manobkantha

‘পথ চলাতেই আনন্দ’

মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘পথ চলাতেই আনন্দ’। ১৪৩ পৃষ্ঠার বইটি পড়ে আবিষ্কার করলাম মামদুদুর রশীদ ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত হন। গ্রন্থের ভেতর বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের অসংখ্য গ্রন্থের উল্লেখ আছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবিতা কিংবা উপন্যাসের অংশ বিশেষের উদ্ধৃতি আছে। এমনকি বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গও এসেছে নিজের অনুভ‚তি কিংবা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করার জন্য। লেখকের নানা অনুভূতির মালায় সজ্জিত হয়েছে গ্রন্থটির সূচি।

মোট ৫টি পর্বের পরিচয় এরকম- সর্বমোট ২০টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ মিলে ‘পথ চলাতেই আনন্দ’ গ্রন্থে মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ পাঠককে নিবিড় মমতায় আকড়ে ধরেছেন। লেখকের জীবনে ‘পথ’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কারণ তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে দীর্ঘ ও বন্ধুর সরণি। আমরা জানি মানুষ তার জীবদ্দশায় বিচিত্র পথে বিচরণ করে।

রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’র ‘পায়ে চলার পথ’ রচনার কথা মনে পড়ছে। সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘এই পথে কত মানুষ কেউবা আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, কেউবা সঙ্গ নিয়েছে, কাউকে বা দূর থেকে দেখা গেল; কারো বা ঘোমটা আছে, কারো বা নেই; কেউবা জল ভরতে চলেছে, কেউ, বা জল নিয়ে ফিরে এলো।

... একদিন এই পথকে মনে হয়েছিল আমারই পথ, একান্তই আমার; এখন দেখছি কেবল একটিবার মাত্র এই পথ দিয়ে চলবার হুকুম নিয়ে এসেছি, আর নয়।’ কেবল পায়ে চলার পথ নয় মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন পরিবারে পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তানের কাছে, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে, বন্ধুদের আস্তানায়। জীবনের অন্তবিহীন পথচলায় অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।

সেখানে পরিচয় ঘটেছে নতুন ভ‚গোলের বাসিন্দাদের সঙ্গে। মেঠোপথ কিংবা বনবীথির আঙিনায় অথবা উড়োজাহাজে লেখকের গতিময় জীবনের চমৎকার সব বর্ণনায় পূর্ণ রয়েছে গ্রন্থটি। রাজপথ আর অলিগলি ঘুরে নিজেকে খুঁজে ফেরা আর মানুষ, দেশ ও সমাজ সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করার প্রয়াসে কখনো বাস্তবতা প্রাধান্য পেয়েছে আবার কখনো বা তিনি কল্পনার ডানায় ভর দিয়ে উড়াল দিয়েছেন।

বলাবাহুল্য, লেখকের জীবনের অভিজ্ঞতা বিপুল। এই অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে তার দেখার দৃষ্টি প্রসারিত বলেই। তিনি ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের ২৩টি দেশ। তার কর্মজীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াতে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যাংক এন.সি.সি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

‘পথ চলাতেই আনন্দ’ পাঠ করলে পাঠক দেখতে পাবেন, অফিসের কাজে অথবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন কেনিয়ার মাসাই মারার বুনো প্রান্তরে, কখনো জার্মানিতে অবস্থানের সময় পরিপাটি জাদুঘরে ঘুরেছেন, কখনো বা ছাত্রজীবনে ভারত ভ‚খণ্ডের অলিতে গলিতে ঘোরার স্মৃতি রোমন্থন করেছেন ‘অপূর্ব এক ভ্রমণের সুখস্মৃতি’তে।

আবার সিডনির হোটেলে কোয়ারেন্টিনে বসে তিনি ছুটে চলেছেন ‘মানসভ্রমণে’। ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস মহামারী শুরু হলে লেখককে নভেম্বর মাসে কার্যব্যাপদেশে যেতে হয়েছে সিডনিতে। সেখানে ১৪ দিন হোটেলে একাকী অবস্থানের বিবরণ আছে ‘কোয়ারেন্টিনের প্রহরগুলো’ রচনায়।

এই প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের অনন্য সংযোজন। কারণ কোভিড-১৯ এর অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের মধ্যে নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। এক একটি দিন-রাতের বর্ণনায় ‘নিউ-নরমাল’ জীবনের আস্বাদ পাবেন পাঠক।

ব্যক্তিগত কথামালায় মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন কাব্যিক ভাষায়। সেখানে বৃষ্টি-বর্ষা আর অলস বিকেলের রোদ লেগে আছে। তবে জীবনের সঙ্গে প্রকৃতি, জীবনের সঙ্গে স্বাস্থ্য এবং একান্ত সময়ের ভেতর নিজেকে খুঁজে ফেরা বাস্তবতা বিচ্যুত নয়। সেখানে বর্ষার বর্ণনা শেষে বন্যার কথা এসেছে।

মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে চিন্তিত লেখকের বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে। তবে সমাজ ও দেশ নিয়ে তার ভাবনা এবং দায়িত্ববোধের কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন গ্রন্থের পঞ্চম পর্বে। তিনি অত্যন্ত সহজভাবে কিন্তু নাটকীয়ভঙ্গিতে নিজের ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। প্রতিবন্ধী জীবন ও তাদের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সমাজের ব্যাধি হিসেবে ধর্ষণের কথা লিখেছেন দরদ দিয়ে।

তার মতে, সমাজকে প্রতিবন্ধীবান্ধব হতে হবে তেমনি অন্যায়, অনৈতিক কাজে লিপ্ত মানুষকে প্রতিহত করতে হবে পশুর সঙ্গে তুলনা করে নয় বরং তারা যে পশুর চেয়েও অধম সেই পরিচয়ে চিহ্নিত করতে হবে। মূলত গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধগুলোতে লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অসাধারণ।

এছাড়া লেখক যেসব বিষয় এ গ্রন্থে একটির পর একটি প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেন তা হয়ে উঠেছে সামষ্টিক জীবনের কথা। পাঠক তার নিজের জীবনকে সেখানে খুঁজে পাবেন। আর যে সমস্যাগুলো সম্পর্কে লেখকের নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে তাকে মনে হবে যথার্থ। জীবনের ভিন্ন ভিন্ন চিত্রের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আবেদন শাশ্বত। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।

(পথ চলাতেই আনন্দ- মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ, রুটস, ঢাকা, ২০২১, প্রচ্ছদ : মাকসুদুর রহমান, মূল্য: ৪৫০ টাকা।)