ব্যয় সংকোচন নীতিতে যাচ্ছে সরকার

যুদ্ধ সংকটে সতর্ক বাংলাদেশ

বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৭ মে ২০২২, ১১:১০

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতি। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি আর অর্থনৈতিক সংকটে অনেক দেশেই মিলছে না কাক্সিক্ষত নাগরিক সেবা। হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশেও বাড়ছে আমাদানীনির্ভর পণ্যমূল্য। সেইসঙ্গে কমছে ডলারের বিপরীতে টাকার মান। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক জোট। বিএনপিসহ দেশের বিরোধী দলগুলো এরইমধ্যে তেলসহ নিত্যপণ্য নাগালের বাইরে যাওয়ায় ক্ষমতাসীনদের কড়া সমালোচনা করে আসছে। শ্রীলংকা পরিস্থিতিও তুলে ধরে সরকারকে সতর্ক করা হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগ আমলে নেয়া হচ্ছে না। বরং বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে সংকট যাতে ঘণীভূত হতে না পারে সেলক্ষ্যে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে চলছে সরকার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে জনজীবনে যাতে বিরুপ প্রভাব পড়তে না পারে সেজন্য ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। টাকার শ্রাদ্ধ বাঁচাতে এরইমধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। অতি জরুরি ছাড়া নতুন প্রকল্প না নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নেয়া হয়েছে উদ্যোগ। সেইসঙ্গে দেশের জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিতব্যয়ী হওয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে কোনো অবস্থাতেই ঝুকিপূর্ণ না হয়, সেজন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সার্বক্ষণিক সব বিষয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, সম্ভাব্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ যে গতিতে বাড়ছে, তাতে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি আরো আগেই নেয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও তা নেয়া হচ্ছে। এটি দেশ ও অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সবুজ (স্বস্তিকর) অবস্থানে আছে। এটি ধীরে ধীরে হলুদ অবস্থানে (অস্বস্তিকর) যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাপানসহ প্রথাগতভাবে যারা কম সুদে ঋণ দিতো, তারাও এখন তুলনামূলক বেশি সুদ নিচ্ছে। সুতরাং স্বস্তির জায়গাটা কমে আসছে। এই অবস্থায় সরকারের সতর্ক হয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে লাগাম: বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর লাগাম টানা হয়েছে। গতকাল সোমবার এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখার এক পরিপত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সুনির্দিষ্ট করা হয়। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি, ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। পরিপত্রে বলা হয়, ‘অর্থ বিভাগের ১২ মে জারি করা পরিপত্রে বর্ণিত বিধিনিষেধ সব সংবিধিবদ্ধ, রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।’ আগের পরিপত্রে বলা হয়েছিল, কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বর্তমান বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের এক্সপোজার ভিজিট, স্টাডি ট্যুর, এপিএ ও ইনোভেশনের আওতাভুক্ত ভ্রমণ এবং ওয়ার্কশপ, সেমিনারে অংশগ্রহণসহ সব ধরনের বৈদেশিক ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার পূর্ব নির্ধারিত বিদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে।

আমদানি ব্যয় স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা: আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এরইমধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ঘাটতি ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গতকাল সোমবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৮০ পয়সা কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। একদিন আগেও এক ডলারে লেগেছিল ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। আর গত ১০ মে ছিল ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা এবং ২৭ এপ্রিল ছিল ৮৬ টাকা ২০ পয়সা। ব্যাংকগুলো নগদ ডলার বিক্রি করছে এর চেয়ে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি দরে। ব্যাংকের বাইরে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলার কেনাবেচা হচ্ছে ৯২ থেকে ৯৭ টাকায়। মহামারি করোনার প্রভাব আপাতত নেই। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ চাপ সামলাতে নানামূখী পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে সরকার।

বিলাসী পণ্যে এলসি মার্জিন: সারা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির উন্নতিতে অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার পর বাংলাদেশের রপ্তানি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আমদানি। রপ্তানির চেয়ে আমদানি ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। এতে চাপ পড়ছে রিজার্ভে। আর ডলার সংকটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এই মুদ্রার দাম যাচ্ছে বেড়ে। এতে খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেশে আনার ক্ষেত্রে খরচ বাড়ছে। এটিও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির একটি কারণ। তাই আমদানি ব্যয় কমাতে ইতোমধ্যে বিলাসী পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। গত ১১ এপ্রিল জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য সকল পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এলসি মার্জিন রাখার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে সে নির্দেশনায় পরিবর্তন এনে সব ধরনের গাড়ি, ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আমদানির এলসি খুলতে ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ নগদ মার্জিন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য সকল পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মার্জিন রাখতে বলা হয়েছে।

জরুরি ছাড়া বন্ধ প্রকল্প: যেসব প্রকল্পের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বিষয় রয়েছে এবং এখনই বাস্তবায়ন জরুরি নয় সেগুলো পরে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের যে সামগ্রিক অবস্থা, তা বিবেচনায় নিয়ে এসব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সারা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পর জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আগের চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হওয়ায় রিজার্ভে টান পড়েছে। তিনি বলেন, সময়ে সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমরা এতদিন যেভাবে চলছিলাম, সারা বিশ্বের যে অবস্থা, তাতে লাগাম টেনে ধরতে হচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

বিদেশ থেকে প্রাপ্ত আয় সংরক্ষণের নির্দেশনা: বিদেশ থেকে প্রাপ্ত আয় বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে। বর্তমানে বিদেশে সেবা সরবরাহের বিপরীতে আসা আয়ের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণ করা যায়। আইটি সেবা খাতের বিপরীতে প্রাপ্ত আয়ের ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য সেবা খাতে ৬০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণ করা যায়। সংরক্ষণযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবকে রপ্তানিকারকের রিটেনশন কোটা হিসাব নামে পরিচিত। সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে যে আয় আসবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ওই আয় বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে। তবে বিষয়টি অবশ্যই গ্রাহককে জানাতে হবে।

মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ: বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের জনগণকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের সাথে আলাকালে এই পরামর্শ দিয়ে বলেন, তেল-চিনি ডালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ৯০ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাড়লে দেশের কিছু করার থাকে না। এ কয়েকটি পণ্য বেসরকারি সেক্টর আমদানি করে চাহিদা পূরণ করছে। সরকার একটি অভিন্ন মূল্য পদ্ধতি অনুযায়ী কয়েকটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। বিশেষ করে আমদানি মূল্য, ট্যাক্স, জাহাজ ভাড়া, লাভ বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করে থাকে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, এজন্য এখন থেকে মানুষকে সাশ্রয়ী হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বর্জন করতে হবে।

অভ্যন্তরীন সিন্ডিকেটে বাড়তি সতর্কতা: আর্ন্তজাতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে আমদানী নির্ভর নয়  এমন বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্রেতাদের জিম্মি করে দেশে উৎপাদিত এসব নিত্যপণ্য আকাশচুস্মী দামে বিক্রি করছেন তারা। এনিয়ে সর্বসাধারণের মাঝে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। তবে সরকার এবিষয়েও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুর’ হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে, এজন্য সারা দেশে মিল পর্যায় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিশেষ মনিটরিং সেল নামানো হয়েছে। এরইমধ্যে কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং শুরু করেছে অধিদফতর। ভোক্তার সঙ্গে অনিয়মের জন্য অসাধূ ব্যবসায়ীদের ভোক্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar