manobkantha

সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কোভিড-১৯ এর প্রভাব

করোনাভাইরাস তথা কোভিড-১৯ জনিত এক অতিমারীতে কাবু গোটা বিশ্ব! ভাইরাসটি আক্রমণের বয়স আজ দেড় বছরের ওপর হতে চললেও এর বিস্তাররোধ, চিকিত্সা এবং একটি টেকসই সমাধান বের করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও এ সময়কালে হাতেগোনা কয়েকটি (অবশ্যই ফাস্টওয়ার্ল্ড কান্ট্রি) দেশ ভাইরাসটি প্রতিরোধে টিকা আবিষ্কার করেছে কিন্তু তার সাম্য ও সমতাভিত্তিক বণ্টন, সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনা কী হবে তা নিয়ে ইতিমধ্যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর তজ্জনিত কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও জনবহুল দেশগুলো। আর এরই অনিবার্য ফলে, আর দশটি দরিদ্র দেশের মতো বাংলাদেশও একপ্রকার ব্যাকফুটে চলে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগামী পথটি বাংলাদেশের জন্য খুব বন্ধুরই থেকে গেল।

কোভিড-১৯ সংক্রান্ত যে ক্ষয়ক্ষতি, তার মাত্রা ও ব্যাপ্তি সবকিছু এতটা অভাবনীয় যে তার প্রভাব গোটা বিশ্ব তথা মানবজাতির ওপর ঠিক কতটা পড়েছে এবং আরও কতটা হতে যাচ্ছে তা অনুমান করতে রীতিমতো খাবিখাচ্ছে পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারকরা। ইতিমধ্যে এর প্রভাবে জনজীবন, মানুষের জীবনাচরণের স্বাভাবিক গতিধারা, আয়ের উপায়, কর্মসংস্থান, উত্পাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা, আন্তঃব্যক্তিক-সামাজিক ও বৈশ্বিক যোগাযোগ পরিকাঠামোয় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত। বাংলাদেশ একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশ হওয়ায় দেশটির নানা খাতে পড়েছে তার অতিবিরূপ প্রভাব। এর প্রভাবে যে সকল ক্ষেত্র বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার শীর্ষে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএসএমই) খাত। বাংলাদেশের মানুষর আয়ের যে প্রচলিত উপায় তারমধ্যে অন্যতম খাত হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সম্পৃক্ততা অথবা এসবের পরোক্ষ যোগাযোগে গড়ে ওঠা নানামুখী কর্ম। সেই শুরু থেকে এ শিল্পে দেশের একটি বিরাট সংখ্যক মানুষের যুক্ততা তৈরি হয়েছে যা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে কয়েকগুণ।

২০১৯ সালের শিল্প খাতের জরিপ অনুযায়ী দেশে ৪৬ হাজার ২৯১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে (গৃহকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত) যার ৯৩ ভাগই কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই জরিপ অনুযায়ী কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে মানুষের কর্মসংস্থান ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। সিএমএসএমইর অবদান জিডিপির ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষ ক্ষুদ্র ও কুটির ও মাঝারি শিল্পের সাথে কোনো না কোনোভাবে নিয়োজিত। এছাড়া, প্রতিবছরই দেশে বুনিয়াদি খাত কৃষির অবদান যেভাবে কমছে সেখানে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে শিল্প খাতের অবদান। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির পরিমাণ ছিল ৩৫.৩৬ শতাংশ, যা ২০১৮-১৯ সালে ৩৫ শতাংশ। দেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩১ হাজার বলা হলেও প্রকৃত বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি। বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। দেশের অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এখাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সিএসএমই হতে পারে অন্যতম সম্ভাবনার নাম।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংক্রান্ত আরো কিছু তথ্য এখানে প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক জরিপকৃত অর্থনৈতিক জরিপ-২০১৩ অনুযায়ী দেশে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৮৪২৮৮৪, ১০৪০০৭, ৮৫৯৩১৮, ৭১০৬টি। যেখানে মোট ২ কোটি ৪৫ লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত। যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও নারীর অংশগ্রহণও কম নয়। এ খাতে নারীর সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। এসএমই ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের “বাংলাদেশের এসএমই ক্লাস্টার” শীর্ষক এক জাতীয়ভিত্তিক প্রতিবেদন (২০১৩) অনুযায়ী দেশে মোট ১৭৭টি শিল্প ক্লাস্টার রয়েছে। এ সকল ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত শিল্পবৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট পণ্য, হোসিয়ারি, ঝুটকাপড় নির্ভর তৈরি পোশাক, নকশিকাঁথা, হালকা শিল্পপণ্য, আগর গাছ থেকে তৈরিকৃত আতর, ক্রিকেট ব্যাট, বেকারি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্যপণ্য, ইলেক্ট্রনিক্সপণ্য, আর সেই সময়ের হিসেবে সেখানে কুড়ি লাখের মতো মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। আর আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারগুলোর বার্ষিক পরিমাণ ২ লাখ ৯৫ হাজার মিলিয়নের সমপরিমাণ। যা ইত্যবসরে আরও কয়েকগুণ বেড়েছে সেটা নিঃসন্দেহ হিসেবে নেয়া যায়। ঐ ক্লাস্টারসমূহে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।

করোনা সংকটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ক্ষয়ক্ষতি বহুবিধ। বিগত দেড় বছরের মতো সময়ে নানা প্রতিকূলতায় এ খাতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো- কাঁচামালের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া, উত্পাদন কমে যাওয়া, পণ্য পরিবহনে অসুবিধা, বাজার হারানো, শ্রমিক ছাঁটাই ইত্যাদি। এখন পর্যন্ত মিডিয়াসহ নানা মাধ্যমে যে সকল সংবাদ বেরিয়েছে তাদের উক্ত সকল কারণগুলোকেই প্রধান হিসেবে দেখছেন শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গও। শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক, শ্রমিকের পরিবার, শিল্পক্লাস্টারের সাথে যুক্ত আরও যে সকল সহায়ক শিল্প, কাঁচামাল সরবরাহকারী, চালক, দোকানদার, হোটেল ব্যবসায়ী, দিনমুজুর, ফড়িয়া এমন সবগুলোকে গণনায় নিলে এ শিল্পের ক্ষয়ক্ষতিকে অনেকটাই অনুমান করা সম্ভব হবে। কোভিড-১৯ এবং এর ফলে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের তরফে নেয়া প্রণোদনা প্যাকেজ ও তার সুযোগ-সুবিধা লক্ষিত জনগোষ্ঠী কীভাবে পাচ্ছে সে সংক্রান্ত একটি সমীক্ষার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও পক্ষসমূহের সাথে কথা বলেছি। তাতে দেখা যাচ্ছে দেশের (আসলে বৈশ্বিক) চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার যে সকল উদ্যোগ নিয়েছে তা টাকার অংকে এবং বিষয় বৈচিত্র্যে কম নয়। সরকার এখন পর্যন্ত কুড়িটিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচির আওতায় মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ শত কোটি টাকার পরিমাণ প্রণোদনা ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করছে। যা দেশের মোট জিডিপি’র ৪.৩২ শতাংশের কিছু বেশি (তথ্যসূত্র, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি)। এই কর্মসূচি সমূহের মধ্যে নগদ অর্থ প্রদান, আর্থিক প্রণোদনা, উত্পাদন উপকরণে ভর্তুকি, স্বল্পসুদ ও সহজ শর্তে ঋণ এবং খাদ্য সহায়তা রয়েছে। এছাড়া, ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি পরিশোধে সহায়তা, ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড বর্ধিতকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও পরিমাণ বর্ধিতকরণ, ঘর-বাড়ি তৈরির জন্য নগদ সহায়তা, খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং ১০টা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। অনেক অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি বিশ্লেষক বলছেন-সরকারের উদ্যোগ সময়োপোযোগী এবং পরিমাণের দিক থেকেও আকর্ষণীয়। কিন্তু এতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অর্থমূল্যের কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু, তা কি যথার্থ অর্থেই বাস্তবায়ন হচ্ছে? যাদের জন্য প্রণোদনা দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে সেই তারা-ই কী পাচ্ছে? পেলেও কী যথাযথভাবে পাচ্ছে? বিষয় সংশ্লিষ্ট অনেকের সাথে আলোচনা করে জানা যাচ্ছে যে এ সকল বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে কথা উঠেছে। হয়তো আরও উঠবে। কিন্তু সেটা তো উদ্দেশ্য নয়। সবারই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সরকার কিভাবে এই ব্যাপক বিস্তৃত কর্মসূচি সফল করতে পারে, অসুবিধার মধ্যে থাকা মানুষগুলোকে সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে সে বিষয়টি-ই সহায়তা করা।

সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএসএমই খাতে বেশকিছু প্রণোদনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো-ক্ষুদ্র-কুটির ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় চলতি পুঁজি সঞ্চালন এর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা। যা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ শর্তে ও সহজ সুদে উদ্যোক্তাদের নিকট পৌঁছানো হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম হিসেবে আরও ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করার জন্য পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহায়তা, সক্ষমতা তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এসএমই ফাউন্ডেশন করোনা সংকটে পতিত শিল্পখাতের সহায়তায় নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনুকূলে প্রাপ্ত ৩০০ কোটি টাকার পূণঃঅর্থায়ন কার্যক্রম চালু করেছে। এসএমই ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে সরকারে তরফে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার বিষয়ে জোর তাগিদ রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-ও ১০০ কোটি টাকা আর্থিক প্রণোদনা সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিতরণ শুরু করেছে।

তবে, এই সমস্যাটি যে একেবারে নতুন তা কিন্তু নয়। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং একীভূত আর্থিক নীতি-পদ্ধতি নিয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তাঁরা এ সংকটকে একটি পুরনো কিন্তু মৌল সংকট বলে বলে মনে করেন। বিশেষ করে, চলতি পুঁজি সংকট কাটিয়ে উঠতে ছোট ছোট শিল্প-কারখানাগুলোকে উদ্ধার করতে যা কিছুই করা হোক দীর্ঘদিনের এই সমস্যা দূর করা না গেলে প্রণোদনা প্যাকেজের সুফল তেমন একটা পাওয়া যাবে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, এসএমই ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের চেষ্টায় সমস্যাগুলির বেশ কিছুটা ইতিমধ্যে সমাধান হয়েছে। তবে পুরো সমস্যাকে দূর করতে হলে এখনও আরও অনেক প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই নিতে হবে।

অর্থনীতি ও আর্থিক নীতি গবেষক যারা আছেন তারা ইতিমধ্যে বেশকিছু বক্তব্য বা চিন্তা-চেতনা পত্রিকা তথা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, পিপিআরসি, পলিসি রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস, সানেম এবং সর্বোপরি বিআইডিএস সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষকগণ গবেষণালব্ধ বিভিন্ন নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন যেখানে সংশ্লিষ্ট খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার উপায় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক সুপারিশও করেছেন। সুপারিশসমূহের মধ্যে রয়েছে- যারা সবার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের কাছে সরকারের প্রণোদনার সেবা পৌঁছানোর সবচেয়ে উত্কৃষ্ট উপায় হচ্ছে স্বচ্ছ ও নির্ভূল তথ্যভান্ডার তৈরি করা সেই বিষয়টি। অনেকেই বলেছেন, সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ ডিজাইন, সিদ্ধান্ত চূড়ান্তকরণ এবং বাস্তবায়ন এর প্রতিটি স্তরে পিছিয়ে পড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে সেটা হবে একদেশদর্শী এবং উপর থেকে চাপিয়ে দেয়ার মতো। এছাড়া, দেশে প্রচলিত কোনো আইন, নীতিমালা বা নির্দেশনাও অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রদেয় ঋণ সুবিধা এর সুদের হারের দিক থেকে সহজ মনে হলেও এর যে মোট সময় সেটা উদ্যোক্তা বা সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য আকর্ষণীয় হয়নি বলে অনেকেই মত দিয়েছেন। যেমন-কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ নেয়ার পর তাকে দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ঋণটি শোধ করতে হবে। কিন্তু সময়ের দিক থেকে যা অতি সংক্ষিপ্ত বিশেষ করে ঋণ নিয়ে যারা ব্যবসায় চলতি পুঁজি বিনিয়োগ করবেন তাদের জন্য তা একটি বড় বিষয়। এছাড়া, অনেক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আবেদনকারী অনেক ঋণগ্রহীতাকে সময় মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারবে বলে মনে না করায় অনেকের আবেদনই শেষ পর্যন্ত আর আলোর মুখ দেখে নি। যদিও এক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী কথা শোনা যায়। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যারা বা যিনি ঋণ আবেদনের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করেন তাদের দিকটিও তো বিবেচনায় নিতে হবে।

জাতীয় র্অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং করোনা মহামারীতে এর প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ সাপেক্ষে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকারের আওতায় নিতে আসার বিকল্প নেই। তাই প্রণোদনার টাকার অঙ্ক, প্রণোদনা ঘোষণা করার মাধ্যমে সরকারের দায়িত্ব শেষ করা উচিত হবে না। সরকারের তরফে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব নিতে হবে যাতে করে সরকারের তথা জনগণের অর্থ সঠিক ও সুবিন্যস্ত পন্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন শিল্প উদ্যোক্তদের নিকট পৌঁছায়।

লেখক: অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী