দিশেহারা যাত্রীদের দুর্ভোগ কাটেনি

বাড়তি ভাড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষ

তালিকা না থাকায় দেশজুড়ে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়


  • শাহীন করিম
  • ০৮ আগস্ট ২০২২, ১৫:৪৫

আকস্মিক রেকর্ড হারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসসহ গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাড়তি ভাড়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভাড়া পুনঃনির্ধারণের পরও সড়কে পর্যাপ্ত বাস না থাকায় শনিবারের মতো গতকাল রবিবারও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। বাসের ভাড়া সমন্বয় করার পর নতুন ভাড়ার তালিকা না হওয়ার সুযোগে বাসে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন বাসচালকরা। এ নিয়ে যাত্রী ও গণপরিবহন শ্রমিকের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়েছে অনেক জায়গায়। এর বাইরে সিএনজি, মোটরসাইকেল ভাড়াও নেয়া হচ্ছে ইচ্ছে মতো। এতে আয়ের সঙ্গে খরচের সমন্বয় করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীসহ শহর অঞ্চলে বাস করা স্বল্প আয়ের মানুষ। বাসের ভাড়া কমানোর দাবি করে তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের উত্তাপে তারা যেন দগ্ধ। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বাস ভাড়া বৃদ্ধি যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সরকার নির্ধারিত নতুন বাস ভাড়া পুনঃ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতিও।

অন্যদিকে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে প্রায় সব দূরপাল্লার রুটেও বেশি ভাড়া দিয়ে টিকিট কিনতে হচ্ছে যাত্রীদের। এখনও অনেক বাস কাউন্টারে দাম বৃদ্ধির তালিকা গতকাল পর্যন্ত টানানো হয়নি। যাত্রীদের অভিযোগ, ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বিভিন্ন গন্তব্যে বাসভাড়া ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেয়া হচ্ছে। বাস কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে বেশি টাকা আদায় করছে। কেউ যেন দেখার নেই। তবে বাস কাউন্টার থেকে বলা হয়, নতুন ভাড়ার তালিকা হাতে পেলে সে অনুযায়ী ভাড়া নেবে। যাত্রীরা বলছেন, একদিকে গাড়ী তুলনামূলক কম, অন্যদিকে ভাড়া বেশি। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ। অপরদিকে এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনের গাড়িতেও। এছাড়া লঞ্চের ভাড়া ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লঞ্চ মালিক সমিতি। আজ এ বিষয়ে সরকারি সিন্ধান্ত আসবে।

এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সমন্বয়ের পর ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ ভাড়া ঠিক করে প্রজ্ঞাপন গতকাল জারি করে বলা হয়েছে, নতুন ভাড়া গ্যাসচালিত মোটরযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। নতুন ভাড়ার তালিকা সব বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে অবশ্যই টাঙিয়ে রাখতে হবে। এতে আরও বলা হয়েছে, আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি সর্বোচ্চ ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সার জায়গায় ২ টাকা ২০ পয়সা হবে। অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার যাত্রী প্রতি ভাড়া ২ টাকা ১৫ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ০৫ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। আর, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে সর্বনি¤œ ভাড়া যথাক্রমে ১০ টাকা ও ৮ টাকা নির্ধারিত হলো।

এদিকে, গতকাল রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বাসের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যায়। ভাড়া বাড়ানোর পরও সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী যাত্রীরা। গণপরিবহনে বর্ধিত নতুন ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও বাসকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায়ের অভিযোগও করেছেন অনেক যাত্রী।

যে কারণে সড়কে গণপরিবহন কম: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মহানগরী ও দূরপাল্লার গণপরিবহণে নতুন ভাড়া কার্যকর হলেও রাজধানীর সড়কগুলোতে বাসের সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম। কৃত্রিম এই সংকটের পেছনে দুটি কারণ থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ানোর দাবি তোলেন সড়ক পরিবহন মালিকরা। এ নিয়ে সরবও হয় বাস মালিকদের সংগঠনগুলো। একইসঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিও সামনে আনেন শ্রমিক সংগঠনগুলো। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মহাসচিব ওসমান আলী বলেন, স্বাভাবিকভাবেই পরিবহনের ভাড়াবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহানগরী ও দূরপাল্লার পরিবহনে যত শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হবে, তত শতাংশ হারে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ছাড়া একজন শ্রমিক তার পরিবার চালাবেন কীভাবে?

যাত্রী কম মহাখালীতে, ভাড়া নেয়া হচ্ছে ইচ্ছেমতো: মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীদের কাছ থেকে নিজেদের ইচ্ছে মতো ভাড়া নেয় কাউন্টারগুলো। ভাড়া বাড়ানো খবরে কোনো কোনো রুটে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেয়া অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার শনিবার রাতে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া বাড়িয়েছে ২২ শতাংশ। মূলত এর পর থেকে ঢাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারে এ ‘নৈরাজ্য’ শুরু হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে বাস মালিকরা। ফলে কাউন্টারে এসে টিকিট কাটতে গিয়ে অনেকটা অপ্রস্তুত হতে হচ্ছে যাত্রীদের।

গতকাল দুপুরে মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বাস কাউন্টার ফাঁকা। মাঝে-মধ্যে যে দু-চারজন যাত্রী আসছেন, তারাও কাউন্টারে টিকিটের দাম শুনে গন্তব্যে যাবেন কি যাবেন না তা নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব পড়েছেন। কারণ বাস মালিকরা রুট অনুসারে নতুন করে সর্বনি¤œ ৬০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। তবে কোনো কাউন্টারে নতুন ভাড়ার কোনো তালিকা চোখে পড়েনি। 

মহাখালী থেকে বগুড়া হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী একতা পরিবহনের কাউন্টারে ৭০০ টাকার টিকিট বিক্রি হয় ৮৫০ টাকা। অর্থাৎ ১৫০ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। একই পরিবহনের মহাখালী থেকে রাজশাহী রুটের ভাড়া নিচ্ছে ৭২০ টাকা। যা আগে ছিল ৬০০ টাকা। অর্থাৎ ১০০ টাকা বেড়েছে। আর নাটোরের ৫০০ টাকার ভাড়া নিচ্ছে ৬০০ টাকা। বগুড়ার যাত্রী আহনাফ বলেন, সরকার যা বাড়িয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি নিচ্ছে বাস মালিকরা। আমাদের ফকির বানাচ্ছে। এটা মেনে নেয়ার মতো না। জামালপুরগামী যাত্রী মনোয়ার হোসেন বলেন, আগের তুলায় ভাড়া ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছে।

গাবতলী থেকে দূরপাল্লার বাসে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া: ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বিভিন্ন গন্তব্যে বাসভাড়া ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেয়া হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর গাবতলী আন্তজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে বাসভাড়া আদায়ের এ চিত্র দেখা যায়। যাত্রীদের অভিযোগ, দূরপাল্লার বাস কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে বেশি টাকা আদায় করছে। তবে বাস কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে, তারা এখনো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা হাতে পায়নি। তালিকা পেলে সে অনুযায়ী, ভাড়া নেবে।

গাবতলীতে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার থেকে জানানো হয়, ঢাকা থেকে আগে কুড়িগ্রামের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা। এখন ১ হাজার টাকা। রংপুরের ভাড়া ছিল ৭০০ টাকা। এখন ৮৫০ টাকা। নওগাঁর ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা। এখন ৭০০ টাকা। পঞ্চগড়ের ভাড়া ছিল ৯৫০ টাকা। এখন ১ হাজার ৪০ টাকা। ঠাকুরগাঁওয়ের ভাড়া ছিল ৯০০ টাকা। এখন ১ হাজার টাকা। খুলনার ভাড়া ছিল ৬৯০ টাকা। এখন ৮০০ টাকা। যশোরের ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা। এখন ৬৫০ টাকা। বরিশালের ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা। এখন ৭০০ টাকা। কুয়াকাটার ভাড়া ছিল ৮৫০ টাকা। এখন ৯২০ টাকা। ঝালকাঠির ভাড়া ছিল ৬৫০ টাকা। এখন ৭৫০ টাকা। হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার আবদুল্লাহ বলেন, সরকার নতুন বাসভাড়া ঘোষণা করার পর মালিকেরা এটা (ভাড়া) ঠিক করেছেন।

যাত্রী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, কোনো ধরনের গণশুনানি, পূর্বালোচনা ছাড়াই রাতারাতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এতে ক্ষুব্ধ মানুষ। তারা বলছেন, এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত, তার ওপর জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো মানে অসহায় মানুষের ওপর বিদ্যমান চাপে আরও ভারী করা।  ক্ষুদ্ধ মানুষ বলছেন, আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাবে। তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে মূল্যবৃদ্ধি যেটুকু হওয়ার কথা, বাস্তবে ঘটবে এর চেয়েও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে গণপরিবহণ ও পণ্য পরিবহণের ভাড়া। এ নিয়ে বাড়তে পারে গণমানুষের অসন্তোষ। চড়া মূল্যস্ফীতির পালে লাগবে আরও বেশি হাওয়া। পণ্যমূল্য বাড়ায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় ভোগের মাত্রা কমে যাবে। এসব মিলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় সব ধরনের উপকরণে আসবে বড় ধরনের ধাক্কা, যা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সাভারে মহাসড়ক অবরোধ: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সড়ক অবরোধ করেন তারা। এর আগে বেলা ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন শিক্ষার্থীরা। মহাসড়কে সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক তাসবিবুল গণি নিলয় বলেন, সরকার জনগণের ভোগান্তি কমানোর বিপরীতে মন্ত্রী, আমলাদের পকেট গরম করার জন্য কাজ করছে। দরিদ্র মানুষগুলো মূল্যবৃদ্ধির পর কীভাবে বাঁচবে তা সরকারের চিন্তার বিষয় নয়।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar