manobkantha

হাতি শিকারিদের রাশ টেনে ধরুন

দেশে অবাধে পশু হত্যা চলছে। মানুষ অবাধে পশু শিকার করে লাভবান হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশের মানুষের জীবজগতের প্রতি মমত্ববোধ ছিল। তারা কুকুর বিড়াল পুষত, অন্য বাড়ির কুকুর বিড়ালকেও খেতে দিত। পাখির জন্য বরাদ্দ থাকত খাবার। নবান্নের দিনে অনেক এলাকায় নিয়ম ছিল কাককে নবান্ন খাইয়ে তারপরে সবাই খেত। জীব জগতের সঙ্গে এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের মমত্ববোধই শুধু প্রকাশ পেত না।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জীব জগতের যে মায়া সেটা লক্ষণীয় ছিল। কিন্তু মানুষ এখন স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনার অনেক ঊর্ধ্বে চলে যেতে মরিয়া। আধুনিক জীবনযাপনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ ব্যবহার করে সে জীব জগতের সর্বনাশ সাধনে পিছু হটছে না। তারা বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি মারা, লোকচক্ষুর অন্তরালে বানর, হনুমান, বেজি, গুইসাপ মেরে শেষ করে দিয়েছে। অজস্র প্রাণীকে তারা নিশ্চিহ্ন করেছে। এবারে টার্গেট হাতি। বনাঞ্চল দিয়ে বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ ব্যবহার করে বা গুলি করে হাতি হত্যা করছে। প্রশ্ন হলো- এসব তারা ব্যবহার করে আর স্থানীয় প্রশাসন জানে না এটা অবিশ্বাস্য।

বনে মানুষের বসতি বাড়াতে গিয়ে হাতি হত্যা করা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ না করলে দেশ হাতিশূন্য হবে অচিরেই। হাতি হত্যার পরিসংখ্যান শুনলে চক্ষু চড়ক গাছ হবে যে কারো। গত ১৬ বছরে মানুষের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে ১১২টি হাতি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে হত্যা করা হয়েছে ১৩টিকে; যেখানে আটটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও পাঁচটিকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আর চলতি মাসের ৬ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত ১৭ দিনে চারটি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনে এই হাতি হত্যাযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। হাতি যেসব এলাকায় অবাধে বিচরণ করত, সেসব ক্ষেত্র দ্রæত কমে আসছে।

বনে মানুষের বসতি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে হাতি চলাচলের অনেক করিডর এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য নিয়মিত চলাচলের পথ ব্যবহার করতে পারছে না হাতি। অনেকটা বাধ্য হয়েই মানুষের বসতি এলাকা দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছে প্রাণীটি। এতে মানুষও আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর রক্ষা বা জমির ফসল রক্ষার উদ্দেশ্যে হাতির ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করছে। কখনো গহিন অরণ্যে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে, কখনো বা গুলি করে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। হাতির হাড় ও হাতির দাঁত কিনে নেয় এমন আন্তর্জাতিক চক্র রয়েছে। এমন একটি অসাধু চক্রও হাতির দাঁতের লোভে প্রাণীটিকে হত্যা করছে, বিষয়টি আমলে আনা জরুরি।

দেশে হাতির স্থায়ী আবাসস্থল বলা হয় পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার জেলার ফাঁসিয়াখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ বনকে। এখন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বনে চলছে হাতি হত্যাযজ্ঞ। এ যেন নিজ রাজ্যেই পরবাসী হাতির দল। অনেক এলাকায় সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলায় হাতির চলাচলের পথ কমে গেছে। খাদ্য সংকটে হাতির দল লোকালয়ে চলে এলে তাদের বনে ফিরিয়ে নিতে একদল গ্রামবাসীকে প্রশিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। এই গ্রæপটি বলা হচ্ছে এলিফ্যান্ট রেন্সপন্স টিম (ইআরটি)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির সুরক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দরকার। তাদের বসতি ও বিচরণ এলাকা রক্ষা করতে হবে; যাতে হাতি নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি প্রাণী রক্ষায় সচেতন করতে হবে। হাতি হত্যায় দায়ীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং বন বিভাগের কর্মীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে