মসজিদ, ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ইবাদত-বন্দেগির স্থান। তাই মসজিদকে বলা হয় ‘বায়তুল্লাহ’ বা আল্লাহতায়ালার ঘর। পৃথিবীতে মসজিদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেক পুরনো।
পৃথিবীর প্রথম মসজিদ কাবা শরিফ। আল্লাহপাকের নির্দেশে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন প্রথম মানব হজরত আদম আলাইহিস সালাম। এর অন্য নাম মসজিদুল হারাম। মসজিদে হারাম ৮৮.২ একর জমির উপরে নির্মিত। নয় লক্ষ মুসল্লি একসাথে নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদে হারামের আয়তন তিন লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার আটশত বর্গমিটার।
শেষ নবীর জন্মের আগে প্রতিষ্ঠিত আরেকটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ বায়তুল মোকাদ্দাস।
মেরাজে যাওয়ার পথে এ মসজিদে নবী-রাসুলদের সঙ্গে নিয়ে নামাজ আদায় করেন নবী কারিম (সা.)। মদিনায় নবীর প্রতিষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ হচ্ছে মসজিদে নববি। এ মসজিদ থেকে ধর্ম প্রচারসহ শাসনকাজ পরিচালনা করতেন তিনি।
নবী কারিম (সা.)-এর নির্দেশে তার জীবদ্দশায় ও পরবর্তী সময়কালে ইসলামের বাণী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেন সাহাবারা। আরও পরে তাদের নির্দেশ পালন করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন অলি-আউলিয়ারা। যেখানে তারা ধর্ম প্রচারে গেছেন, সেখানেই স্থাপন করেছেন মসজিদ। সে সময় ইবাদতের পাশাপাশি শাসনকাজের মূলকেন্দ্রও ছিল এসব মসজিদ। বিশেষত এসব মসজিদ যে স্থাপত্য শিল্পের অনুপম নিদর্শন সেটা দ্ব্যর্থহীন ভাসায় বলা যায়।
বিশেষত, সুলতানী আমল, মোগল আমলের মসজিদ দেশের অনন্য স্থাপত্য শিল্পের দাবিদার। আজকের সময়েও সেইসব মসজিদের স্থাপত্য শিল্প মানুষকে বিস্মিত করে। সেই সময়কালকে সুলতান নসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন।
খানজাহান বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ হয় এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট। মধ্যযুগীয় ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্য ছিল মোগল সাম্রাজ্য। ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সাল ৩৩১ বছর সময়কাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল এই সাম্রাজ্য। সমৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে আজকের আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ছিল এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
মোগল শাসকরা শুধু রাজনৈতিকভাবেই শক্তিশালী ছিলেন না, সাম্রাজ্যের পরিবর্তন, সংস্কৃতি, সামাজিক জীবন ও স্থাপত্যের উন্নয়নে তাদের রয়েছে অসাধারণ স্বাক্ষর। মোগল আমলে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে মসজিদগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সুলতানী আমালেও প্রচুর মসজিদ নির্মাণ হয়েছে। শিল্প সৌকর্যের দিক থেকে সেগুলো অনন্য বাংলায় আফগানদের শাসন আমলে শূর বংশের শেষদিকের শাসক গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহর রাজত্বকালে জনৈক সুলাইমান মসজিদটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদের নির্মাণকাল ৯৬৬ হিজরি (১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দ)।
ইতিহাসবিদদের মতে, কুসুম্বা মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন, রাজশাহীতে। সবর খান বা সোলায়মান নামে ধর্মান্তরিত এক মুসলিম এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মূল প্রবেশপথে শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় এ মসজিদটি ৯৬৬ হিজরি বা ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ’র বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দিন বাহাদুরের শাসনামলে (১৫৫৪-১৫৬০) নির্মিত। সে হিসাবে মসজিদটির বর্তমান বয়স ৪৭৪ বছর। কেন্দ্রীয় মেহরাবের ওপরাংশ শেরশাহের শাসনামলে নির্মিত। সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’ সোনামসজিদ। এটি বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর কোয়াটার্স এর তাহখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কোতোয়ালি দরওয়াজা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
প্রধান প্রবেশ পথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপিতে নির্মাণের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলো মুছে গেছে। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর নামের উল্লেখ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মসজিদটি তার রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোন এক সময় নির্মিত।
ব্রিটিশদের শাসনামলে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট মসজিদ বা আল্লাহর ঘর। যে ঘরগুলোতে দুই থেকে পাঁচজন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। সভ্যতা বহুদূর এগিয়েছে। হয়েছে যুগের পরিবর্তন। বর্তমানে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাস করছি। কিন্তু কিছু এখনও কিছু জেলায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেইসব ছোট ছোট মসজিদ। এধরনের ছোট মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে বগুড়ার সান্তাহার উপজেলার তারাপুর গ্রামে ও বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের চরহোগলা গ্রামে। বগুড়ার এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির উচ্চতা ১৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৮ ফুট। এর দরজা ৪ ফুট উঁচু আর দেড় ফুট চওড়া। মাত্র তিনজন নামাজ পড়তে পারেন।
অপরদিকে বরিশালের মসজিদটির উচ্চতা সাড়ে ১২ ফুট, দৈর্ঘ্য ৬ ফুট এবং প্রস্থ ৫ ফুট। প্রবেশ দরজার উচ্চতা মাত্র সাড়ে ৩ ফুট। ভেতরে তিনজনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের মিম্বর না থাকলেও দেয়াল কেটে আকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া সবচেয়ে ছোট প্রাচীন মসজিদ এটি। এলাকাবাসীর কাছে এ মসজিদেও পরিচিতি গাজী কালু দরগাবাড়ির পাঞ্জেগানা মসজিদ নামে। পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ অনুসারে পর্তুগিজ আমল থেকেই ওখানে মসজিদবাড়ি নামে রেকর্ড রয়েছে। তবে ঠিক কোন খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিল, তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি।
গাজী কালু দরগাবাড়ির পাঞ্জেগানা মসজিদ, গায়েবি মসজিদ ও কানা মসজিদ এই তিনটি নামে এলাকাবাসীর কাছে সমধিক পরিচিত। মসজিদটি একটি বৃহদাকার বটগাছের শিকর-বাকড়ে আবৃত। এর ভেতরে দেখা যায় এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণে পৃথক দুটি জানালা। মসজিদটি সম্পূর্ণ পোড়ামাটি আর চুন-সুড়কি দিয়ে নির্মাণ করা। মসজিদটিকে রক্ষাকারী বিরল প্রজাতির বটগাছটিও কিংবদন্তির অংশ হয়ে উঠেছে। যদিও আবৃত করে রাখা গাছটি পর্তুগিজ আমলের কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ভিত শক্তিশালী করে এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে ২০৪১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যার লক্ষ্য উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ।
পাশাপাশি একজন আদর্শ মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় চেতনা অব্যাহত রাখতে ইসলাম ধর্মের বিকাশে অব্যাহত ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। কওমি মাদ্রাসাগুলোর স্বীকৃতি, জাতীয় মসজিদ হিসেবে বায়তুল মোকাররমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, আধুনিক হজ ব্যবস্থাপনা, দেশ জুড়ে মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানায় সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তার সরকারের এমনই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলাম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে উন্নত মডেল মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মুসলিম শাসকের একসঙ্গে এতগুলো মসজিদ নির্মাণের ঘটনা নজিরবিহীন।
অত্যাধুনিক ইসলামি স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিক নকশা এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের চৗকস বাস্তবায়নে নির্মিত মসজিদগুলোর অবস্থান ভ‚মি থেকে খানিকটা উঁচুতে। ফলে দূর থেকেই এর সৌন্দর্য সবাইকে আকৃষ্ট করে। বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে এ মসজিদগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে সুদর্শন স্থাপনা। সমতলে ব্যস্ত শহরের বুকে, পাহাড়ঘেরা এলাকায় বা সাগর দ্বীপে একই নকশা মসজিদগুলো ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ করে যাচ্ছে এদের নির্মাণকলার সৌন্দর্য। ধর্ম প্রচারের শুরুতে মসজিদ থেকেই পৃথিবী শাসন করেছেন নবী কারিম (সা.) ও তার সাহাবিরা। ফলে মসজিদ শুধুই নামাজের জায়গা নয়। ইসলামে মসজিদের নির্মাণ এবং মসজিদ সংরক্ষণের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাই প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে বগুড়া ও বরিশালসহ সারা দেশে আরও যেসমস্ত প্রাচীন মসজিদ আছে সেগুলো খুঁজে বের করে সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনকে এগিয়ে আসা দরকার।
মানবকণ্ঠ/এআই




Comments