manobkantha

ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে ইভ্যালি!

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি কি তাদের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে? পণ্য সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের (মার্চেন্ট) সঙ্গে একে একে তারা তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করছে। পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকদের খুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছেন- ‘ইভ্যালির দেয়া ভাউচারে তারা আর পণ্য সরবরাহ করবে না। তারা ইভ্যালির কাছ থেকে পণ্যের দাম পাচ্ছে না।’

এরই মধ্যে ইভ্যালি তাদের অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হটলাইনেও সাড়া দিচ্ছেন না কেউ। ইভ্যালির ফেসবুক পেজে ক্রেতা ও বিক্রেতারা নানা অভিযোগ দিচ্ছেন অনবরত। কিন্তু কেউ জবাব দিচ্ছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান ও এমডি কেউ ফোন ধরছেন না।

সব মিলিয়ে ইভ্যালিতে লগ্নিকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে টাকা হারানোর আতঙ্ক। এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ৩৩৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। চেয়ারম্যান-এমডির বিরুদ্ধে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ইভ্যালির পরিণতিও কি ডেসটিনির মতো হতে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে গ্রাহকদের মনে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বকেয়া টাকার জন্য পণ্য সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং পণ্য না পেয়ে অর্থ ফেরতের দাবিতে গ্রাহকরা ঢু মারছেন ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস ইভ্যালির ধানমণ্ডির কার্যালয়ের সামনে। ইভ্যালির কার্যালয়টি বন্ধ দেখে অনেকেই নিরাশ হচ্ছেন। অল্প দামে পছন্দের পণ্যের জন্য অনেকে টাকা দিয়ে এখন ঘুরছেন।

তবে কাউকেই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন ধানমণ্ডির কার্যালয়ে আসা গ্রাহহরা। পণ্য সরবরাহকারী বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরাও ঘুরে যাচ্ছেন। কিন্তু ইভ্যালির অফিস তালাবন্ধ- এমনটাই গতকাল বিকাল পর্যন্ত ধানমণ্ডির কার্যালয়ের সামনে দেখা যায়।

ধানমণ্ডির কার্যালয়ে আসা মিসবাহ উদ্দিন নামে এক গ্রাহক বলেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের বিভিন্ন সময়ে এসি, মোটরসাইকেল, বৈদ্যুতিক পাখাসহ প্রায় ৫ লাখ টাকার পণ্যের ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন। পণ্য সরবরাহের সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো একটি পণ্যও পাননি। ৪৫ কার্যদিবস পার হওয়ার পর ইভ্যালির কার্যালয়ে ষষ্ঠবারের মতো এসেছেন নাজমুল হুদা। তার অভিযোগ, এরই মধ্যে ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কয়েক হাজার টাকা খরচ করেছেন। কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।

ইভ্যালি কার্যালয়ে আসা গ্রাহকদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তারা হটলাইনে ফোন করেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। এমন অভিযোগের পর ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ারে (০৯৬৩৮১১১৬৬৬) ফোন করেন এই প্রতিবেদক। ৬ মিনিট অপেক্ষার পরও কাস্টমার কেয়ারের কারো কাছে কলটি দেয়া হয়নি।

ভবনের নিচে দায়িত্বরত একজন নিরাপত্তাকর্মী জানালেন, কঠোর লকডাউন শুরুর আগে গত ২৭ জুন থেকে অফিস বন্ধ রেখেছে ইভ্যালি। ঈদের আগে আর খোলার সম্ভাবনাও নেই।

অফিসের সামনে টানানো একটি নোটিসে লেখা দেখা যায়, ‘মহামারী পরিস্থিতির কারণে সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোম অফিস চালু আছে। ফলে এই অফিস থেকে সশরীরে কোনো সেবা দেয়া হবে না।’ একই ধরনের একটি নোটিস গতকাল শুক্রবার দুপুরে ইভ্যালির ফেসবুক পেজেও দেখা যায়।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এক/দুই মাসের আগাম সময় নিয়ে প্রায় অর্ধেক মূল্যে পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ‘অফার’ দেয়া শুরু করেছিল ইভ্যালি। তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, এসি, প্রাইভেটকারসহ নানা পণ্যের ক্রেতাদের সমারোহ ঘটেছিল ইভ্যালিতে। স্বল্প মূল্যের এসব পণ্যের জন্য টাকা নেয়া হতো অগ্রিম। কিন্তু কিছু ক্রেতাকে পণ্য দিয়ে বাকিদের অপেক্ষায় রাখার কৌশল নিয়ে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল বলে পরে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এসব অনিয়ম নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নানা কথা উঠলেও কোনো ব্যবস্থা তখন নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে আইন ও নীতিমালা ‘না থাকার’ কথা বলা হচ্ছিল সে সময়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক স¤প্রতি ইভ্যালির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিলে কোম্পানির গাড্ডায় পড়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সেখানে বলা হয়, ‘গত ১৪ মার্চ ইভ্যালি ডটকমের মোট সম্পদ ছিল ৯১ কোটি ৬৯ লাখ ৪২ হাজার ৮৪৬ টাকা (চলতি সম্পদ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩৬ টাকা) এবং মোট দায় ছিল ৪০৭ কোটি ১৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৪ টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকের কাছে ইভ্যালির দায় ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬০ টাকা এবং মার্চেন্টের কাছে দায় ১৮৯ কোটি ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৪ টাকা।’ ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর ইভ্যালির বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুদককে অনুরোধ করা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

চলতি মাসের শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক নীতিমালায় বলা হয়, অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে পণ্যের অর্ডার নেয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তা সরবরাহ করতে হবে এবং ১০ শতাংশের বেশি অগ্রিম টাকা নেয়া যাবে না।

এদিকে গ্রাহকের অসংখ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইভ্যালির কাছে এসবের জবাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ই-ক্যাব। বৃহস্পতিবার রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠানো ওই চিঠির উত্তর চাওয়া হয়েছে সাত দিনের মধ্যে। কয়েকটি ব্যাংক তাদের কার্ডের মাধ্যমে ইভ্যালি থেকে পণ্য কেনার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও (মার্চেন্ট) ইভ্যালির সঙ্গে ব্যবসা বন্ধেও সংবাদ জানাতে শুরু করেছে।

গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া অগ্রিম এবং মার্চেন্টের পাওনা ৩৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা ‘আত্মসাৎ ও পাচারের’ অভিযোগে এরই মধ্যে ইভ্যালির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। এর অংশ হিসেবে রাসেল ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

ইভ্যালিসহ ১৪টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে সিআইডি। এর মধ্যে ধামাকা নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। পর্যায়ক্রমে অন্যগুলোর বিষয়েও এক ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে কথা বলতে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের দুটি নম্বরে ফোন করে বন্ধ পাওয়া যায়। ওয়েবসাইটে দেয়া হটলাইনে ফোন করা হলে স্বয়ংক্রিয় কণ্ঠ বাজতে শোনা যায়, কিন্তু প্রতিনিধিদের কেউ ফোন ধরছেন না। তবে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল একটি পোস্ট করেন। সেখানে লেখেন, ‘ স্যার, আপনি মারা গেছেন। এমন কথা শুনার অনুভ‚তি কেমন হবে ?”

দেখুন: