manobkantha

মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের উৎস হয়ে ওঠে একুশে

পূর্ববঙ্গের সব রাস্তা তখন ঢাকায় এসে এক বিন্দুতে মিশেছে। ঠিক তখন জেলা শহর, মহকুমা শহর থেকে বিস্তারিত খবর জানতে লোক আসছে, লোক যাচ্ছে। এক কথায় প্রদেশজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চলছে। শীতের আমেজ কেটে যাচ্ছে রাজনৈতিক আবহাওয়ার উত্তাপে। পতাকা দিবস যত না, অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্য তার চেয়েও বেশি গণসংযোগের প্রয়োজনে।

পতাকা দিবস সফল করে তুলতে যুবলীগ এবং ছাত্রাবাসের তরুণ কর্মীরা বিশেষ ভ‚মিকা গ্রহণ করেছিলেন। শহর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এ কাজের মধ্যমণি। নারায়ণগঞ্জ একুশে নিয়ে তখনো এক পা এগিয়ে। শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন, মমতাজ বেগম ও অনুরূপ কয়েকজনের নেতৃত্বে উত্তাল। ঢাকার মতোই স্কুলের কম বয়সী ছাত্রছাত্রীরাও পিছিয়ে নেই। তারা স্কুল ছেড়ে পথে, মাঠে-ময়দানের জনসভায় হাজির। ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক যোগাযোগ বরাবরই গভীর। সেখানেও পোস্টার দেয়াললিপি একুশের জন্য ডাক পাঠাচ্ছে ছাত্রছাত্রী, তরুণ ও সর্বজনতার দিকে। শ্রমিক অঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রত্যাশা শ্রমজীবী মানুষও এ আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দেবেন, ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। বাংলাভাষার প্রশ্নটা তাদের জন্যও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ গোটা বাঙালি জাতির জন্য।

পতাকা দিবসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকায় পোস্টার লেখারও ধুম পড়ে গিয়েছিল। শুধু চারুকলার ছাত্ররাই নয়, ইমদাদ বা আমিনুলই নয়, তাদের বেশ কজন এ কাজে যেমন ব্যস্ততা দেখিয়েছেন তেমনি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বদরুল, জিয়া হাসান, নুরুল ইসলামসহ কারো কারো আঙুলে চেপে বসে রয়েছে লালকালির ছোপ, লাল বর্ণমালার বিজয় নিশ্চিত করতে। এ কাজে তৎপর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও।

ঢাকার সিদ্ধান্ত, বেলতলার আহ্বান আর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সমর্থনে প্রদেশজুড়ে একুশের প্রস্তুতি যতদিন যাচ্ছে ততই চলছে জোর কদমে। সুদূর উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, ডোমার, রাজশাহী, দিনাজপুর থেকে সর্বদক্ষিণে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, ফরিদপুর আর উত্তর-পূর্বে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং মধ্যখানে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আন্দোলিত এক বিশাল ক্যানভাস। বাদ যায়নি উত্তপ্ত পাবনা, বগুড়া, যশোর বা খুলনা। এ ছাড়াও মহকুমা শহর থেকে থানা-সব শিক্ষায়তনে এ আহ্বানে সাড়া পড়েছে।

দেশের সব কয়টা সাপ্তাহিক তাদের প্রতিবেদনে দেশব্যাপী বিক্ষোভ চেতনার চিত্র তুলে ধরে। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) আবেগ ঝরানো ভাষায় লেখে ছাত্রদের ডাকা হরতাল উপলক্ষে: ‘ছাত্র হরতাল মহড়াই প্রদেশের সর্বত্র শোভাযাত্রা ও সংগঠনে রূপান্তরিত হইয়াছে। ইহাতে স্পষ্ট উপলব্ধি জাগে-বাংলাভাষা ও বর্ণের অধিকার আজ এই প্রদেশবাসীর হৃদয়ে কতখানি অধিকার করিয়া আছে। এই সুপ্ত আবেগের মহড়ার স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তিই ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ইঙ্গিত জানায়-২১ ফেব্রুয়ারি আগমনী ঘোষণা করে। প্রদেশের সর্বত্রই এই চেতনার নবজাগরণ দেখা দিয়াছে। এভাবে একুশের আগেই একুশের চেতনার আত্মপ্রকাশ হয় পূর্ববাংলাবাসীদের হৃদয়ের উপলব্ধি থেকে। এই উপলব্ধি যেমন মাতৃভাষা নিয়ে মমতার তেমনি মাতৃভূমিকে ঘিরে ভালোবাসার। কোথায় পাহাড়ি সাতকানিয়া আর কোথায় মাদারীপুর বা মেঘনা পাড়ের চাঁদপুর-সর্বত্র অস্থিরতা। এর মধ্যে দিনাজপুরে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ভাষার দাবির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগান তুলে আন্তর্জাতিক চেতনারও প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানেও ভাষা চেতনার লাল ছায়া দুলছে। পদ্মা-মেঘনার সঙ্গমস্থলের শহর চাঁদপুরে স্কুল-কলেজের ছাত্র, মজদুর ও জনসাধারণ রাষ্ট্রভাষা দিবস (সাপ্তাহিক ইত্তেফাক) নিয়ে উত্তাল।

পত্রিকার প্রতিবেদন মতে, যুবলীগের ভ‚মিকা হয়ে ওঠে বিশেষ। এবং তা বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলে। এ সময়ের দুটি ঘটনা একুশের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রথমত, মওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক সফর এবং তা জেলা থেকে মহকুমায়, এমনকি তার রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে থানা বা দূর প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সরকারবিরোধী এ প্রচার জনমানসে প্রভাব ফেলেছে। স্বভাবতই একুশের আহ্বানে মানুষের পক্ষে সাড়া দেয়া সহজ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, বন্দিমুক্তি নিয়ে, সরকারি অন্যায় ও জুলুম নিয়ে প্রতিবাদও জনচিত্তে দাগ কাটে। মুসলিম লীগের দুঃশাসন সম্বন্ধে মানুষ ক্রমশ সচেতন হতে থাকে।
ভাসানীর ওই সাংগঠনিক সফর পুরো একুশের কর্মসূচি পালনের ভিত তৈরি করে। ছাত্রদের ভাষা বিষয়ক আন্দোলনের দিকে জনসাধারণেরও নজর পড়ে। ছাত্র-যুব নেতাদের সাংগঠনিক ঘাটতি এভাবে পূরণ হতে থাকে। মুসলিম লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের উৎস হয়ে ওঠে একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি। একটি পরিপূর্ণ প্রতিবাদী দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারির ফুটে ওঠার সম্ভাবনা এভাবে নানা সূত্রে তৈরি হতে থাকে।