manobkantha

রাজনীতির দোকান উচ্ছেদ জরুরি

ওয়াসিম ফারুক : রাজনীতি কি বা কাকে বলে তা আমাদের আম রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কতটুকু জানেন এই নিয়ে আমার যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের শহর নগর গ্রামের প্রতিটি পাড়া মহল্লায়ই বাস করেন অনেক রাজনৈতিক নেতা। গত কিছু দিন আগে আমি ঢাকার শহরের কামরাঙ্গীরচর এলাকায় একটি বিশেষ কাজে গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে কথা হলো যার সঙ্গে তিনি পূর্ব পরিচিত। এখন রাজনীতি করেন।

বর্তমান সরকারি দলের একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের বিশাল দায়িত্বে। তিনি গর্বসহকারে বললেন বড় ভাই আপনাদের দোয়ায় এখন রাজনীতি করি। আমি কিছু না বলেই কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। তার এলাকার অবস্থান, পরিচিতি সব মিলিয়ে বলা যায় রাজনৈতিক নেতাদের কৃষ্টি-কালচার বদলে যাচ্ছে। আমাদের দেশের রাজনীতির ইতিহাস ছোটখাটো নয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই মানে ইংরেজ-পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে আমাদের দেশে টংক, তেভাগা, নানকার থেকে ভাষা আন্দোলন, ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ বা তৎপরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামে রাজনীতিবিদদের অবস্থান অনস্বীকার্য। রাজনীতিবিদদের সততা নিষ্ঠা সব দলের মধ্যেই ছিল। কিন্তু হালে সেটা আর থাকছে না। রাজনীতির সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে।

আসলে রাজনীতি কাকে বলে বা রাজনীতির সংজ্ঞাই বা কি সেটা জানতে হলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে যেতে হবে? বার্নার্ড ক্রিক দাবি করেন যে, ‘রাজনীতি হলো নীতিমালার একটি স্বতন্ত্র রূপ, যার দ্বারা মানুষ নিজেদের পার্থক্য মিটিয়ে ফেলার জন্য, বৈচিত্র্যময় আগ্রহ ও মূল্যবোধ উপভোগ করার জন্য এবং সাধারণ প্রয়োজনের বিষয় পরিচালনায় সরকারি নীতি তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করে’ প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আড্রিয়ান লেফ্টউইচ সংজ্ঞা দেন যে, ‘রাজনীতি সমাজে ও সমাজসমূহের মধ্যে সমবায়, মতবিনিময় ও দ্বন্দ্বের সকল কাজের জন্ম দেয়, যার দ্বারা মানুষ তাদের জৈবিক ও সামাজিক জীবনের উৎপাদন ও প্রজননের নিমিত্তে মানবীয়, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার, উৎপাদন ও বন্টনের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে” আর ডেভিড ইস্টনের মতে, ‘এটি হলো কোন সমাজের জন্য মূল্যবান বিষয়গুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ সুষম বণ্টন’।

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাজনীতিকে যেভাবেই বর্ণনা করুক না কেন আমাদের দেশের বেলায় এর সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন আমাদের দেশে গত কয়েক যুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনীতি হলে নিয়ম নীতি না মেনে নিজের অবৈধ অর্থ ও পেশী শক্তির মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়া নিজের হীন ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলই রাজনীতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

যার হাজারো প্রমাণ বিদ্যমান। নিজেদের সেই কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য যে যেই ভাবেই পারছেন রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করে আসছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর থেকেই আমাদের দেশে পচনের রাজনীতি শুরু হয়। তার পর আশির দশকে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারগুলো তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে রাজনীতিতে হেন অপকর্ম নাই না করেছেন।

চোর ডাকাত মদাকব্যবসায়ী চোরাকারবারি সবারই ঠাই হয় রাজনীতিতে। নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল ও টিকিয়ে রাখার জন্য ঐ একই ধারা চলতে থাকে। দেশের রাজনীতি নতুন করে চলে যায় সন্ত্রাসী লুটেরা ও কালো টাকার মালিকদের হাতে। রাজনীতিতে শুরু হয় ব্যবসা। রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে যায় রাজনীতি।

আর যেই প্রবীনরা ও রাজনীতিতে লেগে থাকেন তাদের ও একটি বিরাট অংশ পরিণত হন ব্যবসায়ীতে। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। বর্তমানে বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীর বিভিন্ন নামে গড়ে তুলেছেন বহু সংগঠন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের নামে যে কত সংগঠন তা সম্ভবত কারোই জানা নেই।

তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে নামসর্বস্ব সংগঠনের সংখ্যা নাকি তিন শতাধিক । তবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সহযোগী সংগঠনগুলো হচ্ছে যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ ও তাঁতী লীগ। ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন রয়েছে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ।

এ ছাড়া অঙ্গ সংগঠন হিসেবে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিব), মহিলা শ্রমিক লীগসহ কয়েকটি সংগঠন আছে আওয়ামী লীগের। দলের গঠনতন্ত্রে লীগ নামে আর কোনও সংগঠনের ভিত্তি নেই। গত কয়েক দিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘লীগ’ নামে নতুন আরও দুটি ‘সংগঠন’ ঘুরাঘুরি ঈদ শুভেচ্ছা ও সদস্য সংগঠনের বিজ্ঞাপন দেখছিলাম। এগুলো হলো ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ ও ‘জনসেবা লীগ’।

‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ যার সভাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে একজন সমালোচিত বির্তকত ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর যিনি নিজেকে জনদরদী ঘোষণা দিয়ে নিজের নামের আগে সিস্টার জুড়ে দিয়ে নিজেকে অনেক উচ্চতার আসনে বসানোর চেষ্টায় লিপ্ত। গত বছর যখন দেশে করোনার মহামারী শুরু আমাদের পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে যখন পোশাক শিল্পের মালিকেরা নানাভাবে টানা হিঁচড়া শুরু করে নানান বিতর্কের জন্ম দিচ্ছিলেন ঠিক তখন এই হেলেনা জাহাঙ্গীর তার ফেসবুক পেজে থেকে লাইভে এসে তিনি শ্রমিকদের প্রভু সেজে গেলেন।

অতি উৎসাহের সাথে বলে ফেললেন তিনি নাকি শ্রমিকদের খাওয়ান ও ভরণপোষণ করেন। ঠিক একই সময় করোনা নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের নাজেহাল অবস্থায় দেশের মানুষ যখন বিধ্বস্ত এর মাঝে রিজেন্ট ও জেকেজির দুর্নীতিতে সারাদেশের মানুষ যখন স্তম্ভিত তখনই তিনি জিকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর সাথে তার ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে ও সাবরিনার অপকর্মের সাফাই গেয়েছেন।

এর আগে সংবাদকর্মীদের সচিবালয়ে প্রবেশের পরিচয় পত্রকে তিনি খেলার ছলে নিয়ে ও কম সমালোচিত হননি। তখন ঐ পরিচয় পত্রের ছবি নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে লিখেছিলেন এই পরিচয়পত্রের কাজ কি তা তিনি নাকি নিজেই জানেন না কেউ তাকে উৎসাহিত করেছেন আর তিনি নিয়ে নিয়েছেন। এটিএন বাংলার চেয়ারম্যানকে নিয়ে মন্তব্য।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক বিতর্কিত ব্যক্তি সেফাত উল্লা ওরফে সেফুদার সাথে লাইভ চার্ট পোস্ট এবং সম্প্রতি বোট ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবের সাফাই গেয়ে হেলেন জাহাঙ্গীর একজন বহুল সমালোচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত যিনি তার দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে কোথায় কিভাবে দাড়ি কমার ব্যবহার করতে হয় বা আদৌ করতে হয় কি না তাই জানেন না। তার পরও অদৃশ্য কারণে তিনি আওয়ামী লীগের নারী বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাও।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন। এই রাজনৈতিক সংগঠনটির গোড়াপত্তন হয় ২৩ জুন ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে এর নাম ছিল নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৫৫ সালে অসা¤প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

অনেক প্রতিকূল পরিবেশ ও অত্যাচার নির্যাতন সহ্যকরে ১৯৭১ এই রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বেই পৃথিবীর বুকে নতুন মানচিত্রের জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে পরিবার-পরিজনসহ নৃশংস হত্যার পর আবার আওয়ামী লীগের জন্য শুরু হয় প্রতিকূল পরিবেশ।

যদি মৃত্যুর আগে জাতির জনক ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীবলে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর) এবং জাতীয় লীগ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ নামের একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করেন।

যাই হউক জাতির জনকের মৃত্যুর পরে আওয়ামী লীগকে আবার ১৯৭১ পূর্ববর্তী ঐ প্রতিক‚ল অবস্থার মধ্য দিয়ে পার হতে হয়। কারন খন্দকার মোশতাক ও তার বিশেষ কিছুই জাতির জনকে হত্যার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিষ্ঠিত হয়। আর এখনকার অনেক বাঘা বাঘা নেতা সেদিন শীত নিদ্রায় সময় পার করছিলেন।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বা জোহরা তাজউদ্দীনের মতো কতজন সেদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জীবন বাজি রেখে প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন? ১৭ মে ১৯৮১ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরই বা কত জন সেদিন তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন? সেনাশাসকদের সাফারিস্যুট টেনে অনেকেই সেদিন মন্ত্রী এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন ও হয়েছেন।

আজ সেই সুবিধাভোগী অতিথি পাখিদের ভারে বঙ্গবন্ধু নৌকা আজ প্রায় ডুবতে বসেছে। যদি ও রাজনীতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি। অথচ আজ সেই মূল নীতি থেকে অনেক পথ দূরে সরে গেছে বাংলাদেশের মুক্তির নেতৃত্ব দেয়া সেই আওয়ামী লীগ।

এক সময় যারা বঙ্গবন্ধু তার পরিবার ও আওয়ামী লীগের নাম শুনলেই নাকি গোসল করে আসতেন তারা আজ বঙ্গবন্ধুর আর্দশের নিবেদিতপ্রাণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় নিজ সুবিধা রক্ষায় সবাই যেন আজ আওয়ামী লীগার। আওয়ামী লীগকে আজ এক শ্রেণি যেন ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করেছে যার ইচ্ছে বিভিন্ন জোরে এখানে দোকান খুলে বসছে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে।

পূর্বের সরকার পরিচালনায় বিএনপি ও এই বৃত্তের বাইরে ছিল না। আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের সম্পর্কে জন্ম নেয়া বিরূপ ধারণা সত্যি কষ্টকর ও বেদনাদায়ক যা আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে গভীর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে।

তাই আমাদের রাজনৈতিক দলের আদর্শবান নেতৃত্বের উচিত যত দ্রুত সম্ভব তাদের দলের ভিতর সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চর্চার মাধ্যমে দলের ভিতর শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে দলকে জঞ্জালমুক্ত করে দেশের মানুষের ভিতর রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জন্ম দেয়া।

লেখক: কলামিস্ট।