২৮ প্রকল্পের ২১টির মেয়াদ পার


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৮,  আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৬:২৫

শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। দেশের ১ হাজার ৮০০টি মাদ্রাসার উন্নয়নে নেয়া এই প্রকল্পটির মেয়াদ গত জুন মাসে শেষ হয়েছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রকল্পটি সংশোধন করে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

শুধু এই প্রকল্পটিই নয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় চলমান ১১টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টির কাজ শেষ হয়নি নির্ধারিত মেয়াদে। একই অবস্থা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতাধীন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রকল্পেও। এই বিভাগের চলমান ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ১৩টির। কিন্তু বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫০ শতাংশেরও কম।   

জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনেও শিক্ষার প্রকল্পগুলোর ধীরগতির বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ৫টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি শূন্য বলে জানানো হয়েছে। সংসদীয় বৈঠকের কার্যপত্রে দেখা গেছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতার ১১টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টির মেয়াদকাল শেষ হলেও অগ্রগতি খুবই কম। এসব প্রকল্পের মধ্যে ৬টির অগ্রগতি ২০ শতাংশেরও কম। একটির অগ্রগতি মাত্র ৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ অগ্রগতি হওয়া দুটি প্রকল্পের অগ্রগতি যথাক্রমে ৬৫ ও ৮০ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ বিভাগের একটি প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শূন্য শতাংশ। অর্থাত্ গত দেড় বছরে প্রকল্পটির কোনো কাজই সম্পাদন করা হয়নি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতাধীন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফরের চলমান ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩টি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এগুলো বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পে মেয়াদের পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, চলমান ১৭টি প্রকল্পেও মধ্যে ৮টির অগ্রগতি ২৫ শতাংশের কম। ৩টির অগ্রগতি ৫০ শতাংশের কম। বাকি ৬টির অগ্রগতি ৫০ শতাংশের কিছু বেশি।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ অবশ্য তাদের বড় একটি প্রকল্পের কম অগ্রগতির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে তারা বলেছে, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ১ হাজার ৮০০ মাদ্রাসা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ থাকলেও তালিকাভুক্ত ছিল ১ হাজার ৭২১টি। পরে প্রকল্পে আরো ৩৩টি মাদ্রাসার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব মাদ্রাসার উন্নয়নে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। এতে নন-এমপিও ১৯টি মাদ্রাসাকেও তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে সেগুলোকে প্রকল্প থেকে বাদ দেয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ধরা হলেও প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প কাজ সম্পন্ন করা যায়নি।

তবে তাদের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি সংসদীয় কমিটি। কমিটি মনে করে, প্রকল্পের সমীক্ষা, সক্ষমতা যাচাই, প্রাক্কলন এসব বিষয়ে ঘাটতি থাকায় বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। কমিটির মতে, প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর বেশির ভাগ প্রকল্পের প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। সমীক্ষা, জমি অধিগ্রহণ, কারিগরি নকশার কাজ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। তা না হলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে, সময়ও বেশি লাগবে।

এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবদুস শহীদ মানবকণ্ঠকে বলেন, বেশির ভাগ প্রকল্পেরই বাস্তবায়ন অগ্রগতি খুবই ধীর। কিছু প্রকল্পে দেখা গেছে, আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি একই রকম। এটা হওয়ার কথা নয়। কমিটি মনে করে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরো মনোযোগী হওয়া দরকার। একই সঙ্গে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তদারকি আরো শক্তিশালী করা দরকার।

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ হিসেবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্¿ণালয় করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতির কথা তুলেছে। তবে প্রকল্পের সমীক্ষা, সক্ষমতা যাচাই, প্রাক্কলন এসব বিষয় যদি ঠিকমতো হয়, তবে বাস্তবায়ন সহজ হয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনেও শিক্ষার প্রকল্পগুলোর ধীরগতির বিষয়টি উঠে এসেছে। আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ৫টি প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে—‘২৩ জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্প। এই প্রকল্পে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। একই অবস্থা ‘চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পেরও। এই প্রকল্পটির অনুকূলে বরাদ্দ ছিল ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি শূন্যই রয়েছে।

‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অব ৬৪ টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ আন্ডার ডিপার্টমেন্ট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন’ শীর্ষক প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ব্যয় হয়েছে এক কোটি ১৯ লাখ টাকা। বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। ‘ডেভেলপমেন্ট অব ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফর ক্রিয়েটিং ফ্যাসিলিটিজ ইন এগজিস্টিং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডিশনাল স্টুডেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ শীর্ষক প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৯ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে এক কোটি ১৬ লাখ টাকা। ‘সিলেট, বরিশাল, রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ ছিল ৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

 এই দুটি প্রকল্পেরও বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। প্রকল্পে এমন ধীরগতির বিষয়ে বৃহত্ প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মানবকণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে কিছু কাজ ব্যাহত হয়েছে এটি ঠিক। কিন্তু মূল সমস্যা হলো প্রস্তুতি ছাড়াই প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়। প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর বেশিরভাগ প্রকল্পের প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। সমীক্ষা, জমি অধিগ্রহণ, কারিগরি নকশার কাজ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। তা না হলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে, সময়ও বেশি লাগবে।


poisha bazar

ads
ads