manobkantha

মানুষকে সচেতন হতেই হবে

প্রিয়জনের মৃত্যুতে হাসপাতালের চারদিক ভারি হচ্ছে। একদিকে আতঙ্ক আবার অন্যদিকে জীবন জীবিকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে সবাইকে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছেন। মানুষ না থাকলে অর্থনৈতিক অবস্থাও ঠিক থাকবে না। দেশের মানুষকে সংক্রমণের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করার জন্য কঠোর লকডাউনের প্রয়োজন আছে।

অনেক মানুষ আত্মসচেতন হওয়ার চিন্তা কমর না। তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজন যাতে মানুষ সচেতন হয়। গত সীমিত লকডাউনে দেখলাম গার্মেন্টস, ব্যাংক, অফিস খোলা অন্যদিকে গণপরিবহন বন্ধ। কঠোর লকডাউন ঘোষণা করার সময় সাধারণ ছুটি দিয়ে গার্মেন্টস এবং কলকারখানাসহ সব অফিস কয়েকদিনের জন্য বন্ধ রাখা দরকার ছিল।

এখন যেভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে তা অনেক ক্ষেত্রে কম বাড়ত বলে আমি মনে করছি। গত বছর সাধারণ ছুটি এবং লকডাউন একসাথে চলেছিল বলে সংক্রমণের মাত্রা কম ছিল। সরকার যা ভালো মনে করবেন তাই করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দাবি থাকতে পারে। জীবন জীবিকাও চলবে পাশাপাশি সংক্রমণ যদি বাড়ে সাধারণ ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে।

সাধারণ ছুটির সাথে সাথে খাদ্যদ্রব্য পরিবহনে নিয়োজিত গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া সকল প্রকার যানবাহন বন্ধ রাখতে হবে। পৃথিবী ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারিতে অনেক দেশ স্তব্ধ হয়ে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু অবিবেচক মানুষ এই দুরবস্থাকে পুঁজি করে আংগুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

অনেক বিত্তবানদের দেখা যাচ্ছে তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন। নানা অজুহাতে কর্মচারীদের বেতন কম দেয়ার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে অনেকে কর্মহীন হয়ে শহর থেকে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এই করুণ পরিস্থিতিতে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করা দরকার। সেবামূলক মনোভাব জাগ্রত করা খুব জরুরি।

করোনার কালো থাবায় প্রতিদিন কেউ না কেউ হারিয়ে যাচ্ছেন। এমন অনেক নিম্ন মধ্যবিত্ত আছেন যারা কাউকে কিছু প্রকাশ করতে পারছেন না। যারা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে আপনারা এবার নিজের শক্তিকে মানবতার জন্য ব্যয় করুন। ইতিহাস আপনাদের সম্মান জানাবে। ইতিহাস আপনাদের মনে রাখবে।

বিত্তবান মানুষেরা ভাবুন সব সহায় সম্পদ রেখেই আমাদের চলে যেতে হবে। চলুন করোনাকালীন সময়ে মানবসেবার ওপর গুরুত্ব আরোপ করি। করোনার এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের খুব প্রয়োজন। কোতোয়ালি আর নিউমার্কেট এর মোড়ে সকাল বেলা যখন অফিসের গাড়ির জন্য দাঁড়াই তখন দেখি অনেক শ্রমজীবী মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন।

কারণ অনেক কারখানায় শ্রমিকদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা থাকে না। অনেক শ্রমিককে দেখা যায় তাদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় মাস্ক পরে না। যারা ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দূর থেকে এসে অফিস করেন তাদের যে কি অবস্থা হচ্ছে তা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। আবার অনেক কোম্পানির নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা খুব নাজুক। অফিসাররা অনেক কষ্ট করে অফিস করেন।

গার্মেন্টস মালিকরা সব প্রতিকূল অবস্থার মাঝেও গার্মেন্টস খোলা রেখেছেন। যারা এই সব প্রতিষ্ঠানের মালিক তারা অবশ্যই দেশের সচেতন ব্যক্তিত্ব এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি। অনেক মালিক আছেন যারা বিদেশে বসে আমাদের দেশে ব্যবসায় পরিচালনা করেন। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে গার্মেন্টস শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম।

দেশের বর্তমান অবস্থায় আমি মনে করি সকল গার্মেন্টস, কল কারখানা কিছু দিনের জন্য বন্ধ রেখে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর লকডাউনে সহযোগিতা করা। যে হারে সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে তাতে নিরাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। প্রতিদিন মৃত্যু তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাব- গার্মেন্টস এবং শিল্প কারখানার শ্রমিক, কর্মচারীরা যদি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তাদের পরিবারকে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার জন্য।

ব্যাংকে যারা নিয়োজিত আছেন তারা প্রতিদিন বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে আসছেন। অনেক ব্যাংক কর্মচারী, কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। সরকারের দেয়া লকডাউনে ঘরে থাকতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ঘরে থাকতে পারছি না। কারখানা রিলেটেড অফিসে চাকরি করে বলে প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে।

আমার মতো হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন গ্রাম থেকে শহরে চাকরি করতে যাচ্ছেন। আবার বিকালে শহর থেকে গ্রামে যাচ্ছেন। এই যাওয়া আসার মাধ্যমে করোনা ভাইরাসও যাওয়া আসা করছে। এই লিখাটা যখন লিখতে বসেছি তখন ১১০০০ এর উপরে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে।

প্রতিদিন ২০০ জনের উপরে মানুষ মারা যাচ্ছেন। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে লাশের সংখ্যা। সেই সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরে ধস নেমেছে। করোনার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর অবস্থা সংকটে আছে।

তবে খুব খারাপ এটাও বলা যাবে না। একজন সব্জি বিক্রেতা বাজারে সব্জি বিক্রয় করতে পারছেন। একজন মাছ বিক্রেতা তিনি মাছ বিক্রয় করছেন। একজন রিক্সাচালক তিনি রিক্সা চালিয়ে জীবন ধারণ করতে পারছেন। নিম্ন আয়ের মানুষ সরকার বা উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহায়তা পেয়েছেন। যে মানুষগুলো বিভিন্ন শোরুম অথবা মার্কেটে চাকরি করেন তাদের অবস্থা খারাপ হতে চলেছে।

মার্কেটগুলো বন্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের কর্মচারীদের বেতন বোনাস দিতে গড়িমসি করার চেষ্টা করবেন। অসংখ্য মানুষ পত্রিকা অফিসে চাকরি করেন। এই দুর্যোগের দিনে তারাও আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি আগামী ঈদুল আজহার বোনাস এবং বেতন কর্মচারীরা যেন যথাসময়ে পান তার ব্যবস্থা করতে হবে।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিভিন্ন সহায়তা থেকে বঞ্চিত। সামাজিক অবস্থান, মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক ধ্যানধারণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ অন্য বিষয়গুলোর কারণে মুখফুটে যারা অসহায়ত্বের কথা বলতে পারছে না তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পৃথিবী নিজেই যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, সেই পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশও যে মৃত্যু আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শিকার হবে এটাই স্বাভাবিক, শিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে ক্ষতির শিকারে পরিণত হচ্ছে।

তারপরও মানুষ সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছে সব ধরনের প্রতিক‚লতাকে অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। মহামারীকে জয় করে জীবন জয়ের গান গেয়ে বেড়াচ্ছে। কঠোর মনোবলে নতুন শক্তিতে নব উদ্দীপনা আর দৃঢ়তায় দাঁড়াতে হয়। পুরো পৃথিবী এমন প্রচেষ্টাতেই নতুন আর এক পৃথিবী হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

আমরা নিজেরাও সে প্রচেষ্টার সক্রিয় সাহসী সহযাত্রী। করোনার লকডাউনেও অফিস করছি নিজের এবং দেশের অর্থনৈতিক গতি ঠিক রাখার জন্য। করোনাকে আমরা জয় করতে পারব। সেই সাহস, দৃঢ়তা ও মনোবল আছে। তারপরও এটি সত্যি, করোনায় আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে যে ক্ষতি হয়েছে এবং এখনো প্রতিদিন হচ্ছে তা সহজে পূরণীয় হবে না। বহুকাল ধরে এর মূল্য দিতে হবে।

এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। লকডাউন সময়কালীন অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রতিটি শহর অনেক মানুষের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে। কর্মজীবী মানুষগুলোর বিশাল অংশ তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরে থাকেন বিরাট একটা আশা নিয়ে।

তারা তাদের ছেলেমেয়েদের শহরের স্কুলে পড়ান একটা বড় স্বপ্ন নিয়ে। অনেক নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন এখন ভেঙে যাওয়ার পথে। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে গ্রামে চলে গেছে এই রকম অনেক পরিবার আছে। বিগত এক বছর ধরে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকার ভেতর আবার শুরু হয়েছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এর তাণ্ডব।

এই তাণ্ডবের আঘাতে অনেক পরিবারের কর্মক্ষম লোকটি আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। সামনে ঈদ আসছে। ঈদের সাধারণ ছুটিকে দীর্ঘায়িত করা হোক। ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পাবলিক গাড়িসহ সকল যানবাহন বন্ধ রাখতে পারলে করোনা সংক্রমণ অনেক কমে আসবে বলে আমি মনে করি।

বিশিষ্ট জনদের দ্বারা সরকার পরিচালিত হয়। আমি আবেদন জানাব গরিব এবং অসহায় মানুষের জন্য খাদ্য এবং চিকিৎসার সুব্যবস্থা করে প্রয়োজন মনে করলে আরো কঠোর লকডাউন এবং সাধারণ ছুটি দেয়ার চিন্তা ভাবনা করা হোক। প্রতিটি মানুষ নিরাপদ হোক।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।