manobkantha

স্বেচ্ছায় রক্তদান: মানবিকতা ও দায়বদ্ধতা

রক্ত মানুষের জীবনীশক্তির মূল, বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার। পৃথিবীতে রক্তই একমাত্র ‘জীবন্ত সত্তা’ যার মাঝে কোনো জাতি ভেদ, ধর্ম ভেদ, বর্ণ ভেদ নেই। ধনী-গরিব, সাদা-কালো সবারই রক্তের বৈশিষ্ট্য ও বর্ণ একই। মানুষ সামাজিক জীব। সে হিসেবে মানুষের একে অপরের প্রতি রয়েছে কিছু সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। আর এর মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান অন্যতম।

রক্তদান একটি মহৎ মানবিক কাজ। আপনার রক্তের মাধ্যমে আরেকজন মানুষের প্রাণ বেঁচে যাবে এর মতো মহৎ মানবিক কাজ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টা হতে পারে না। রক্ত মানবদেহের অপরিহার্য ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পূর্ণমাত্রায় রক্ত থাকলে মানবদেহ থাকবে সজীব ও সক্রিয়। আর রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া দেখা দিলেই শরীর অকেজো ও দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রাণশক্তিতে ভাটা পড়ে।

এই অপরিহার্য উপাদানটি কলকারখানায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় না বড় বড় ল্যাব ও গবেষণাগারে। বিজ্ঞানীদের নিরসল চেষ্টা সত্তে¡ও এখনও রক্তের বিকল্প দ্বিতীয় কোনো উপাদান তৈরি করা সম্ভব হয়নি, নিকট ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে এমনটাও আশা করা যায় না। মানুষের রক্তের প্রয়োজনে মানুষকেই রক্ত দিতে হয়। জীবন বাঁচানোর জন্য রক্তদান এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বলা হয় ‘করিলে রক্তদান, বাঁচিবে একটি প্রাণ’, ‘আপনার রক্ত দিন, একটি জীবন বাঁচান’, ‘সময় তুমি হার মেনেছ রক্তদানের কাছে, দশটি মিনিট করলে খরচ একটি জীবন বাঁচে।’

প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ১৪ জুন ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ পালন করা। যেসব রক্তযোদ্ধারা অসংখ্য, অগণিত মুমূর্ষু রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেন তাদের দানের মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্যে বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালন করা হয়। এ দিবস পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের জনগণকে প্রাণঘাতী রক্তবাহিত রোগ এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সিসহ অন্যান্য রোগ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য স্বেচ্ছায় রক্তদান ও রক্তের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অবগত করা।

১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’ এ সেøাগান নিয়ে পালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৪ সালে প্রথম পালিত হয়েছিল বিশ্ব রক্তদান দিবস। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য অধিবেশনের পর থেকে প্রতিবছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডবিøউএইচও) এ দিবস পালনের জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।

বর্তমানের প্রচলিত রক্তের গ্রæপের (অ, ই, অই,ঙ) আবিষ্কারক বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডইস্টেনার জন্মদিন ১৪ জুন ১৮৬৮। তার স্মরণে ২০০৪ সাল থেকে ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে ১০৭ কোটি ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ স্বেচ্ছা রক্তদাতা আর ৫৯ শতাংশ আত্মীয় রক্তদাতা।

বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদানের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। উন্নত বিশ্বে স্বেচ্ছা রক্তদানের হার প্রতি এক হাজারে ৪০ জন আর উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রতি এক হাজারে ৪ জনেরও কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২ শতাংশ লোকও যদি বছরে একবার রক্তদান করে তাহলে আমাদের দেশে রক্তের অভাব থাকবে না।

রক্তই জীবন। মানুষের শরীরে রক্তের প্রয়োজনীয়তা এত বেশি যে, রক্ত ছাড়া কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে প্রায়ই জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হয়। যেমন-অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে, রক্তবমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে, দুর্ঘটনায় আহত রোগী, অস্ত্রোপচারের রোগী, সন্তান প্রসবকালে, ক্যান্সার বা অন্যান্য জটিল রোগে, এনিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার ইত্যাদি রোগের কারণে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মাত্র ৩১ ভাগ পাওয়া যায় স্বেচ্ছায় রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি রক্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদার রক্তদাতা এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। ১৮ থেকে ৬৫ বছরের যে কোনো সুস্থ ব্যক্তি, যার শরীরের ওজন ৪৫ কেজির ওপরে, তারা ৪ মাস পর পর নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন।

তবে রক্ত দিতে হলে কিছু রোগ হতে মুক্ত থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তদাতার শরীরে কমপক্ষে ৫টি রক্তবাহিত রোগের অনুপস্থিতি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া দরকার। এ রোগগুলো হলো-হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি বা এইডসের ভাইরাস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস।

এসব রোগের স্ক্রিনিং করার পরই সেই রক্ত রোগীর শরীরে প্রবেশের উপযুক্ত ঘোষণা করা যায়। অবশ্য একই সঙ্গে রোগীর রক্তের সঙ্গে রক্তদাতার রক্তের গ্রæপিং এবং ক্রসম্যাচিং করতে হয়। এছাড়া রক্তদাতা শারীরিকভাবে রক্তদানে উপযুক্ত কিনা তা জানার জন্য তার শরীরের ওজন, তাপমাত্রা, নাড়ির গতি, রক্তস্বল্পতা বা জন্ডিসের উপস্থিতি ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

আমাদের দেশে যায়, রক্তদানে অনেকেই ভয় পান। কেউ কেউ ভাবেন এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে, দুর্বল হয়ে পড়বেন বা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বেন। কেউ আবার মনে করেন এতে হৃৎপিন্ড দুর্বল হয়ে যাবে বা রক্তচাপ কমে যাবে, এমনকি কার্যক্ষমতা কমে যাবার আশঙ্কা করেন। ফলে কিছু কুসংস্কার আর অজ্ঞতা অনেক সময় মানুষকে রক্তদানে নিরুৎসাহিত করে।

যে কোনো সুস্থ-সবল মানুষ রক্তদান করলে রক্তদাতার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। এমনিতেই আমাদের রক্তের লোহিত রক্ত কণিকাগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ৪ মাস পরপর নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং, এমনি এমনি নষ্ট করার চেয়ে তা স্বেচ্ছায় অন্যের জীবন বাঁচাতে দান করাই মহত্তে¡র বৈশিষ্ট্য। সামান্য পরিমাণ রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ।

নিয়মিত রক্তদান করা একটি ভালো অভ্যাস। রক্তদান করা কোনো কঠিন, দুঃসাহসিকবা বা অসম্ভব কাজ নয়, বরং রক্তদানের জন্য দরকার সুন্দর একটি মানবিক মন। রক্তদানে শরীরের তো কোনো ক্ষতি হয়ই না, বরং নিয়মিত রক্তদান করলে শরীরের বেশ উপকার হয়। যেমন: ১. রক্তদানে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে এবং রক্তের কোলেস্টরেলের মাত্রাও কমে যায়।

ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ইত্যাদি মারাত্মক রোগের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। হার্ট ভালো থাকে এবং রক্তদাতা সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকেন। ২. শরীরে রক্তকণিকা তৈরির কারখানা হলো অস্থিমজ্জা। নিয়মিত রক্তদান করলে অস্থিমজ্জা থেকে নতুন কণিকা তৈরির চাপ থাকে। ফলে অস্থিমজ্জা সক্রিয় থাকে। এতে যে কোনো দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে হঠাৎ রক্তক্ষরণ হলেও শরীর খুব সহজেই তা পূরণ করতে পারে।

৩. রক্তদানের সময় রক্তে নানা জীবাণুর উপস্থিতি আছে কিনা তার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ফলে রক্তদাতা জানতে পারেন তিনি কোনো সংক্রামক রোগে ভুগছেন কিনা।

৪. নিয়মিত রক্তদানের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। ৫. রক্ত দেয়ার সময় রক্তের গ্রুপিং এবং বিভিন্ন টেস্ট করা হয়। ফলে রক্তদাতা তার রক্তের গ্রুপ এবং শরীরে কোনো রোগব্যাধি আছে কিনা তা জানতে পারেন। ৬. সাধারণত যে সংস্থার কাছে রক্ত দেয়া হয় তারা একটি ‘ডোনার কার্ড’ তৈরি করে দেয়। এই কার্ডের মাধ্যমে একবার রক্ত দিয়েই রক্তদাতা আজীবন নিজের প্রয়োজনে ওই সংস্থা থেকে রক্ত পেতে পারেন।

৭. রক্তদান একটি মহৎ কাজ, যা রক্তদাতাকে মানুষ হিসেবে মহৎ ও মানবিক করে তোলে। রক্তদাতার সবচেয়ে বড় পাওনা অসহায় বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচানো। ৮. রক্তদান ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুণ্যের বা সওয়াবের কাজ। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো অবশ্যই মহৎ কাজ।

৯. মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই রক্তদাতা অনাবিল আনন্দ অনুভব করেন এবং সামাজিকভাবেও বিশেষ মর্যাদা পান। গ্রহীতা এবং তার পরিবার রক্তদাতার কাছে চিরদিন ঋণী থাকেন তার জীবন বাঁচানোর জন্য। দাতার জন্য এটা যে কি আনন্দের তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। মানুষ হিসেবে রক্তদান আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এটা সম্পূর্ণ মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক কার্যক্রম।

রক্তদান সামাজিক প্রীতিবন্ধন মজবুত করে, সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করে, এমনকি মানুষে মানুষে সম্প্রীতি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার রক্তই একই রকম- লাল রঙের। এর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তাই রক্তদান ঘুচিয়ে দেয় সাদা-কালোর পার্থক্য, ঘুচিয়ে দেয় ধর্মীয় ব্যবধান। রক্তদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষদের মনে যে উপসর্গটি কাজ করে সেটি হল ‘ভয়’।

যে দেশের মানুষ ১৯৫২,৬৯ এবং ৭১ এ রক্ত ঝরিয়েছে সে দেশের মানুষের কাছে ‘সামান্য সুঁইয়ের’ অযৌক্তিক ভয় কোনভাবেই কাম্য নয়। রক্তদান এক মহৎ মানবিক কাজ। রক্তদানে আমাদের ভয়কে জয় করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে মানবতার টানে স্বেচ্ছায় রক্তদানে?। সামিল হতে হবে ‘রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’ আন্দোলনে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।