manobkantha

মাদকের আগ্রাসন এবং নির্মূলে তৎপরতা

মেহেদী হাসান বাবু : মাদক সম্পর্কে জানেন না এমন ব্যক্তি নেই। মাদকের ভয়াবহতা লিখে বা বলে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর আগ্রাসনের শিকার দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এর চাহিদা রয়েছে, আছে সরবরাহও।

আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা ও মাদকাসক্তি অনেক বেড়ে গেছে। এটি একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে যেটা গভীর উদ্বেগের সেটা হলো- সরকার বিষয়টিকে কেবল সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছে। ফলে করোনাকালীন কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও থেমে নেই মাদক কারবার। মাদকের ভয়ঙ্কর ছোবল কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ, বিপথগামী দেশের তরুণ-তরুণী।

বাংলাদেশে বেড়েছে মাদকের ব্যবহার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধার করেছে। আর এসব মাদকের মধ্যে রয়েছেÑইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ ও বিদেশি মদ, প্যাথেড্রিন, ডিনেচার্ড স্পিরিট, ভাং, বিয়ার, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বায়োজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইস পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

সম্প্রতি সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে এলএসডিও। যার ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথও। ১৯৮৯ সালে প্রণীত বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদকাসক্ত বলতে, শারীরিক বা মানসিকভাবে মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা অভ্যাসবশে মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারীকে বোঝানো হয়েছে।

এ থেকে পরিত্রাণের আশায় ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন (১৯৯০ সালের ২০নং আইন) প্রণীত হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ওই আইন ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি প্রণয়ন করা হয়। এরপরেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। উন্নতি হয়নি মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েও।

বাংলাদেশের নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক ২০১৮ সালে একটি গবেষণায় বলেছিলেন, দেশে প্রায় ৭ মিলিয়ন মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইয়াবাসেবী। এছাড়া আছে ফেন্সিডিল, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদক।

সম্প্রতি দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। যাদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত এবং ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত। তবে দেশের বেকার জনসংখ্যারও বেশ বড় অংশ মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী, যাদের ৭ শতাংশ হলো এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত।

সারা দেশে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যাঁদের মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন মহিলা। ২০১৯ সালে গড়ে প্রতিদিন ১১৪ জন রোগী সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৪ এবং ২০১৭ সালে ৬৯।

এটাও অবাক করার মতো বিষয় যে ২০১৯ সালে মহিলা মাদকসেবীদের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে ৯১ জন মহিলা সরকারি সুযোগ-সুবিধায় চিকিৎসা পেয়েছিলেন। এই সংখ্যা বেড়ে ২০১৯ সালে ৩৬০ হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে বাড়ছে মাদকের বিস্তার? সরকারি রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ১৫টি স্থান দিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে। এই পাচার বন্ধ করার দায়িত্ব যাদের, তারা কী দায়িত্ব পালন করছে?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, আগের বছরের তুলনায় করোনা সংক্রমণের বছর ২০২০ সালে সারা দেশে বেশি মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। ওই বছর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩১৭টি ইয়াবা বড়ি, ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৭৭ বোতল ফেনসিডিল, ৫০ হাজার ৭৮ কেজি গাঁজা, প্রায় ৭২ কেজি আফিম এবং প্রায় ৪ কেজি কোকেন উদ্ধার করে।

এসব ঘটনায় হওয়া ৮৫ হাজার ৭১৮টি মামলায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৯ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৬ হাজার ৩২৮টি ইয়াবা বড়ি, ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬৬৩ বোতল ফেনসিডিল, ৫০ হাজার ৭৮ কেজি গাঁজা, ৩২৩ কেজি হেরোইন, ১ কেজি আফিম ও ১ কেজি কোকেন উদ্ধার করে।

আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসেই সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৭৯৫টি ইয়াবা বড়ি, ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৭ বোতল ফেনসিডিল, ২৪ হাজার ৮৬৮ কেজি গাঁজা, ১২৯ কেজি হেরোইন, ৫৩ কেজি আফিম ও আধা কেজি কোকেন উদ্ধার করে। এসব ঘটনায় হওয়া ৩০ হাজার ৫৮৮টি মামলায় ৩৯ হাজার ৭৭৪ জনকে আসামি করা হয়।

সূত্রমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত থেকে গাঁজা এবং বেনাপোল সীমান্ত থেকে ফেনসিডিল আসছে। আর মিয়ানমার থেকে ঢুকছে সর্বনাশা ইয়াবা। গোয়েন্দা তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে প্রায় অর্ধ শত স্ট্রিপ এলএসডি মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি দুই তরুণ গ্রেফতার হয়েছিল।

সম্প্রতি দুইশ’ ব্লটার পেপার এলএসডি উদ্ধারের পাশাপাশি তিন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। আর এলএসডি নাম ভয়াবহ মাদকটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের ভেতর ঢুকছে। দেশে মাদক বিস্তারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলে দেয় মাদকের ভয়াবহতা।

মাদকের হাতছানি সারাদেশে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনা। সর্বনাশা মাদক ধ্বংস করে একটি মানুষের শরীর, মন, জ্ঞানবিবেক ও তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তার পরিবারের সব স্বপ্নকে এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

শুধু পরিবারকে নয়, মাদকের কালো থাবা ধ্বংস করে একটি সমাজকে, একটি জাতিকে এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহৎ আকার ধারণ করে একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। তরুণ তাজা প্রাণের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ায় পিছিয়ে পড়ছে সমাজ। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পথে, মাদক ঢুকে পড়ছে আমাদের সমাজে।

আর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণসমাজের প্রতি। মাদকদ্রব্য কেনাবেচা ও সেবনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ। পরিসংখ্যান যেমনই হোক- মাদক কখনই কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনে না।

তাই মাদকের প্রবেশ ও ব্যবসা রোধে কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। কাজেই মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব না হলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকার পরও মাদকের অবৈধ প্রবেশ ও ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাহিদার কারণেই এমনটি হচ্ছে। তাছাড়া শর্ষের ভ‚তের কারণেও এক্ষেত্রে সুফল মিলছে না। মাদকের বিস্তার রোধে সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।