উস্কানিদাতারা গোয়েন্দা নজরে

পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুরের হোতারা শনাক্ত

ফাইল ছবি

  • শাহীন করিম
  • ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩১

কুমিল্লা শহরের একটি মন্দিরে পবিত্র কোরআন শরীফ অবমাননার অভিযোগকে ঘিরে দেশের কয়েকটি জেলায় মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়ি-দোকানপাটে হামলার ঘটনায় পেছনে থেকে উস্কানিদাতা অশুভশক্তিদের শনাক্ত করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এক্ষেত্রে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ছাড়াও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে। ওই ইস্যুকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারী কিছু উস্কানিদাতা ইতোমধ্যেই শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া যেসব ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কুমিল্লার ঘটনার রেশ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করা হচ্ছে। এসব ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে। প্রাপ্ত পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই শেষে শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে গত বুধবার ভোরে কুমিল্লার নানুয়ার দীঘিরপাড় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনার সুযোগ নিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টের চেষ্টার নেপথ্যের হোতাদের কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে থানা পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দারা। তাদের উস্কানিতে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলাকারী ও নেতৃত্বদানকারী প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামের জেএম সেন হলে পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনায় ৮৩ জনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ।

তাদের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার রাতে সেখানে মামলা হয়েছে। চট্টগ্রামে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। যাতে আসামি করা হয়েছে ১ হাজার জনের বেশি। অন্যদিকে রাজধানীর কাকরাইলে শুক্রবার দায়িত্বরত পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষের ঘটনায় ৩টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪ হাজার জনের বেশি। পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে রমনা, পল্টন ও চকবাজার থানায় এ মামলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এ ঘটনার রেশ আরো কয়েকদিন থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন গোয়েন্দারা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে চলতি সপ্তাহের পুরোটাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশনায় আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পুুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তার দাবি, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য মতে, কুমিল্লার যে ঘটনা তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অশান্ত করার প্লট সাজানো হয়েছে তার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকার তথ্য মিলেছে। তবে এসব তথ্য আরো যাচাই-বাছাই চলছে। এ ছাড়া কুমিল্লা ও গাজীপুরের মন্দিরে হামলাকারীরা স্থানীয় নন। নিজেদের পরিচয় গোপন করতেই বাইরে থেকে এসে মুখোশ পরিহিত অবস্থায় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

সূত্র মতে, কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে যে কয়েকটি এলাকায় এখন পর্যন্ত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বেশি। ছদ্মবেশে যারা ধর্মভিত্তিক দলগুলোর হয়ে কাজ করছে, অনেকের সঙ্গে তাদেরও সন্দেহের তালিকায় রেখে তদন্ত চলছে।

ঊর্ধ্বতন একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ফেসবুক ও ইউটিউবে ভুল তথ্য দিয়ে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়ানো তিন শতাধিক আইডি বন্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দিয়েছে পুলিশসহ একাধিক সংস্থা। কুমিল্লার ঘটনার পর বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এসব আইডি শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ফেসবুক ও ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুক্রবার পর্যন্ত দুইশ আইডি বন্ধ করেছে বিটিআরসি।

পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, কুমিল্লায় সৃষ্ট ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ছিল। এ ঘটনায় মাঠপর্যায়ে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে বলা হয়। একইসঙ্গে দুটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে সর্বশেষ শুক্রবার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, যারা নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রেখেছিল তাদের ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। এখনই এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না। বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনায় জড়িয়েছে একটি চক্র। জড়িতদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা অতীতেও একই ধরনের ঘটনায় জড়িত ছিল। শিগগিরই কয়েকজনকে গ্রেফতার হতে পারে।

কী ঘটেছিলো কুমিল্লার পূজামণ্ডপে:
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত বুধবার ভোরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর আসে যে কুমিল্লার নানুয়ারদীঘির পূজামণ্ডপের ভেতরে প্রতিমার পায়ের কাছে একটি পবিত্র কোরআন শরীফ রাখা আছে। খবর পেয়েই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পুলিশ সেখান থেকে কোরআন নিয়ে আসেন। এদিন সকাল ১০টার দিকে এ সংক্রান্ত একটি ছবি ব্যাপকভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে থাকে, যেখানে দেখা যায় প্রতিমার হাঁটুর কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না। অনেকে এটি দিয়ে নানা ধরনের লাইভ বক্তব্য দিয়ে কোরআন অবমাননার বিষয়টি তুলে ধরেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ কোরআন অবমাননা হয়েছেÑ এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। খবর পেয়ে কয়েকটি মাদ্রাসার লোকজন ছাড়াও স্থানীয় অনেকে প্রতিবাদ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে ওই পূজামণ্ডপসহ আশপাশের মণ্ডপগুলোতে হামলা করা শুরু হয়। এর পরই বিক্ষুদ্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। ঘটনার পর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোরআন অবমাননা করা হয়েছে দাবি করে  প্রচার শুরু হয় এবং অনেকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অনেকে ফেসবুকে সরাসরি স¤প্রচার করেন। এর জেরে পরবর্তীতে দেশের কিছু জায়গায় বিক্ষুব্ধ হন ধর্মপ্রাণ মুসলমান।

এদিকে চট্টগ্রামে প্রেস ক্লাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত জানান, দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসবের বাইরে ৩০টি বাড়ি এবং ৫০টি দোকানেও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে।


poisha bazar

ads
ads