manobkantha

বাঘ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে

আফতাব চৌধুরী
আফতাব চৌধুরী

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীদের মতামতের ভিত্তিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বনাঞ্চল উজাড়ের ফলে বাঘের সর্ববৃহৎ ও সর্বশেষ আবাসস্থল বলে বিবেচিত সুন্দরবন চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার অক্ষমতার কারণে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে না চলার কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আরো ৫ লাখ নানা জাতের প্রাণী। উল্লেখ্য, গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ গ্লোবাল টাইগার ফোরাম এবং বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার উদ্যোগে হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ক’মাস আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঘের সংখ্যা নিরূপণ, উৎপাদন, বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষার ব্যাপারে কিছ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে বাংলাদেশ বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হলেও ‘দ্য ভ্যানিশিং ইন্ডিয়াস ওয়াইল্ডলাইক ক্রাইসিস’ এর লেখক প্রেরণা সিং বিল্লা মনে কমরন, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা শিল্পোন্নয়ন যাই হোক না কেন বলতে দ্বিধা নেই বাঘের আবাসস্থল ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। তার মতে, অন্য একটি সুরক্ষিত ভ‚মিতে বাঘদের সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলেও তা টেকসই সমাধান দিতে পারবে না। প্রকৃতিগতভাবে সংরক্ষিত উপযুক্ত স্থানে তাদের নিরাপদে থাকার ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে হবে।

সারা পৃথিবীতে সাকুল্যে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বাঘ অরণ্যে বেঁচে আছে যার বেশিরভাগই ভারতে। বিশেষ এক সূত্রে জানা যায়, সে সংখ্যা মেরে কেটে দু’হাজারের আশপাশ হবে। কিন্তু এ তো গেল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। জীবিত বাকি প্রজাতিগুলোর মধ্যে ইন্দো-চায়নিজ প্রজাতির বাঘের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে তিনশ’ এর মতো, মালায়ান টাইগার পাঁচশ’র মতো, সাইবেরিয়ান টাইগার-এর সংখ্যা মাত্র শ-তিনেক।

সাউথ চায়না টাইগারের সংখ্যা একশতেরও কম, সুমাত্রান টাইগারও বড়জোর শ’চারেক হবে। গত শতাব্দীর তিনেক দশকে বালি টাইগার, সাতের দশকে ক্যাসপিয়ান টাইগারও বড়জোর শ’চারেক হবে। গত শতাব্দীর তিনের দশকে বালি টাইগার, সাতের দশকে ক্যাসপিয়ান টাইগার আর আটের দশকে জাভান টাইগার পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সংখ্যাতত্ত্ব হতে অনুমান করা যাচ্ছে, বাকি প্রজাতিগুলোরও বিলুপ্তির বেশি দেরি নেই। পৃথিবী থেকে বাঘ বিলুপ্ত হলে হবেটা কী? আন্দাজ করা যেতে পারে?

গরু মারার দিকে চোখ ফেরাই। এই জঙ্গলের সর্বোচ্চ শ্বাপদ হলো লেপার্ড-কিন্তু গাউর, হাতি বা গন্ডারকে মারার ক্ষমতা তার নেই। ফলে তৃণভোজী প্রাণীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রজননের দরুন এতটাই তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে যে মনুষ্য বসতিতে তারা প্রায়শই হানা দিচ্ছে। অভয়ারণ্য সংলগ্ন অঞ্চলে তারা শস্যের ক্ষতি করে চলেছে।

মানুষের সঙ্গে এদের সংঘাত ঘটছে অনিবার্যভাবেই। এখানে যদি বাঘ থাকত, তৃণভোজীদের সংখ্যাবৃদ্ধির ওপর একটা রাশ থাকত। সুন্দরবনের কথাই ধরা যাক। সুন্দরবনের যে দ্বীপগুলো ব্যাঘ্র অধ্যুষিত নয়-সেখানকার জঙ্গলে আর ব্যাঘ্র অধ্যুষিত দ্বীপগুলোর জঙ্গলের তুলনা করলে সহজেই প্রতিভাত হবে আসল অবস্থান। সে শুধু জঙ্গলের রাজাই নয়, পাহারাদারও বটে। আসলে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে আছে বাঘ। অবলুপ্ত হলে খাদ্যশৃঙ্খলটা আর থাকবে না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হবেই।

১৯০০ সালে ভারত উপমহাদেশে বাঘের সংখ্যা ছিল লাখের কাছাকাছি। সুন্দরবন অঞ্চলেই ছিল এর সংখ্যা বেশি। ১৯৭০-এ এই সংখ্যাটা নেমে এলো চার হাজারে। অর্থাৎ সত্তর বছরে আমরা ছিয়ানব্বই হাজার বাঘ মারতে সক্ষম হয়েছি। স্বাধীনতার পরেও বাঘ মারাটা কোনো অপরাধ ছিল না। ছিল শৌর্যের পরিচয়। সুন্দরবন অঞ্চলে এক বাঘের রাজাই একশো আটটা বাঘ মেরেছিলেন।

এটা নাকি তারা বংশানুক্রমে পালন করে চলতেন। এর বেশিরভাগই বহু লোক-লস্কর, বন্দক, হাতি দিয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যা বিনা কারণে। ফলাফল ‘টাইগার ক্রাইসিস’। সেটা ছিল সত্তরের দশক। ইতিমধ্যে সংখ্যা বেড়েছে। শিল্প বিপ্লব এসে গেছে সর্বত্র। আরও বেশি জমি চাই। শহর বাড়াতে হবে, কৃষিজমি বাড়াতে হবে, আরও খাদ্য, চাই পানিবিদ্যুৎ, অতএব গাছ কাটো।

পরিসংখ্যান বলছে, সুন্দরবন অঞ্চলে অরণ্যচ্ছেদনের হার বছরে তিন শতাংশেরও বেশি। আমাদের বাড়ি, আমাদের রাস্তা, আমাদের রেল, আমাদের কারখানা তৈরির ফলে উত্তরোত্তর বাঘদের বাসস্থান কমতে থাকল। এক অরণ্যের সাথে অন্য অরণ্যে যেতে হলে অনিবার্য হলো মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সংস্পর্শে। ফল যা হবার তাই হলো। বাঘদের সংখ্যা কমতে থাকলো দ্রুতহারে।

তৈরি হলো আর এক সংকট। ফের খানিক পরিসংখ্যান। ভারতে শেষ দু’দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ, শেষ চার দশকে চীনের জনংসখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। চীন অরণ্য ধ্বংস করছে। ভারতে ঘটনাটা একটু অন্য রকম। সেখানে লাগোয়া দুটো অরণ্যের মধ্যে জাঁকিয়ে বসেছে দরিদ্র জনগণ। এই দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

পশুটির মাংসে মেশাচ্ছে বিষ। পেঞ্চ ন্যাশনাল পার্কে গেলে গ্রীষ্মেই বাঘিনালার বাঘিনী এই রকম এক ঘটনায় দুই বাচ্চাসহ প্রাণ হারিয়েছে। তাছাড়া, দালালদের কাছেও তো এসেছে তথ্য, যে বাঘদের সর্বাঙ্গ প্রজাতির কাছে বিক্রি হয় চড়া দামে। দালালরা ধরল ফড়েদের হাত। তারা চলে এল আদিবাসীদের কাছে। আদিবাসীরা বড় হয়েছে অরণ্যের মাঝে।

অরণ্যেকে তারা নিজেদের হাতের তালুর মতো চেনে, কিন্তু অনাহার যে তাদের নীতি নৈতিকতাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে ক্ষুধাভর্তি পেটে। তাই খুব স্বল্প অর্থের বিনিময়ে তারা সংসার চাঁদদের বাঘের সর্বাঙ্গের জোগানদার হয়ে ওঠে। হঠাৎ একদিন দেখা যায় সারিস্কসা থেকে বাঘ ভ্যানিশ। রঘু চান্দোয়াত আর্তনাদ হয়ে ওঠেন পান্না ন্যাশনাল পার্কের বাঘেদের অবস্থা দেখে।

প্রথম প্রথম তারা জঙ্গলে ঢুকত সবেকি অস্ত্র, সাবেকি ফাঁদ নিয়ে। কিন্তু এক সময় তাদের হাতে এসে গেল আধুনিক মারণাস্ত্র। মারণক্ষমতা বাড়ল কয়েক গুণ। কিছু কিছু চোরাকারবারি ধরা পড়ল, শাস্তিও হল। কিন্তু চোরাশিকার থামানো গেল না পুরোপুরি। বিপন্নতার আরো কারণ বাঘের স্বভাব। দুই থেকে তিন বছর বয়সের বাঘেরা মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকার পর নিজেদের আলাদা জায়গা খুঁজতে থাকে।

নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে বাঘের ত্রিশ বর্গকিলোমিটার এবং বাঘিনীর পাঁচ থেকে দশ বর্গ কিলোমিটার এলাকার প্রয়োজন। অরণ্যচ্ছেদের ফলে অরণ্য বহরে কমছে। ফলে এলাকা দখলের প্রয়োজনে বাঘকে ‘কোর’ এরিয়া ছেড়ে ‘ফ্রিঞ্চ’ এলাকায় চলে আসতে হচ্ছে অতঃপর মানুষের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

খবরে প্রকাশ, এই বছরের ২৬ জুন পর্যন্ত ৭৪টি বাঘ মারা পড়েছে। সরকারি ছবিই যদি এই রকম হয়, তাহলে আসল চিত্রটা আরও ভয়ঙ্কর হতেই পারে। ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’র দেয়া চিত্রটা দেখলে স্পষ্ট হবে, চৌদ্দটি বাঘ হয় তড়িতাহত, না-হলে বিষক্রিয়া বা চোরাশিকারিদের হাতে প্রাণ দিয়েছে। আর ষোলোটা বাঘের থাবা বা নখ বা দেহের অন্য কোনো অঙ্গ পুলিশ বা বনবিভাগের দ্বারা উদ্ধার হয়েছে। সুতরাং, সংখ্যাটা দাঁড়াল ত্রিশ। আঠারোটা বাঘের মৃত্যু হয়েছে বার্ধক্যে, নিজেদের মধ্যে মারামারি বা ট্রেন বা সড়ক দুর্ঘটনায়। বাকি ছাব্বিশটাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।

রঘু চান্দোয়াতের গলায় গলা মিলিয়ে বলতে হয় বাঘেরা মোটেই ভালো নেই, ভালো না-থাকার কারণও একাধিক। বনভ‚মি নিধন, পোচিং, বনভ‚মিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রভৃতি উল্লেখ্য। তাহলে উপায়? সোজা হিসাব, এক, চোরাশিকার বন্ধ করতে পাহারাদারি আর কড়া আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ দুই, অরণ্যচ্ছেদন বন্ধ করতে হবে।

মঙ্গোলিয় উপজাতির কাছে বাঘের বিভিন্ন অঙ্গের চাহিদা মেটাতে তাদের সামনে বিকল্প উপস্থাপন করা যেতে পারে। যথা, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা। সহজলভ্য এই বিকল্প তাদের ব্যাঘ্রনিধনে অনুৎসাহিত করতে পারে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের থেকেও বোধহয় বাঘেদের বিপদ চোরাশিকার।

চীনদের আড়কাঠিরা এ দেশে নানা পদ্ধতিতে চোরাশিকার করে, যেমন-বিষপ্রয়োগ-বাঘ সাধারণত একেবারে নিজের শিকারের পুরোটা খেয়ে ফেলে না। লুকিয়ে রাখা আধ-খাওয়া শিকারে বিষ প্রয়োগ চোরাশিকারিদের প্রিয় অস্ত্র। বা ধরা যাক, স্টিল ট্র্যাপ, এগুলো এত শক্তিশালী যে এগুলোকে খুলতে ছয়-সাত জন শক্তিশালী পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রয়োজন। হাল আমলে আগ্নেয়াস্ত্র বা ২২০ ভোল্ট ১১ কেভি বৈদ্যুতিক তার বাঘের চলাচলের পথে ফেলে রেখে বাঘ মারার পদ্ধতি গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছে মধ্য ভারতের কিছু জঙ্গলে।

বলতে দ্বিধা নেই, সুন্দরবনকে বাঁচানো আজ কেবল বাংলাদেশের দাবি নয়, এটি আন্তর্জাতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, বিশ্ব ঐতিহ্যের সাক্ষী বাংলাদেশের সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ ধ্বংস ও বিলুপ্তির মুখে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অজস্র সংবাদ যথা সুন্দরবনের গাছের রোগ প্রাণী বৈচিত্র্যের বিলুপ্তি, বনজ সম্পদ ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর নির্বিচার নিধন ও চোরা শিকারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি খুবই গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হচ্ছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক ভয়াবহ তথ্য সেটি হলো পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি যার পরিণতিতে সুন্দরবনের এক বিরাট অংশ আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এ অতুলনীয় বনভূমির অস্তিত্বের আশংকায় চিন্তিত। সুন্দরবনের পাশেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ইতিমধ্যেই পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।

পরিবেশ নিয়েই প্রায় তিনি যুগেরও বেশি সময় থেকে আমিও গবেষণা ও লেখালেখি করে আসছি, পেয়েছি জাতীয় পুরস্কারও। আমারও সরকার বরাবরে বিনীত আবেদন থাকেলো দেশের পরিবেশ বিনষ্ট হয়, সুন্দরবন তথা সারা দেশের ক্ষতি হয় এমন কাজটি করতে সংশ্লিষ্ট মহল যেন বার বার চিন্তা- ভাবনা করেন।

এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে স্থাপনের পর যদি দেখা যায় আমাদের উপকার না হয়ে অপকার হয় তাহলে তা তো আগেবাগেই বিবেচনা করা উচিত। পরিবেশবাদীদের দাবীর প্রতি সরকারের বিশেষ বিবেচনার অনুরোধ আমার পক্ষ থেকেও থাকল।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।