manobkantha

স্থবির যুবলীগের কার্যক্রম

রাজনৈতিক দলগুলো সারা দেশে সকল উপজেলা, জেলা ও মহানগরের সম্মেলন করেই অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় সম্মেলন। কিন্তু যুবলীগের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। কোথাও কোনো শাখার সম্মেলন ছাড়াই ২০১৯ সালের যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধান্ত ছিল দেশের বৃহৎ এই যুব সংগঠনটি দেশব্যাপী সৎ, নিষ্ঠাবান, মেধাবী ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অবিচলদের সমন্বয়ে সকল জেলা, উপজেলা কমিটি গঠন করা হবে।

প্রায় ২০ মাসে শুধুমাত্র ফরিদপুর জেলা শাখা ব্যতীত দেশের কোথাও কোনো কমিটি দিতে পারেননি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক বিভাগের দায়িত্ব বণ্টন করতে বছর পার করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। যে কারণে বর্তমান যুবলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই থমকে আছে। অধিকাংশ জেলা, মহানগর ও উপজেলা কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হলে কংগ্রেস বা নতুন কমিটি গঠনের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

তবে ক্যাসিনোকাণ্ডে সমালোচিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কমিটিও এখনো বহাল রয়েছে। সেই কমিটি চলছে ভারপ্রাপ্ত নেতাদের দিয়েই। ঢাকা উত্তর যুবলীগের চিত্র একই অবস্থা। ভারপ্রাপ্ত নেতাকে দিয়ে সেই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ সভাপতিও চলছে। তবে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন করোনার কারণে সব কিছুই পিছিয়ে গেছে। করোনার কারণে সম্মেলন করা যাচ্ছে না। কিছুতেই আগানো যাচ্ছে না। সম্মেলন যেহেতু করা যাচ্ছে না তাই অনেক সিদ্ধান্তও নেয়া হচ্ছে না বলে নেতারা জানান।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৩ নভেম্বর যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসে সংগঠনের চেয়ারম্যান পদে আসেন শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন মাঈনুল হোসেন খান নিখিল। এরপর শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের লড়াই। সেটাও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঘোষণার এক বছরের মাথায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়।

২০২০ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় যুবলীগ ২০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। সেই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য, সাবেক ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন জেলা থেকে ওঠে এসেছে নতুন মুখ, সিসি কমিটির সদস্য ও সাবেক কমিটির বেশ কয়েকজন। কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিকও। নতুন কমিটিতে বাদ পড়েছেন যুবলীগের গত কমিটির বিতর্কিত নেতারা। পাশাপাশি বয়স ৫৫ বছরের বেশি হওয়ায় বাদ পড়েছেন ৭০ জনের বেশি। তবে সিনিয়র-জুনিয়র ভারসাম্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সেই সময়। তারপর সেই প্রশ্নের সমাধান করেননি সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

সূত্র আরো জানায়, যুবলীগের আগের কমিটি বাতিল করে দ্রুত সম্মেলন করার পেছনে অন্যতম আরেকটি কারণ ছিল- দলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটির একাধিক প্রভাবশালী নেতা নানা রকম অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একের পর এক ঝটিকা অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বেরিয়ে আসে যুবলীগ নেতাদের ক্যাসিনোর ব্যবসা, প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদারি, তদবির বাণিজ্যসহ নানা অপরাধে যুক্ত হওয়ার কাহিনী। তারপর সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে দূরে রেখেই করা জাতীয় কংগ্রেস। তবে রয়ে গেছে ঢাকা মহানগরের দুই শাখা কমিটি। ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দক্ষিণ যুবলীগে সভাপতিকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সিনিয়র সহ-সভাপতি মাইনুদ্দিন রানাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারপর থেকে সেই কমিটি দিয়ে চলতে থাকে মহানগরের সকল কার্যক্রম।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জাকির হোসেন বাবুল। ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হাসান নিখিলকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঘোষণার পর একই মঞ্চে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জাকির হোসেন বাবুলের নাম ঘোষণা করে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এরপর চলতি বছরের গত ৫ মে শুধু মাত্র ফরিদপুর যুবলীগের ২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আহ্বায়ক করা হয়েছে জিয়াউল হাসানকে। যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে মেহেদী হাসান শামীম তালুকদার ও খান মো. শাহ সুলতানকে। এ ছাড়া সদস্য করা হয়েছে ১৮ জনকে। তবে সাংগঠনিক কার্যক্রম থমকে থাকলেও মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করছেন সংগঠনের নেতারা।

তারা বলছেন, ‘মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তের সহায়তায় ধারাবাহিকভাবে উপহার খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে যুবলীগ। করোনা আক্রান্ত রোগী, তাদের পরিবারের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে যুবলীগ। করোনার সংক্রমণ শুরু হলে দেশব্যাপী নাগরিক সচেতনতায় কাজ শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিটি ইউনিট। প্রথমদিকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও মাস্ক বিতরণ করে নেতাকর্মীরা।

পরবর্তীতে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে কর্মহীন, ছিন্নমূল, অসহায় মানুষের খাদ্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সংগঠনের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, ফ্রি সবজি দোকান, ইফতার সরবরাহ, রান্না করা খাবার সরবরাহ, করোনার মৃতদেহ দাফন এবং ফ্রি টেলি মেডিসিন সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সংগঠনকে করোনার কারণে সাংগঠনিকভাবে গড়ে তোলা যায়নি। সংগঠন থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বলতে আমরা যা বুঝাব সেটা হলো যে, আমাদের দায়িত্ব ছিল অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেইভাবে বলতে গেলে আমরা মোটামুটি সফলতা অর্জন করেছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা, মহানগর ও সিটি করপোরেশনের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীরাও ব্যক্তিগতভাবে দুস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের কার্যক্রম এই জায়গার মধ্যেই এখনো আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনার কারণে সব কিছুই পিছিয়ে গেছে। কিছুতেই আগাতে পারছি না। করোনার কারণে সম্মেলন করা যাচ্ছে না। সম্মেলন যেহেতু করা যাচ্ছে না তাই অনেক সিদ্ধান্তও নিতে পারতেছি না। আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে করতে প্রস্তুত না। আমরা স্পষ্ট থেকে সম্মেলন করতে চাই। আমাদের বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা অলরেডি মুভ করছিলেন। সম্মেলন করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারছেন না। কারণ করোনা সংক্রমণ কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে।’