রোজাকে ঘিরে বাজার গরম


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০২ এপ্রিল ২০২২, ১১:০৪

বাছির জামাল: রোজা শুরু হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। আজ চাঁদ দেখা গেলেই কাল থেকে শুরু হবে রোজা। কিন্তু এর আগেই অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। ইফতারে জনপ্রিয় একটি পদ বেগুনি তৈরিতে প্রয়োজন হয় বেগুনের। রোজা আসতে না আসতেই এক লাফে এই বেগুনের দাম বেড়ে রাজধানীর কোনো কোনো বাজারে কেজি বিক্রি হচ্ছে একশ টাকা। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এর কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে নতুন করে বেড়েছে মুরগির দাম। দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে খোলা সয়াবিন, খোলা পাম অয়েল। 

মাছ-মাংসের পাশাপাশি দাম বেড়েছে ইফতার ও সেহরিতে ব্যবহƒত নিত্যপণ্যের। গত কদিনে ডালের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। একই হারে বেড়েছে বেসনের দাম। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে চিনি, তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আগে থেকে চড়া দামে বিক্রি হওয়া চালের দাম রোজা শুরুর আগে আরো কিছুটা বেড়েছে। ফলে চালের বাড়তি দামে নাভিশ্বাস উঠেছে স্বল্প আয়ের মানুষের।

রোজায় যে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে উঠবে, তা জানিয়ে আগাম প্রতিবেদনও ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকী স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে রোজায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে সতর্ক করা হয়। এতে বলা হয়, পণ্য সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। দেশের বাজারে ঊর্ধ্বগতির এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে রমজান মাসে বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

নতুন করে মাংসের দাম বেড়েছে: গতকাল শুক্রবার বাজারে দেখা যায়, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭০০ টাকার নিচে কিনতে পারছে না ক্রেতারা। হাঁড় ছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি। কোথাও কোথাও হাঁড়সহ ৭৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। এদিকে গত সপ্তাহের ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি শুক্রবার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা। এছাড়া লেয়ার ২৬৫ ও কক মুরগি ৩৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে পিস প্রতি ৫০০, মাঝারি ৪৫০ ও ছোট মুরগি ৪০০ টাকায়।

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে দেশি মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ শতাংশ। আর ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৭ শতাংশের মতো। এদিকে ফার্মের মুরগির ডিমও গত সপ্তাহের মতো ১১০ থেকে ১১৫ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে।

বেগুনের কেজি ১০০ টাকা: রোজা শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে রাজধানীর বাজারগুলোতে বেড়ে গেছে বেগুনের দাম। একলাফে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে কোনো কোনো বাজারে বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে একশ’ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বেগুনের কেজি বিক্রি করছেন ৭০ থেকে ১০০ টাকা। গত সপ্তাহে এই বেগুনের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণত রোজার সময় বাজারে বেগুনের চাহিদা বেড়ে যায়, এবারো তেমনটি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাজধানীর গোপীবাগের সবজি বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ‘বাজারে এখন বেগুনের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ কম। এ কারণে বেগুনের দাম বেড়েছে।’

দাম বেড়েছে মসুর ডালের: ছোট দানা মসুর ডালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। গত সপ্তাহে এই ডাল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা কেজি দরে। শুক্রবার সেই একই মসুর ডাল ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করছেন না ব্যবসায়ীরা। গত তিন সপ্তাহ ধরে টানা এই পণ্যটির দাম বাড়ছে।

নতুন করে বেড়েছে খোলা সয়াবিনের দাম: বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম সামান্য কিছু কমলেও ভোক্তার জন্য তেমন কোনো সুখবর নেই সয়াবিন তেলের বাজারে। যদিও সয়াবিন তেলের উৎপাদন, খুচরা ও সর্বশেষ আমদানি পর্যায়ে সরকার মোট ৩০ শতাংশ কর ছাড় দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাজারে তেমন এর প্রভাব এখনো দেখা যায়নি।

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে,  প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৫৪ টাকা। গত সপ্তাহে এই সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৫৩ টাকা লিটার। আর পাম অয়েল (খোলা) ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে খোলা পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ১৩৫ থেকে ১৩৬ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করেছেন ৭৪০ থেকে ৭৬০ টাকা।

চিনি আগের মতোই ৮০ টাকা কেজি: এদিকে চিনি আমদানিতে শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু গত চার সপ্তাহ ধরে এর প্রভাব দেখা যায়নি বাজারে। আগের মতোই ৮০ টাকায় চিনির কেজি বিক্রি হচ্ছে।

সবজির দাম: ফুলকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিমের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা, শালগম (ওলকপি) ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মূলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। লালশাকের আঁটি ১০ থেকে ১৫ টাকা, পালংশাকের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। এদিকে সজনের ডাটা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। পাকা টমেটো ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পটোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঢেঁড়শ ৪০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। রোজায় লেবুর চাহিদা থাকায় হালিপ্রতি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪০-৮০ টাকায়।

৩০ টাকায় নেমেছে পেঁয়াজ: কিছুদিন আগে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম কমছে। খুচরা পর্যায়ে গত সপ্তাহে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া মুড়িকাটা পেঁয়াজের কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। আর ভালো মানের আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে।

অন্যান্য পণ্যের দাম: আলু ২০ টাকা, দেশি আদা ৯০-১০০, চায়না আদা ৮৫, চায়না রসুন ১০০, দেশি রসুন ৬০-৭০ ও শুকনা মরিচ ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।  মুগডাল ১২৫ টাকা, বুটের ডাল ৮০, অ্যাংকর ডাল ৫৫, ছোলা ৭৫-৮০ টাকা। এছাড়া মিনিকেট চাল ৫৫, নাজিরশাইল চাল ৭০ ও চিনি ৭৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

মাছের দাম চড়া: চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাছের বাজারও এখন চড়া। বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছের দোকানেই ভিড় বেশি। ছোট পাবদা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০, বড় পাবদা ৬০০,  গোলশা ৭০০, পোয়া মাছ ৬০০,  বাইম ৯০০, বাতাসি ৮০০, মলা ৫০০, কাঁচকি ৫০০-৬০০, শিং ৪৫০-৫০০ এবং গুঁড়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা কেজি দরে। রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৪৫০ টাকা। শিং ও টাকি মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। শোল মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকা। তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। ছোট ইলিশ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী: রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গরিবের মোটা চাল এখন বাজারে ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। মান অনুযায়ী মোটা চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মাসখানেক আগেও মোটা চালের কেজি ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা।

চিকন চালের দামেও আগুন। প্রতি কেজি চিকন চাল এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকায়। কিছুদিন আগেও এ চালের কেজি ছিল ৬৪ থেকে ৬৮ টাকা। আর মাসখানেক আগে ছিল ৬২ থেকে ৬৬ টাকা। এছাড়া মাঝারি মানের চালের কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা, যা মাসখানেক আগে ছিল ৫৪ থেকে ৫৬ টাকার মধ্যে।

চালের এ ঊর্ধ্বমূল্য নিয়ে খিলগাঁও তালতলার ব্যবসায়ী জানে আলম ভূঁইয়া বলেন, এক মাস ধরেই চালের বাজার বাড়তি। গত কদিনে চিকন চালের দাম আরো বেড়েছে। কিছুদিন আগে রশিদের মিনিকেট ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৬০০ টাকা বিক্রি করেছি। এখন তা বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কেজিতে দাম দুই টাকা বেড়েছে। অন্যান্য কোম্পানির মিনিকেট চালের দামও বেড়েছে। তবে গত কদিনে মোটা ও মাঝারি চালের দাম নতুন করে বাড়েনি।

খেজুরের দামও বাড়তি: দুয়ারে রোজার মাস কড়া নাড়ায় ইফতারির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ খেজুরের দামও নতুন করে বেড়েছে। গত কদিনে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে খেজুরের দাম। মান অনুযায়ী, খেজুরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।

খেজুরের দাম বাড়ার বিষয়ে বাদামতলীর ব্যবসায়ী মো. শামছুল আলম বলেন, রোজার কারণে খেজুরের দাম একটু বাড়তি। এক মাস ধরেই খেজুরের দাম বাড়ছে। গত কদিনে কেজিতে আরো ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। ১০-১৫ রোজা পর্যন্ত খেজুরের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। ১৫ রোজার পর দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এআই


poisha bazar


ads