টেলিটক ডুবিয়েছে কর্তারাই!


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৪ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১৫,  আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২১, ১৪:২৫

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল ফোন অপারেটর ‘টেলিটক’ গ্রাহককুলে জায়গা পাচ্ছে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক যেখানে কয়েক কোটি সেখানে একমাত্র দেশীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটক যেতে পেরেছে মাত্র ৬০ লাখ গ্রাহকের ঘরে। এ তো শুধু সিমকার্ড বিক্রির কথা। সেবার ক্ষেত্রেও সবার পেছনেই অবস্থান করছে জনগণের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি। অন্যসব অপারেটর যেখানে ফোর-জি, ফাইভ-জির উন্মাদনায় গ্রাহকদের মাতিয়ে তুলছে সেখানে টেলিটকের গতি টু-জি, থ্রি-জি অতিক্রম করতে পারছে না। এছাড়া, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সুযোগ দেয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি দেশীয় একমাত্র এই মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠানের ভগ্নদশায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কমিটি মনে করে, প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তাদের খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের জড়িয়ে পড়ার কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতটিতে দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এর ভবিষ্যৎ।

এদিকে সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক নিরীক্ষা অধিদফতর ডুবতে বসা টেলিটকের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে পরিচালনার সঙ্গে জড়িতদের অনিয়মই খুঁজে পেয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, জন্মের পর মাত্র দুবার টেলিটক সীমিত লাভ করতে পেরেছে। এরপর বছরের পর বছর গেলেও প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখা তো দূরে থাক, টিকে থাকতেই পারছে না। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোবাইল কমিউনিকেশন্স মার্কেট সম্পর্কে টেলিটকের সম্যক জ্ঞানের ঘাটতি, মার্কেটে প্রতিযোগিতার ধরন, সাফল্যের প্রতিবন্ধকতা, ঝুঁকির মাত্রা এবং উদ্দেশ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় অর্থ, জনসম্পদ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বিশেষণের ঘাটতি, সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী না করাটাই অনেকাংশে দায়ী করা হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে কমিটির সদস্য আবুল কালাম আজাদ, মো. আব্দুস শহীদ, মো. শহীদুজ্জামান সরকার, আহসানুল ইসলাম (টিটু), মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ এবং ওয়াসিকা আয়শা খান অংশগ্রহণ করেন। ডেপুটি মহাহিসাব রক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, বিটিআরসির কমিশনার, টেলিটকের এমডিসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

কমিটির সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী এ বিষয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠার ১০ বছর অতিবাহিত হলেও টেলিটকের উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রস্তুত না করায় প্রতিষ্ঠানটি ডুবতে বসেছে। এতে রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটির যে ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা জরুরি। কমিটি মন্ত্রণালয়কে বলেছে ক্ষতির কারণ চিহ্নিত করতে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে সময়োপযোগী ও কার্যকরী করে গড়ে তুলে টেলিটককে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মোবাইল টেলিকমিউনিকেশনে প্রবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে গ্রাহক বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে টেলিটকের গ্রাহকসেবা বৃদ্ধি এবং ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চালু করার বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়েছে বৈঠকে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত নীরিক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিবেদনটিতে টেলিটকের এই ভগ্নদশার কারণ এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বেশকিছু পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। অনিয়মের কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার অভাব। কর্মকর্তারা দায়সারাভাবে কাজ করছেন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। যে কারণে প্রতিযোগিতামলূক বাজারে টিকতে না পারায় অনেকটা ছিটকে পড়েছে টেলিটক।

অন্য কারণগুলো হচ্ছে— বোর্ড সদস্য নিয়োগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকা, মানবসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালা না থাকা, রাজস্ব অর্জন, ব্যয় সংকোচন ও মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা না থাকা, বাজার গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা না করা এবং কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষ গবেষক দল না থাকা, সমন্বিত ব্যাপক বিপণন কৌশলের অভাব, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে গ্রাহক সেবা কেন্দ্র স্থাপনে পরিচালনা বোর্ডের দেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা, দুর্বল ও অপ্রতুল নেটওয়ার্ক কভারেজ, গ্রাহক চাহিদা জরিপে ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতা এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা।

মূলত প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির লক্ষ্যে দায়িত্বশীলরা যথাযথ ভূমিকাই পালন করেননি। যে কারণে টেলিটক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সাধনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া টেলিকমিউনিকেশন্স মার্কেটের গতি প্রকৃতি ও গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা, গ্রাহকদের চাহিদা ও সেবা প্রদানে ব্যর্থতা, প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য মোবাইল অপারেটরগুলো যেভাবে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রাখতে না পারাটাও টেলিটকের এই অবস্থার জন্য দায়ী।

উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বেশকিছু পরামর্শও দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবলের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র বাজার গবেষণা ইউনিট সৃষ্টি করা এবং অতিদ্রুত বাজার গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, জরুরিভাবে একটি সুনির্দিষ্ট জনসচেতনতামূলক কৌশলপত্র ও এর প্রয়োগগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গ্রাহক সেবাকেন্দ্র স্থাপনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এসব সেবাকেন্দ্রের অবস্থান প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে দৃশ্যমান করা, নিয়মিত গ্রাহক সন্তুষ্টি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা, টেলিটক থেকে অন্য অপারেটরে কলচার্জ কমানো এবং টেলিটক পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক অবৈধ ভিওআইপির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনেও। জাতীয় পার্টির এমপি পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ সংসদে অভিযোগটি উত্থাপন করে বিভিন্ন এলাকায় টেলিটকের সিম ব্যবহার ভিওআইপি ব্যবসা পরিচালনা হচ্ছে জানান। এর সাথে টেলিটকের অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ তুলে এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর কাছে তিনি বিবৃতিও দাবি করেন।



poisha bazar

ads
ads