manobkantha

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার হোক

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার হোক

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন ও নির্যাতনের ঘটনাকে মিয়ানমার সরকার যতরকমের চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে তা অবর্ণনীয়। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বিগত তিন দশক ধরে সব মিলিয়ে অন্তত ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন নিরুপায় হয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসছিল তখনো মিয়ানমার সরকার গণহত্যার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিল। এজন্য তারা গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী থেকে আন্তর্জাতিক সব সংগঠনের লোকজনকে প্রবেশে বাধা দেয়। তারা দুজন সাংবাদিককেও তখন আটক করে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আদালত মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করছে। তারা এমন একটি দেশে এই শুনানির অনুরোধ জানিয়েছে, যেটি নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের কাছাকাছি কোনো দেশে হবে। আবেদনে দেশের কথা উল্লেখ না থাকলেও, আইসিসি এই আবেদনের অগ্রগতির যে বিবরণী প্রকাশ করে তাতে এই দেশটি ‘সম্ভবত বাংলাদেশ’ বলে উল্লেখ করা হয়। গতকাল দৈনিক মানবকণ্ঠে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির সব কার্যক্রম সাধারণত চলে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে। কিন্তু এই প্রথম এ রকম কোনো উদ্যোগ নেয়া হলো, যেখানে ভিক্টিম বা নির্যাতিতদের শুনানির জন্য আদালতকেই অন্য কোনো দেশে বসানোর আবেদন জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটস গত ৮ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মিয়ানমারের দুই সৈনিক ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের সময়ে নারী, শিশুসহ নিরীহ মানুষদের হত্যা, গণকবরে মাটি চাপা দেয়া, ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের কথা স্বীকার করেন।

তারা ১৯ জনের নাম উল্লেখ করেছেন যারা সরাসরি এ ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে। এছাড়া ৬ জন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এসবের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তারা। স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শুধুমাত্র এই দুজন কমপক্ষে ১৮০ জন রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মিও উইন তুন তার স্বীকারোক্তিতে বলেন, ‘কর্নেল থান থাকি রোহিঙ্গাদের সমূলে হত্যার নির্দেশ দেন। এরপর সৈনিকরা মুসলিমদের কপালে গুলি করে এবং লাথি মেরে কবরে ফেলে দেয়।’ বুথিডং অঞ্চলে কয়েকটি গ্রাম ধ্বংস করা, ৩০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা, এছাড়া আরও ৬০ থেকে ৭০ জন রোহিঙ্গা হত্যার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার বিষয়েও মিও স্বীকারোক্তি দেন। জ নায়েং তুন বলেন, ‘মংদু টাউনশিপে ২০টি গ্রাম ধ্বংস এবং অন্তত ৮০ জনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এছাড়া, সার্জেন্ট পায়ে ফোয়ে অং এবং কিয়েত ইয়ু পিন তিনজন রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণ করেছেন, যার সাক্ষী আমি।’

রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার বিচার করতে ঐতিহাসকি ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল চালু করা হয়েছিল। এরপরে বিভিন্ন দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে বিচার কার্য সংঘটিত হয়েছে। সেই ধারায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যার বিচার হতে যাচ্ছে। এটার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হচ্ছে একটা জনগোষ্ঠী যতই দুর্বল হোক ইচ্ছে করলেই তাদের হত্যা নির্যাতন করে চাপা দেয়া যায় না। রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষর রয়েছে বাংলাদেশে। সেদিক থেকে বাংলাদেশকে নির্বাচন খুবই যুক্তিযুক্ত। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

মানবকণ্ঠ/এইচকে