manobkantha

মহামারীকালে আরেকটি ঈদ

বছর ঘুরে আবারো এলো ত্যাগ আর উৎসর্গের আদর্শে মহিমান্বিত পবিত্র ঈদুল আজহা। বুধবার যথাযোগ্য মর্যাদায় সারাদেশে কোরবানির ঈদ উদযাপিত হচ্ছে। তবে এবারো ঈদ এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এবারো মুসলিম বিশ্ব যখন কোরবানি ঈদ উদযাপন করছে তখনো বিশ্বব্যাপী চলছে মহামারী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর মহাতাণ্ডব।

এই করোনা মহামারীর কারণে বিপর্যস্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অগণিত মানুষ। মঙ্গলবার মারা গেছে রেকর্ড ২০০ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৫৭৯ জন। তাদের জীবনের ওপর নেমে আসা এ দুঃসময়ের অন্ধকার কবে কাটবে, তাও অজানা।

কোরবানির ঈদ যতটা না আনন্দের তার চেয়ে বেশি উৎসর্গের। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু নিজ সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর এই ত্যাগের মনোভাবের কথা স্মরণ করেই প্রতি বছর মুসলমানরা কোরবানি করে থাকেন।

প্রতি বছর ঈদে শহর ছেড়ে স্বজনের কাছে গ্রামে ফেরেন কোটি মানুষ। পথে যানজট, ভাঙা সড়কে যত দুর্ভোগই হোক তবু ঘরে ফেরা চাই। এবারো নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ঢাকা ছেড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। তবে ঈদ পরবর্তী কঠোর লকডাউনের ঘোষণার কারণে অনেকেই বাড়ি যাচ্ছেন না। আবার কাজ হারিয়ে অনেকে আগেই একেবারে গ্রামে চলে গেছেন। চলতি বছরে ঈদুল ফিতরও উদযাপিত হয়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে বিধিনিষেধের বেড়াজালের মধ্যে। এবার ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে সেই কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই।

ঈদুল আজহা মানে- লোক দেখিয়ে বহু দামে কেনা পশু জবাই নয়। রুটি-গোশত খাওয়ার দিনও নয়। নয় দানের নামে লোক দেখিয়ে গোশত বিলানো। আল্লাহভীতি থেকে আত্মত্যাগের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহর পথে কোরবানি করাই হলো ঈদের শিক্ষা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘চাহি নাকো গাভী দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’

ঈদুল আজহাতে চাঁদ দেখার আনন্দময় অনিশ্চয়তা নেই। কারণ ১০ দিন আগেই ১২ জুলাই নিশ্চিত হয়ে গেছে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনক্ষণ। সে অনুযায়ী পছন্দের কোরবানির পশু কিনেছেন সামর্থ্যবানরা। করোনার কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চলছে অর্থনৈতিক সংকট। যারা গতবার কোরবানি দিয়েছেন তাদের অনেকেই এবার কোরবানি দেয়া সামর্থ্য হারিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানি দিতে পারছেন না প্রায় ৩০ শতাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তার পরও ঈদের অনেক কিছুই চলবে চিরাচরিত ধারা মেনে। মানুষ একে-অপরকে শুভেচ্ছা জানাবেন। রাজনীতিবিদরাও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাবেন।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা আলাদা বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ রাজনীতিকরা। বহু বছরের মধ্যে এই চতুর্থবারের মতো বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন না।

চলতি বছরের ঈদুল ফিতরেও শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি। শর্ত সাপেক্ষে খোলা আছে শপিংমল ও বিপণি বিতান। কিন্তু সেখানেও রয়েছে ক্রেতাসংকট। পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতা, অথচ ক্রেতা পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন ঈদ তারা জীবনেও দেখেননি। গত দুই বছর কোনো ব্যবসাপাতি নেই।

ঈদের শুরুটা হয় ঈদগাহে সবাই মিলে নামাজ পড়তে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। করোনার কারণে গত ৫১ বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নেই আয়োজন প্রধান জামাতের। ঐতিহাসিক শোলাকিয়াতেও অনুষ্ঠিত হয়নি বৃহৎ জামাত। করোনার বিস্তার রোধে দেশের কোথাও এবার ঈদগাহে জামাত হয়নি। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদুল আজহার প্রথম জামাত সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হয়।

করোনা ভাইরাস মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করার জন্য খতিব ও ইমামগণকে অনুরোধ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ইমাম ও মসজিদগুলোর পরিচালনা কমিটির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাঙালির কাছে ঈদ শুধু আনন্দের নয়, সব ভেদাভেদ ভুলে পরম শত্রুকেও বুকে টেনে নেয়ার দিন। কিন্তু করোনার সংকটে এখানেও বাধা রয়েছে। ঈদ জামাতের পর কোলাকুলি করা যাবে না, হাত মেলানো যাবে না। ঈদের আগের কয়েকদিনে কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যান পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদযাপনে। গোটা দুনিয়ায় যা বাংলাদেশের ‘ঈদযাত্রা’ নামে পরিচিত পেয়েছে।

কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে অপরিসীম দুর্ভোগ সয়ে প্রিয়জনের কাছে ফেরার যে আনন্দ, তা দুনিয়ায় আর কোনো জাতি জানে না! করোনা রোধে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে না যাওয়ার বারণ থাকলেও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। মোবাইল ফোন ইউজারের হিসেবে ঢাকা ছেড়েছেন ১৭ লাখ মানুষ।

প্রতি বছর ঈদে সরকারি ভবন, সড়ক সাজানো হয় রঙিন বাতি ও পতাকায়। করোনার কারণে এবার নেই কোনো সাজসজ্জা। প্রতি বছর ঈদে নতুন করে সাজে চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, বিনোদন কেন্দ্র। লাখো মানুষের ভিড় হয়। এবার করোনা ঠেকাতে সব বন্ধ। তবে সরকারি আশ্রয়কেন্দ, হাসপাতাল, কারাগারে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। করোনার কারণে নাটক, সিনেমার শুটিং বন্ধ। তাই নেই নতুন টিভি অনুষ্ঠান।

৪ হাজার বছর আগে মুসলমানদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন তার সবচেয়ে আদরের ধন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিজ ছেলেকেই কোরবানি করার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়।

হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমা স্মরণ করে মুসলমানরা প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায় তার পথে পশু কোরবানি করেন। ঈদের পরের দুই দিনও পশু কোরবানির বিধান রয়েছে। আগামী ২৩ জুলাই আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি ফরজ হলেও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না দরিদ্ররাও। কোরবানির পশুর গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার বিধান আছে।

ঈদ মুসলমানদের সার্বজনীন অনুষ্ঠান হলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাঙালি মুসলমানরা জৌলুসপূর্ণ ঈদ উদযাপন করেন। বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম যুগে ঈদ সাদামাটাভাবে উদযাপন করা হলেও মুঘল ও নবাব আমলে তা উৎসবের রূপ পায়। ১৭ শতকে পরিব্রাজক মীর্জা নাথানের ‘বাহরিস্তানে গায়েবি’ বইয়ে বাঙালির বর্ণিল ঈদের বর্ণনা পাওয়া যায়।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘ঈদে বাঙালি মুসলমানরা একে-অন্যের বাড়ি যেতেন। সেখানে আহারের ব্যবস্থা থাকত। ঈদের দিন মুসলমান নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়ে সুন্দর কাপড় পরত। সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা সহকারে ঈদগাহে যেত। অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মুক্ত হস্তে অর্থ ও উপহারাদি ছড়িয়ে দিতেন। সাধারণ মুসলমানরা গরিবদের দান-খয়রাত করতেন।’

ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীকে মুঠোফোনে অডিও বার্তায় ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুভেচ্ছা বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, আমি শেখ হাসিনা, বছর ঘুরে আবার পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে এসেছে। আমি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’

শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন, করোনা ভাইরাস মহামারীর সব অন্ধকার কাটিয়ে ঈদুল আজহা সবার মাঝে আনন্দ বয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রী ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

বার্তাটির শেষে, তিনি করোনা ভাইরাসের বিস্তার বন্ধে স্বাস্থ্য নির্দেশিকাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সবার উদ্দেশে বলেন, ‘ভালো থাকুন এবং সুরক্ষিত থাকুন, ঈদ মোবারক!’। ঈদ মানেই তো ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। নজরুলের কবিতার মতো সবার প্রাণ বলে উঠবে- ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।/দোস্ত দুশমন পর ও আপন/সবার মহল আজি হউক রওনক/যে আছ দূরে যে আছ কাছে/সবারে আজ মোর সালাম পৌঁছে’।