manobkantha

শিশু-কিশোরদের জীবন গঠনে সহায়ক হোন

আইন, নীতিবাক্য, শাস্তি দিয়ে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে কিশোর-তরুণ ছেলেদের বাগে রাখতে চায় সমাজ। এতে কিশোরদের বিপথগামিতা কমে না বরং বাড়ে। সম্প্রতি দেশজুড়ে উদ্বেগজনকহারে বেড়েই চলছে কিশোর গ্যাং কালচার। রাস্তাঘাট, পাড়া, মহল্লা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং নামে উঠতি বয়সী তরুণরা। দাপটের সঙ্গে চাঁদাবাজি, ভ‚মি দখলদারিত্ব, হুমকি, মারামারি, অপহরণ, ধর্ষণ, ভাড়াটিয়া খুনি ও পথেঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্তসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড করে চলেছে তারা। কিশোর গ্যাং এখন রীতিমতো ভয়ংকর আতংকে পরিণত হয়েছে। পকেটে নগদ টাকা, হাতে অস্ত্র ও মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে বুনো উল্লাসের সঙ্গে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাতেও কণ্ঠাবোধ করছে না এরা।

এদের ভয়াবহতা কতটা তা দেখা যায় বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। যেসব কিশোর গ্যাংস্টার হওয়ার রোমাঞ্চে মেতে সিনেমার খলনায়কের মতো বাহাদুরি দেখাতে যায়, তারা ক্রমেই অপরাধের মারাত্মক সব পর্যায়ে জড়িয়ে যেতে থাকে। এরাই প্রতিশোধ, জিঘাংসায় লিপ্ত হয়, খুনকে অপরাধের চেয়ে বাহাদুরি হিসেবে গণ্য করতে শেখে। এই শেখা তার একদিনের প্রচেষ্টা নয়। আইন, নিয়ম, বিধান ভাঙার মধ্যেও হিরোইজমের তৃপ্তি খোঁজে। বিপথগামীদের এই দল উত্তেজনার খোরাক বা বিধি ভাঙার রসদ হিসেবে নেশায় মাতে, দল বেঁধে অপরাধ করে, এক অপরাধের সূত্র ধরে অপরাধের চক্র তৈরি হয়, অপরাধের সূত্রেই তারা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়, আবার কখনো স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়ায়, তাতে মারামারি-খুনোখুনি হতেই থাকে। আরেক দলের ঝুঁকি নেয়ার দুঃসাহস থাকে না, কিন্তু অপরাধপ্রবণতার জ্বালা তাদের ভোগায় এবং অনেকেই ডুবে যায় হতাশায়, তারা মাদকে আকৃষ্ট হতে পারে। তাদের ফেরাতে যেসব শিশু সংশোধন কারাগার আছে সেখানে কতটুকু সংশোধন করতে পারে তা নিয়ে কথা আছে। তবে মাগুরা ও সুনামগঞ্জের আদালত যে ব্যতিক্রমী রায় দিয়েছেন তাতে শিশুদের সংশোধন অনেক সহজ।

দেশে দিনকয়েক আগেই নির্যাতনের শিকার এক নারীর প্রতীকী নাম ‘কল্প’ দিয়ে একটি ধর্ষণ মামলার রায় দিয়েছিলেন মাগুরা আদালত। এমনই আরেকটি ব্যতিক্রমী রায় ঘোষণা করা হয়েছে সুনামগঞ্জ আদালতে। শিশু অপরাধের ১০টি মামলায় রায়ে ১৪ শিশুকে সংশোধনের শর্তে তাদের অভিভাবকের জিম্মায় দিয়েছেন আদালত। সুনামগঞ্জে ১০ মামলায় ওই ১৪ শিশু অভিযুক্তকে এক বছরের জন্য ৮ শর্তে এই প্রবেশনে দেন আদালত। গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় সুনামগঞ্জ শিশু আদালত ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচার মো. জাকির হোসেন নিজ খাসকামরায় এ আদেশ দেন। আদালত সূত্র জানায়, শিশু অপরাধের একসঙ্গে ১০ মামলার আদেশ প্রদান দেশে এই প্রথম।
যে আটটি শর্ত দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে-বাবা ও মায়ের আদেশ মেনে চলা। বাবা-মায়ের সেবা যত্ন করা। ধর্মীয় অনুশাসন মানা। নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা। প্রত্যেকে কমপক্ষে ২০টি করে গাছ লাগানো এবং গাছের পরিচর্যা করা। অসত সঙ্গ ত্যাগ করা। মাদক থেকে দূরে থাকা ও ভবিষ্যতে কোনো অপরাধে না জড়ানো। শিশু অভিযুক্তদের নিজ বাড়িতে অভিভাবকের জিম্মায় থেকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি পুলিশ বা বিচারক, বিধান বা উপদেশ, আইন বা ধমক, জেল বা বেতের বাড়ি বর্তমান সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। বরং এসব পদ্ধতি শিশুদের বখে যাওয়ার পথের প্রধান কারণ। একই সঙ্গে

সন্তানকে সময় ও সঙ্গ দিতে হবে, বয়ঃসন্ধিকালে তাদের চলাফেরা, সঙ্গী দল, আচরণ, কথাবার্তার দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে। অভিভাবককে অভিভাবকত্বের যথার্থ সমসাময়িক পাঠ নিতে হবে। এ ধরনের যুগান্তকারী রায়গুলোর দিকে দেশের সব আদালত দৃষ্টি দিলে সেটা কিশোরদের জীবন গঠনে সহায়ক হবে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে