manobkantha

বাজেটে কর্মসংস্থানের গুরুত্ব দেয়া জরুরি

বাজেট শব্দটি প্রান্তিক মানুষের নিকট খুব একটা পরিচিত নয়, তবে এর ফলাফল ভোগ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। জুন মাস এলেই শোরগোল শোনা যায় বাজেট নিয়ে বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহলে। বাজেট সংসদে উপস্থাপন হয় আবার আলোচনাও হয়। এক পর্যায়ে সরকারি দলের সদস্যদের সমর্থনে পাসও হয়।

বিরোধী দল কখনো ওয়াক আউট আবার কখনো বিরোধিতা । যদিও সংসদে বাজেট আলোচনায় সংসদ সদস্যরা বাজেট আলোচনার চেয়ে অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন বেশি। সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট আর বিরোধী দলের জনবিরোধী বাজেট। এসব শব্দ আমাদের নিকট খুব পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বাজেট ভাবনাকে ভিন্নভাবে দেখে থাকে।

সাধারণ মানুষের ভাবনায় থাকে না রিজার্ভ কিংবা জিডিপি। বুঝে না আমদানি রফতানি নীতিমালা। জানে না বাজেট ঘাটতি কি এবং কেন ? শুধু বুঝে কোন জিনিসের দাম বাড়বে আর কোন জিনিসের দাম কমবে। যদিও আমাদের দেশে জিনিসের দাম কমার সম্ভাবনা খুই কম। একবার যেকোনো প্রকারে জিনিসের বেড়ে গেলে তা কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তথাপি প্রান্তিক সাধারণ মানুষ গুলো আশায় থাকে একটু ভালো থাকার প্রত্যাশায়। বেঁচে থাকতে চায় স্বপ্ন নিয়ে দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনটি দল দেশের ক্ষমতায় গিয়েছে কিছু ভিন্ন সময় বাদ দিলে। সবার চেষ্টাই ছিল দেশের উন্নতি এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে চাওয়া এবং সে চাওয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক ফারাক লক্ষ্য করা গেছে।

প্রতিবারই বাজেট হয় জনগণের কথা বিবেচনা কমর। তবে সেখানে প্রান্তিক মানুষের কতটা ভাবা হয় সেটা বিবেচ্য বিষয়। দিন দিন বাজেটের আকার বাড়ছে, যার ফলে প্রতিবারই বাজেটের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ বাড়ছে উৎপাদন বাড়ছে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে তাই বাজেটের আকার বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।

এ অর্থবছর জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বিশাল অংকের বাজেট ঘোষণা করেছেন। যার মধ্যে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সত্যিকার অর্থে করোনাকালে এ বিপুল অংকের বাজেটের হিসাব মেলানো কষ্টকর।

তবে করোনাকালের এ বাজেটে ব্যয় সংকোচনের বিষয়টি আরো গুরুত্ব দেয়া যেত। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ - শিরোনামের এ বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার বিষয়টি। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসা এ বাজেটের অন্যতম দিক বলে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে যে পরিমাণ ঘাটতি দেখানো হয়েছে তা জিপিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ। উত্থাপিত বাজেটে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ যা অর্থের আকারে ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে এ জিডিপি এই করোনা মহামারীকালে অর্জন সম্ভব কি না? একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সঠিক মূল্যস্ফীতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

গত বাজেটে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী কিন্তু গত এপ্রিলে এটা কিছুটা বেড়ে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটা এ বছর ধরা হয়েছে ৫.৩ শতাংশ। করোনাকালে এ মূল্যস্ফীতি ধরে রাখা কঠিন বলেই ধরে নেয়া যায়। রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটের রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাজেটের এইসব বিষয় অর্জন করতে হলে সত্যিকার অর্থেই একটি ব্যাপক চ্যালেঞ্জ নিতে হবে সরকারকে। বাজেটে যে পরিমাণে ঘাটতি দেখানো হয়েছে সে ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার বৈদেশিক ঋণ এবং দেশের অভ্যন্তর থেকে ব্যাংক ঋণ নেয়ার প্রস্তাবনা করেছেন।

দেশের অভ্যন্তর থেকে ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়াটা খুব একটা জটিল বিষয় নয়। ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তারল্য সঙ্কট হবে না আশ্বস্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির। যদিও অর্থমন্ত্রী আশার কথা বলেছেন যে, আমরা এখন ঋণ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

কিন্তু ঋণ এর সঠিক ব্যবহারটা সুন্দর হওয়া বাঞ্ছনীয়। অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে বিগত সময়ের চেয়ে এ বছরের বাজেট বাস্তবায়ন অনেকটাই চ্যালেঞ্জ এবং কষ্টসাধ্য। এ বিচারে এ বছর মুঠোফোন, মাশরুম, শিল্প লবণ , চুইং গাম, বিদেশি রড ও সমজাতীয় পণ, বিদেশি মাংস, বিদেশি গাজর-টমেটো, বিদেশি সাবান, বিদেশি বিস্কুট এর দাম বাড়তে পারে।

বাজেটে নতুন করে কর আরোপ না করায় চাল, ডাল, চিনি, লবণ, পাউরুটি, সাবান, বোতলজাত পানি, ফলের জুস, মসলা ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের দাম বাড়ার কথা নয়। তবে সমস্যাটা হলো বাজেট ঘোষণার সময় কোনো নিয়মনীতি না মেনেই ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সব দোষ চলে যায় বাজেটের ওপর।

কিন্তু সমস্যাটা হলো এসব পণ্যের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায় বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলে। যার ফলে বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। বুঝতে পারা যায় না বাজেটের সুবিধা অসুবিধা। ফলে আমরা ধরেই নিয়েছি যে বাজেট হলে সকল পণ্যের দাম বাড়বেই। গত বছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।

এ বছর তা বাড়িয়ে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। করোনা মোকাবিলায় এবাজেট নিতান্তই অপ্রতুল। তবে যা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা থেকে বরাদ্দ বাড়ানো যেমন জরুরি তেমনি দুর্নীতিমুক্ত রেখে এ বাজেট ব্যবহার করাটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবারই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার একটা প্রক্রিয়া থাকে। আর এ নিয়ে সবাই নেগেটিভ কথা বললেও বাজেটে সে প্রক্রিয়াটা সচল থেকেই যায়।

যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন কালো টাকা আর অপ্রদর্শিত আয় এক নয়। অপ্রদর্শিত আয় সিস্টেমলসের কারণে হয়ে থাকে। মোট কথা হচ্ছে কালো টাকা বন্ধ করতে হলে এ টাকার উৎস মুখ খুঁজে বের করে মুখ বন্ধ করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের মানুষের জীবন জীবিকা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যে বাজেটের কথা বলা হয়েছে তা বাজেট বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের সামাজিক বেষ্টনীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে মানুষকে সরকারি সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন। এদিকে নজর দিয়ে সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় প্রথমবারের মতো লাখ কোটি বরাদ্দ রেখেছে বাজেটে। তবে সবচেয়ে বড় কথা দেশে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করা গেলে দেশের অর্থনীতি উদ্ধার করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়বে।

বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়ে সরকারের সহযোগিতার মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে না। এ বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুস্পষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা চোখে পড়ার মতো নয়। এমনকি উদ্যোক্তা তৈরি করার ক্ষেত্রে বাজেটে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করা দের মধ্যে বৈদেশিক রেমিট্যান্স অন্যতম।

করোনার কারণে এ খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি চাকুরেদের বিশেষ করে নিচের স্তরের কর্মচারীদের ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন। স্কেল পরিবর্তন না করে প্রতিবছর ৫% বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রায় অর্থনৈতিক বাধার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কারণ এ বৃদ্ধিতে স্কেল প্রদানের চেয়ে লাভবান হচ্ছে কম চাকুরেরা। করোনার প্রভাবে শিক্ষা খাতের অর্থনৈতিক দিক লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়ে চলে। তাদের দিকে বাজেটে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল। কৃষিনির্ভর দেশে কৃষির আধুুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব বেশি দেয়া প্রয়োজন। আর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজেট কৃষির গুরুত্ব অনুধাবন করে সঠিক বরাদ্দের এবং কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে কৃষককে সহযোগিতা করণের সুস্পষ্ট নীতিমালা।

অনেক ভালো থিম এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। সমাজের সকল স্তরের মানুষকে অর্থনৈতিক চাকায় সংযুক্ত করার অনেক বিষয় এখানে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের কর্মী নিয়োগে কর ছাড়ের বিষয়টি বিশেষ সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার আশা যোগাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হল উন্নয়নশীল দেশে বাজেট একটি জটিল বিষয়।

এখানে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি সে তুলনায় প্রাপ্তি কম। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা হচ্ছে বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। অপরপক্ষে যে বাজেট করা হয় তার ব্যবহারটা সঠিক দুর্নীতিমুক্তভাবে করা গেলে সাধারণ মানুষ সুফল পেত অনেক। করোনাকালের এ বাজেট জনবান্ধব হবে এই প্রত্যাশা প্রান্তিক মানুষ অবশ্যই করতে পারে এ সরকারের নিকট।

বাজেটের সকল সুফল জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে তখনই যখন সমাজের উপরের স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। আর এ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালানায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। সবমিলিয়ে লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বাজেটের বাস্তবায়ন জরুরি।

লেখক: শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী