manobkantha

পদ্মা সেতু : এখন আর স্বপ্ন নয়

পদ্মা সেতু নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ছিল অন্তহীন। স্বপ্নের মতো ছিল পদ্মা সেতু। খরস্রোতা পদ্মা এপার-ওপার ধু ধু করে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ এর মাঝেও স্বপ্ন দেখত কোনোদিন হয়তো এপার-ওপার এক হবে। পারাপারের সময় কমে গেলে বাড়ি যাওয়ার সময় কমবে। এ স্বপ্ন কত পুরনো তা বলা না গেলেও অনুভব করা যায়। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।

দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্যাহত মানুষ এবারে হয়তো ঢাকায় না এসেও পারবে। বিশেষত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট হয়তো শুরু হয়ে যাবে। কত ধরনের বাধা পেরিয়ে এ অসাধ্য সাধনের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের দক্ষিণবঙ্গের মানুষ আর তাকে কোনোদিন ভুলবে না। এই অসাধ্য সাধনের জন্য তিনি নমস্য হয়ে থাকবেন যুগ যুগ কাল মহাকালব্যাপী। মুজিববর্ষে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই বাস্তবায়নের মুখ দেখতে যাচ্ছে স্বপ্নের সেতু, পদ্মা সেতু! আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে জাতির জন্য এর থেকে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বহু চড়াই উতরাই পার হয়ে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর পদ্মায় অনেক পানি গড়ালেও শুরু করা যায়নি পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবারও সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই নিয়োগ করা হয় পদ্মা সেতুর ডিজাইন কনসালট্যান্ট। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহ্বান করা হয়।

এরপর ঘটনাবহুল সময় পেরিয়ে যায়। পদ্মা সেতুর মূল দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক নানা টালবাহানার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করে। একই পথ অনুসরণ করে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও। এরপর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। যে সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আছে, সেটা তিনি প্রমাণ করেছেন।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭। আজ থেকে তিন বছর দুই মাস আট দিন আগের এই তারিখ কেউ কেউ হয়তো সারা জীবন মনে রাখবে। কারণ পদ্মা সেতু। সেদিনই পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বা ইস্পাতের কাঠামোটি বসানো হয়। একে একে ৪০টি স্প্যান বসে গেছে। আর বাকি আছে একটি।

দ্বিতলবিশিষ্ট পদ্মা সেতুতে এসব স্প্যান বসছে ৪২টি পিয়ার বা খুঁটির ওপর। স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন আর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত আর শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের মিলনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১ জেলা ঢাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের আওতায় চলে আসবে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ এই সেতু ঘিরে উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখে আসছিল, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর অবদানে উজ্জীবিত হয় মানুষ। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের নানা উদ্যোগ চলছে। সেতু এলাকা ও আশপাশে এরই মধ্যে কলকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ চোখে পড়ছে। দেশের অর্থনীতিতেও এই সেতুর প্রভাব হবে উল্লেখযোগ্য।

শীতের সকালে দূর থেকে পদ্মা সেতুর কাঠামো এখন নজরে আসে। উদ্বেলিত হয় মানুষ। কিশোর বৃদ্ধ যুবা সবাই দেখতে আসে এ নজিরবিহীন কর্মকে। সকালে মাওয়া গেলেই কুয়াশা ভেদ করে চলে গেছে একটি সরু রেখা। কাছাকাছি হতেই চোখের সামনে ফুটে উঠবে ইস্পাতের কাঠামোটি। মাঝখানে শুধু একটুখানি জায়গা ফাঁকা। এই ফাঁকা জায়গায় বসবে সেতুর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যানটি। এরই মধ্যে স্প্যানটি ভাসমান ক্রেনে করে মাওয়ার কুমারভোগ এলাকার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। যেকোনো দিন সেটি বসানো হবে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর।

তাহলেই জুড়ে যাবে বিশাল পদ্মার দুই পার। স্বপ্নের এই সেতু পুরো দেশে উন্নয়নের ছাপ ফেলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশেষত দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে আসবে বিশাল বদল। সেই সুদিনের অপেক্ষায় সবাই।