manobkantha

অটোরিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত অমানবিক

সুকান্ত দাস : গ্রামাঞ্চলে যারা পুরাতন ঘর ভেঙে নতুন ঘর তৈরি করে তাদের কার্যক্রম দেখলে আমরা একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে জানতে পারি। তারা ততদিন পুরাতন ঘরেই বসবাস করে যতদিন নতুন ঘর তৈরির সামর্থ্য তাদের না হয় কিংবা নতুন ঘর তৈরির খরচ জোগাড় করতে না পারে।

যখন তারা মনে করে যে নতুন ঘর তৈরির সামর্থ্য তাদের আছে তখনই তারা পুরাতন ঘর ভেঙে ফেলে। এর আগে অবশ্যই তারা নতুন ঘর তৈরির অধিকাংশ জিনিসপত্র আগে থেকে এনে রাখে। যতই সমস্যা হোক যতদিন নতুন ঘর তৈরি সামর্থ্য না থাকে ততদিন তারা পুরাতন ঘর ভেঙ্গে ফেলে না।

একথা মাথায় রেখে বলছি-গত ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদারকরণ এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধে যেসব প্যাডেলচালিত রিকশা ভ্যানে ব্যাটারি লাগানো হয়েছে সেসব থেকে সেসব রিকশা-ভ্যান থেকে মোটর যন্ত্র খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালেও একবার আইন করে মহাসড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তের সাথে উপরের দুটি ঘটনা নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায় হঠাৎ করে অটোরিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী নয়। অটোরিকশা যেখানে তৈরি হয় সেখানে বিধিনিষেধ আরোপ না করে, তৈরি বন্ধ না করে চালক কেন চালাচ্ছে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আবার ১০ লাখ অটোরিকশা বন্ধ করার পর ১৫ লাখ অটোরিকশা চালক যে বেকার হয়ে যাবে তাদের সংসার কীভাবে চলবে সেই বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি।

নতুন ঘর তৈরির সামর্থ্য নাই আবার সমস্যা হচ্ছে বলে পুরাতন ও ভেঙ্গে ফেললে শেষে যেমন থাকার জায়গাই থাকে না। অটোরিকশা চালকদের কোনো ব্যবস্থা না করে হঠাৎ করে অটোরিকশা বন্ধ করে দিলেও একই অবস্থা হবে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান বন্ধ করার পেছনে যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে তা হলো - দ্রুত গতিতে চলে, ব্রেক করলে উল্টে যায়, ব্যাটারি চার্জ দিয়ে বিদ্যুতের অপচয় করে, যানজট বৃদ্ধি করে। কিন্তু রিকশা বন্ধ হলে যে সেই পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে, জনগণের ভোগান্তি বাড়বে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পরিবেশ দূষণ করছে না, যেখানে পরিবেশ দূষণ বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা এগুলো কি চিন্তা করা হয়েছে।

সব জিনিসের ভালো খারাপ দুটো দিকই আছে। গণপরিবহনের প্রতিনিয়ত নারীরা হেনস্তার শিকার হচ্ছে, কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষিত করছে, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে তাই বলে কি এখন গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হবে? মাথা ব্যথা বলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে? একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে ঢাকা শহরের অল্প দূরত্বের ট্রিপ হয় ৮০ শতাংশ। যেখানে অধিক দূরত্বের ট্রিপ হয় মাত্র ২০ শতাংশ। এই ৮০ শতাংশ ট্রিপের অধিকাংশই অটোরিকশা দিয়ে হয়।

ঢাকা শহরের মোট সড়কের পরিমাণ ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এসব সড়কের অধিকাংশই অলি-গলির রাস্তা। সেখানে তো অন্য কোনো গাড়ি চলে না বা তেমন কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত স্কুল বাস, মহিলাদের জন্য বাস নেই। যারা কোচিং বা টিউশনি যাবে তাদের যাতায়াতের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই।

তাহলে শিক্ষার্থী, নারী এবং শারীরিক ভাবে চলাচলে অক্ষম মানুষ কিভাবে চলাচল করবে? জলাবদ্ধতা প্রত্যেকটা মহানগরীর ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। ঢাকায় এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি। অল্প বৃষ্টি হলেই রাস্তায় হাঁটুপানি কোথাও কোমর পানি হয়ে যায়। তখন চলাচলের একমাত্র মাধ্যম রিকশা। কারণ অন্য কোনো যানবাহন পানির মধ্যে চালাতে চান না চালকেরা কারণ এতে গাড়ির ক্ষতি হয়,গাড়ি অকেজো হয়ে যায়।

তখন রিকশা ছাড়া চলা চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় অনেক রিকশার গ্যারেজ আছে। উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসহায়, দুস্থ, কর্মসংস্থানহীন, নদী ভাঙনে সর্বহারা মানুষ, লোনাপানিতে জমিতে চাষাবাদ করতে না পারা কৃষক রাজধানীতে এসে গ্যারেজ মালিকদের থেকে ভাড়ায় রিকশা নিয়ে চালায় জীবিকার তাগিদে।

তারা তো এলাকার বাড়িঘর সবকিছু হারিয়ে এসে জীবিকার তাগিদে এই রিকশা চালায়। এটাও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তারা যাবে কোথায়। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকবে কীভাবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ(বিলস) পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ রিকশায় চড়ে।

রাজধানীতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) একমাত্র রিকশা লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ, যেখানে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ৭৮ হাজার ৫৫৪টি রিকশা লাইসেন্স ইস্যু করেছে। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরের রিক্সার প্রকৃত সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। রিকশা চালক ও তাদের পরিবার ঢাকা শহরের রিকশার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয় রিকশাচালকদের মাসিক ১৩ হাজার ৩৮২ টাকা।

যার ৬৮ শতাংশ আসে রিকশা চালনা থেকে। প্রায় ৯০ ভাগের একমাত্র পেশা রিকশা চালনা। এদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোনো জমি নেই। ঢাকায় রিকশা চালানো শুরু করার আগে বেশিরভাগই ছিল দিনমজুর(৫৭.১৭ শতাংশ), ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ যুক্ত ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়, ১২ দশমিক ১ শতাংশ ছিল কৃষিকাজে। তাদের রিকশা চালানোর কাজে আসার মূল কারণ কর্মসংস্থানের অভাব।

ঢাকা শহরের প্রায় সকল রিকশা (৯৬ শতাংশ) চালকের মালিকানাধীন নয়। তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকা পরিশোধ করে ভাড়ায় রিকশা চালায়। করোনার কারণে দেশে বেকারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। গত সেপ্টেম্বরে বিবিএস এক টেলিফোন জরিপ করে দেখেছে করোনা শুরুর তিন মাস চার মাসে বেকারত্ব বেড়ে গিয়ে ছিল অনেক।

যেমন গত বছরের মার্চ মাসের তুলনায় জুলাই মাসে বেকারত্বের হার দশগুণ বেড়েছিল। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর কারণে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়েছেন। করোনার এক বছরে দেশে নতুন দরিদ্র আড়াই কোটি মানুষ।

রিকশাচালকদের জীবিকার কোনো ব্যবস্থা না করে রিকশা বন্ধ করা হলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাবে। কারণ তারা তখন জীবিকার তাগিদে যেকোনো কিছু করবে। এমন অনেক অটোরিকশাচালক আছেন যার পায়ে সমস্যা আছে। ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ছাড়া প্যাডেলচালিত রিকশা বা অন্য কোনো কাজ করা সম্ভব নয় তাদের দ্বারা। তারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছে। অটোরিকশা বন্ধ করে দেয়া হলে এই লোকের সংসার চলবে কীভাবে?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি জনসভায় বলেছিলেন, ‘আপনি চাকরি করেন আপনার মাইনে দেয় ওই কৃষক, ওই শ্রমিক’। তাহলে যারা চাকরি করে তাদের বেতনের টাকায় এই ১৫ লাখ অটোরিকশা চালকের অবদান আছে। তারা দেশের নাগরিক। তাই তাদের উপর এমন অমানবিক আচরণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এত রিকশাচালক তো ঢাকায় থাকতো না।

যদি প্রভাবশালীদের ক্ষমতার জোরে এলাকায় লবণ পানি ঢুকে ফসলি জমি নষ্ট না হতো, যদি নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন দেয়া হতো তাহলে এরা কেউ ঢাকা শহরে আসত না। তারা গ্রামেই ভালো ছিল। কিন্তু সেখানে যখনই অন্নের অভাব হয়েছে তখনই এরা শহরে এসেছে। অন্য কিছু না করতে পেরে রিকশা চালিয়ে পরিবারের খরচ চালাচ্ছে। এরা কিন্তু বাধ্য হয়ে এটা করছে।

এখন তাদের হাত থেকে যদি রিকশাও কেড়ে নেয়া হয় তাহলে তাদের আর কোনো গতি থাকবে না। যেখানে মেট্রোরেল চালু হচ্ছে, কারণে-অকারণে বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে, পরিবেশ দূষণকারী হাজারো এসি চলছে সেখানে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ার কারণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের যুক্তিটা অনেকটা হাস্যকর। দেশ তো বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর তারা তো বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ নিচ্ছে না। মূল্য পরিশোধ করছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?

ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার আগে রিকশা চালকদের জীবীকার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে চরম দুর্দশার শিকার হবে ১৫ লাখ রিকশাচালক এবং তাদের পরিবার। যদিও এদেশের উচ্ছেদের পর পুনর্বাসনের তেমন কোনো সুখস্মৃতি নেই। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের পর তারা কি করে সংসার চালাবে সেই ব্যবস্থা করতে হবে তার পর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে পর্যুদস্ত সমগ্র দেশ। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন হবে, শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যে বিশাল সংখ্যক তরুণ বেকার হয়ে বসে আছে তাদের কীভাবে কর্মক্ষেত্রে আনা যাবে, করোনায় কাজ হারানো মানুষেরা কীভাবে আবার তাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে পারবে সেই বিষয় নিয়ে চিন্তা করা উচিত কর্তৃপক্ষের।

করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের জীবীকার ব্যবস্থা করে তারপর অটোরিকশা বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সর্বশেষ একটা কথা বলবো, একটি সচেতন দম্পতি সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে তার যাবতীয় যা দরকার তার ব্যবস্থা করে রাখে। আগেকার দিনে জনগণ ছিলো রাজার সন্তানের সমতুল্য।

এখন রাজতন্ত্র না থাকলেও এবং সরকার নিজেকে জনগণের সেবক বলে দাবি করলেও জনগণ সরকারের কাছে সন্তান তুল্য। আশাকরি সরকারও সচেতন বাবা মায়ের মতো আগে সন্তানের খাবার ব্যবস্থা করে তারপর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক।