ঈদকে ঘিরে বেপরোয়া ছিনতাইকারীরা

পলাতক সন্ত্রাসীরা সক্রিয়

বাড়ছে চুরি-ডাকাতিও


  • শাহীন করিম
  • ১২ এপ্রিল ২০২২, ১২:২৬,  আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২২, ১২:২৮

রাজধানীর শাহজাহানপুরে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু ও কলেজ শিক্ষার্থী সামিয়া আফনান প্রীতি হত্যাকাণ্ডের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির পাশাপাশি বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, ফ্রিডম মানিক, বিকাশ ও মোল্লা মাসুদের সম্পৃক্ততা মিলেছে। মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকার নবী হোসেন ও আর্মি আলমগীর এবং বাড্ডার মেহেদী বাহিনীর অপতত্পরতা-অপকর্ম থেমে নেই। পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থার (ইন্টারপোল) রেড নোটিশপ্রাপ্ত এসব পলাতক সন্ত্রাসীরা তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে বিদেশে বসেই এখনো ঢাকার অপরাধ জগত (আন্ডারওয়ার্ল্ড) নিয়ন্ত্রণ করছে। ঈদকে সামনে রেখে চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও মাদক কারবার চালিয়ে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠছে। কারাগারে থেকেও কিলার আব্বার মিরপুর-কাফরুল এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িত বলে অভিযোগ মিলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একইভাবে ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর সড়কে বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী চক্র। সুযোগ পেলেই ছোঁ মেরে মোবাইল ফোনসহ জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। ঢাকায় প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই, চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ায় খুনের ঘটনাও ঘটেছে। তিন দিন আগে ছিনতাইকারী চক্রের ২৭ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতার মাঝেও বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। পুলিশ বলছে, পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদকে ঘিরে প্রতিবছরই ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য বাড়ে। তাদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। আর বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দেশে অবস্থানকারী সহযোগীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ রয়েছে বলে গোয়েন্দারা জানান।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, দুবাই পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান বাহিনীর দেশীয় অস্ত্রধারীরা রাজধানীর মতিঝিল, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই তত্পর। জিসানের নামেই মহল্লায় মহল্লায় চলছে ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা। সমপ্রতি মতিঝিলে বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যাকাণ্ডে আলোচনায় এসেছে ইন্টারপোলের রেড নোটিশপ্রাপ্ত শীর্ষসন্ত্রাসী জিসান, বিকাশও ফ্রিডম মানিক বাহিনীর নাম। এই মুহূর্তে রামপুরা এলাকায় জিসান গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন মিজান। একসময় তিনি জিসানের বাসার কেয়ারটেকার ছিলেন। তিনি কারো কাছে মামা মিজান, অনেকের কাছে নেট মিজান হিসাবে পরিচিত। পলাতক এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চালাচ্ছে তাদের সহযোগীরা। ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠছে তারা। হুন্ডির মাধ্যমে সেই টাকা বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
একই সূত্র মতে, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও তেজগাঁও এলাকার এক সময়ের ত্রাস রেড নোটিশপ্রাপ্ত নবী হোসেন থাইল্যান্ডে ও আর্মি আলমগীর ভারতে অবস্থান করে সহযোগীদের মাধ্যমে চালাচ্ছে। এই চক্রের সদস্য জহির, সাইফুল ও রহমান ডিবির হাতে ধরা পড়েছেন। টার্গেট করা ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে তারা ফোনে কথা বলিয়ে দিতেন নবী ও আলমগীরের সঙ্গে। কিছুদিন আগে ডিপিসির প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েক ব্যক্তির কাছে চাঁদা দাবি করে এই চক্রের সদস্যরা। ২০০৭ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান ২০টির বেশি মামলার আসামি নবী ও আলমগীর।

আরেকটি সূত্র মতে, রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল, ক্যান্টনমেন্টন ও পল্লবী এলাকায় সহযোগীদের মাধ্যমে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ চাঁদাবাজি করছে কারাবন্দি সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস। এই গ্রুপের অনেকেই প্রকাশ্যে রয়েছে। প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক একটি কানেকশন রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। আমরা তা বের করার চেষ্টা করছি। এ জন্যই আগে ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দেশীয় সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেকটি সূত্র মতে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সক্রিয় রয়েছে এমন তিন শতাধিক ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই মাদকসেবী। তালিকা অনুযায়ী উত্তরা বিভাগে ৪২ জন, মিরপুর বিভাগে ৪৬ জন, গুলশান বিভাগে ৫৭ জন, রমনা বিভাগের ৭৬ জন, তেজগাঁও বিভাগের ৭২ জন ও ওয়ারী বিভাগে অর্ধশতাধিক ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। সূত্র মতে, ভোরে পুলিশি নিরাপত্তার ঢিলেঢালাভাব থাকার সুযোগটা নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। মধ্যরাত থেকে কোলাহলমুক্ত ভোরে বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইয়ের প্রতিবাদ করলে দুর্বৃত্তরা আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে। ছিনতাইকারীরা কখনো মোটরসাইকেল, কখনো প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস নিয়ে টার্গেট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন সেট, মূল্যবান সামগ্রী, ভ্যানিটি ব্যাগ, গলার চেন ছিনিয়ে নেয়। এদের মধ্যে ২০টির বেশি চক্র রয়েছে, যারা শুধু মোবাইল ফোন ছিনতাই করে। এসব মোবাইল সেট তারা আইএমই নাম্বার পরিবর্তন করে বিক্রি করে দেয়।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকা থেকে ৮৪৪টি ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশি সেবা চেয়েছেন। ফলে ঢাকায় মাসে ২৮১টি এবং দিনে ৯টি ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ৮৪৪টি ঘটনার মধ্যে ছিনতাই হয়েছে ২০৭টি ও চুরি-ডাকাতি ৬৩৭টি। এর মধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা জানুয়ারিতে ৭২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৭৩টি ও মার্চে ৬২টি। চুরি-ডাকাতি জানুয়ারিতে ২২০টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২১টি ও মার্চে ১৯৬টি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার ৫০টি থানার মধ্যে ছিনতাই ও চুরি-ডাকাতি বেশি ঘটেছে মোহাম্মদপুর থানায়-তিন মাসে ৭২টি। এর মধ্যে ছিনতাই ২৩টি, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা ৪৯টি। এরপরই ঘটছে পল্লবী থানা এলাকায়।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অ্যাডমিন অ্যান্ড ডিবি-দক্ষিণ) মো. মাহবুব আলম বলেন, রমজান ও ঈদকে ঘিরে সাধারণত অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এসব অপরাধীকে প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান চলছে। অনেক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তত্পর রয়েছে। এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, ছিনতাই-ডাকাতির মামলা নিতে যদি কোনো থানা অনীহা প্রকাশ করে তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডিএমপি কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আমরা ব্যবস্থাও নিচ্ছি। ছিনতাই বা ডাকাতি হওয়ার পরও কোনো থানা মামলা না নেয়ার অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।


poisha bazar


ads