলো এই যে, বর্তমান সময়ে বর্জ্য উৎপাদনের হারের তুলনায় আমাদের প্রয়োজনীয় যানবাহন ও কর্মীর সংখ্যা খুবই কম।

প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনরুদ্ধার : বর্জ্য নিষ্পত্তির পূর্বে তা প্রক্রিয়াজাত এবং পুনরুদ্ধার করতে হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্যকরী উপাদানগুলোর দক্ষতা উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বর্জ্যের রূপ পরিবর্তন করে বর্জ্যের পরিমাণ হরাস করা যায়।

বর্জ্য থেকে দরকারি পণ্য পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্যের পরিমাণ হরাস করার মূল প্রক্রিয়া হচ্ছে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া উৎপত্তি বা উৎসস্থলে আলাদা হচ্ছে সর্বোত্তম প্রক্রিয়া যেখানে পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং কমপোস্টিংয়ের সুবিধার্থে উৎস অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণির পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং জৈবিক বর্জ্যগুলোকে পৃথক করা হয়।

বাংলাদেশে সাধারণত পুনর্ব্যবহার করা হয় তিন ধাপে। গোটা দেশ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সঠিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। বাংলাদেশ সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং বিভিন্ন জায়গায় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কিন্তু সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও এ গিয়ে আসতে হবে।

সার্বিকভাবে, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে : ডোর-টু-ডোর সংগ্রহ ব্যবস্থায় যথাযথ সচেতনতা এবং অংশীদারদের সহায়তা। উৎসস্থলে বর্জ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত নকশা প্রণয়ন। বর্জ্য পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস সংগ্রহসহ স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি হতে পারে। রাস্তার পাশে ট্রান্সফার স্টেশন বন্ধ করতে হবে।

এখনো কিছু জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়। বিকল্প হিসেবে কংক্রিটের ঢাকনা ব্যবহার করা যেতে পারে। অননুমোদিত ডাম্পিং বন্ধ করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত নকশা তৈরি করতে হবে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি ধাপে তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট।