manobkantha

'বাদশাহ নামদার' : মুঘল অন্দরের মর্মস্পর্শী পাঠ

'বাদশাহ নামদার' : মুঘল অন্দরের মর্মস্পর্শী পাঠ

ইতিহাসকে কেন্দ্র করে উপন্যাস সাহিত্য খুব বেশি পড়ার সুযোগ হয়নি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়েছি হুমায়ূন আহমেদের লেখা। এই সংক্রান্ত যে কয়েকটি উপন্যাস তিনি লিখেছেন, তার মধ্যে 'বাদশাহ নামদার' তার অন্যতম লেখা। হুমায়ূন আহমেদ সূক্ষ্ম হাতে মুঘলদের ঘরের ইতিহাসের একটি খন্ডাংশ সাধারণ পাঠকের ‌সামনে‌ অক্ষর বন্দী করেছেন। লেখাটা খুব সহজেই একজন পাঠককে বিমোহিত করবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২০১১ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।

ছোট থেকেই ইতিহাস ব্যপারটা নিয়ে একটা আগ্রহ কাজ করতো। ক্লাস সিক্স সেভেনের সমাজ বইয়ের ইতিহাস পড়ে মনে হত সব কেমন কাটখোট্টা। কিন্তু 'বাদশাহ নামদার' পড়ে বুঝলাম ইতিহাসকেও এত সুন্দর ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা যায়।

মুঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুন এর জীবন কাহিনি নিয়েই বইটি। এটি পড়তে পড়তে একজন পাঠকের এক সেকেন্ডের জন্যও মনে হবে না তিনি একটি সিলেবাস ভিত্তিক চিরাচরিত কোনো ইতিহাসের বই পড়ছেন।

মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের বৈচিত্র্যময় শাসনকাল, তার কঠোরতা, চরিত্রের খামখেয়ালিপনা, প্রেমিক হৃদয় এবং তার চারপাশের বহুবর্ণের বিচিত্র মানুষকে ইতিহাসের পাতা থেকে লেখক তার এই উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন।

লেখক তার বইয়ে সম্রাট হুমায়ুন কে এতটাই দারুণভাবেই তুলে ধরেছেন যে বইটি পড়তে পড়তেই পাঠক হুমায়ুনকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে, সম্রাটের হার-জিত সবকিছুই পাঠক অনুভব করবেন। এমনকি রক্তাক্ত হাতেও সম্রাটের কোমল হৃদয়কে দেখতে পাবেন পাঠক।

পিতা বাবরের সঙ্গে রক্তাক্ত হাতে রাজ্য জয়, পুত্র হুমায়ুনের জন্য সম্রাট বাবরের জীবনদান, হুমায়ুন এর সিংহাসন গ্রহন, তার দিন ভিত্তিক পোশাক এমন অনেক কিছুই লেখক উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। তিনি ছিলেন এক ব্যাতিক্রমধর্মী সম্রাট।সম্রাট হুমায়ুন শুধু তার খামখেয়ালিপনা আর কোমল হৃদয়ের জন্যই বিখ্যাত ছিলেন এমন নয়, বরং মুঘল চিত্রকলার সূচনা হয়েছিলো তার হাত ধরেই। হুমায়ুন একজন কবিও ছিলেন বটে। কবিতা এবং কথায় কথায় শের রচনা করতে তিনি পছন্দ করতেন।

সম্রাট হুমায়ুন ছিলেন প্রেমিক হৃদয়ের ব্যাক্তি।যিনি সাম্রাজ্য হারিয়ে প্রায় সর্বহারা হয়েও হামিদা বানু নামের১৪ বছর বয়সী চপল এক কিশোরীর প্রেমে পড়েন। যে সময়ে তিনি একজন পরাজিত সম্রাট যার পালানোর সব রাস্তা বন্ধ,সে সময়ে তিনি হামিদা বানুকে বিবাহ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হামিদা বানুকে রাজি করানোর জন্য সম্রাট উপবাস থাকার ঘোষণাও দেন। উপন্যাসে স্ত্রী হামিদা বানুর জন্য হুমায়ুনের রচিত একটি শের উল্লেখ রয়েছে,

"একজন প্রেমিকের কাছে চন্দ্র হলো তার প্রেমিকার মুখ,
আর জোছনা হলো প্রেমিকার দীর্ঘশ্বাস।"

বলা বাহুল্য, এই হামিদা বানুর গর্ভেই জন্ম নেন সম্রাট আকবর। আকবর দ্য গ্রেট। সম্রাট হুমায়ুনের সর্বহারা সময়েও হামিদা বানু তার সঙ্গ ছাড়েননি। ব্যস্ত সম্রাটকে কাছে পেয়ে গাছ তলায়ও উথলিত প্রেম দেখে পাঠকের হৃদয়ে দোলা বইবে।

সম্রাট হুমায়ুন এর খামখেয়ালিপনা স্বভাবের পরও তার একটি বড় ক্ষমতা ছিলো তা হচ্ছে মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতা। যেই ক্ষমতার জন্য সবকিছু হারিয়েও আবার ফিরে পেয়েছেন। বার বার পরাজিত হয়েও তিনি তার সাম্রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন,মুঘল ঐতিহ্যও বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

হাজারো উত্থান-পতনের মাঝেও বারবার হুমায়ুন কন্যা আকিকার নামটি বারবার উঠে এসেছে। কন্যার প্রতি সম্রাটের প্রগাঢ় ভালোবাসার নিদর্শন এটি।

উপন্যাসে 'বৈরাম খাঁ' এক বিশেষ চরিত্র। যিনি ছিলেন সম্রাটের প্রধান সেনাপতি। যার বীরত্ব আর সাহসিকতার কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। যিনি সম্রাটের শক্তি ছিলেন, যার বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতার জন্য সম্রাট সব হারিয়েও আবার ফিরে পেয়েছিলেন বার বার। সম্রাট হুমায়ুন বৈরাম খাঁ কে 'রাজাদের রাজা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

তবে হুমায়ূনের মত ভালো বৈরাম খাঁ এর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি আকবরের সঙ্গে। শেষ জীবনে সম্রাট হুমায়ুন বৈরাম খাঁর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলেন। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবরের অভিভাবক এবং দিল্লীর শাসন কার্যের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে কথিত আছে পরবর্তীতে সম্রাট আকবরই বৈরাম খাঁ কে হত্যা করান।

২৩১ পৃষ্ঠার উপন্যাস। কিন্তু পড়া শেষ হয়ে যাবে এক নিমিষেই। সম্রাট হুমায়ুনের গল্প এ উপন্যাসে এতটাই মাধুর্য পেয়েছে যে, পাঠক সম্রাট হুমায়ূনের রাজত্বকে অন্তরে অনুভব করতে পারবে। রাজ্য শাসনে একজন হৃদয়বান সম্রাটকে দেখতে পেয়ে কখনো হৃদয়ে বইবে সকালের রোদ, কখনো হিমেল হাওয়া। সেই অনুভূতি পেতে বইটি ইতিহাসের অবশ্য পাঠ হওয়া উচিৎ।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, সাভার মডেল কলেজ