চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী হিমশিম খাচ্ছেন


  • সেলিম আহমেদ
  • ৩০ জুলাই ২০২১, ০৭:৪৫

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চাপে রাজধানীসহ দেশের জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন হিমশিম খাচ্ছেন। অধিকাংশ হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার থেকে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ায় নতুন করে আর ভর্তি নেয়া হচ্ছে না। কিছু কিছু হাসপাতালে একদম মুমূর্ষু রোগী ভর্তি ছাড়া মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় আছেন এমন রোগীদের ভর্তি না করে চিকিৎসাপত্র দিয়ে বিদায় করা হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বজনরা ঢাকায় এনে ভর্তির জন্য ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। একই অবস্থা বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও। শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি করাতে না পারায় অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন।

করোনা বিশেষায়িত একাধিক হাসপাতালের পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিস্থিতি দিন দিন চরম অবনতির দিকে যাওয়ায় সব হাসপাতালেই বাড়ছে রোগীর চাপ। শয্যা বাড়িয়েও কূল-কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক হাসপাতালে নতুন শয্যার জন্য জায়গায়ও নেই। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) দূরের করা, সাধারণ শয্যা পাওয়াও এখন ভাগ্যের ব্যাপার। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীদের জীবন রক্ষা করতে পারছেন না।

সরেজমিনে গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের প্রবেশ পথ দিয়ে একের পর এক ঢুকছে অ্যাম্বুলেন্স। বেশিরভাগ মুমূর্ষু রোগী আসছেন ঢাকার বাইরে থেকে। রোগীদের স্বজনরা হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করতে এদিকে-সেদিকে ছোটাছুটি করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর গতকাল জানায়, রাজধানীর করোনা বিশেষায়িত সরকারি ১৬টি হাসপাতালে ৩ হাজার ৮৩৮টি শয্যার মধ্যে ফাঁকা আছে মাত্র ১ হাজার ৯৯টি। এর মধ্যে নির্ধারিত আসনের থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৬৩ জন ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি বড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাতে গোনা ৮-১০টি করে শয্যা খালি করেছে। এই ১৬ হাসপাতালের মধ্যে ১৩টি হাসপাতালে রয়েছে আইসিইউ। ৩৮১টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি আছে মাত্র ১৬টি। ৮টি হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা খালি নেই। এখন জেনারেল বেড সংকটের কারণেও রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিচ্ছে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় হাসপাতালগুলো।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড বেড রয়েছে ৭০৫টি, সেখানে ভর্তি ছিলেন ৭১১ জন। অতিরিক্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ৬ জন।

হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, রোগী যে হারে আসছে, তাতে সব রোগী আমরা ভর্তি করতে পারছি না। কারণ করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। আমাদের অক্সিজেন সংযোগসহ বেড রয়েছে ৭৫০টি। যে অতিরিক্ত রোগীরা ভর্তি আছে তাদের অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়া আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে রোগী রিলিজ না হলে আমরা আর নতুন রোগী ভর্তি করতে পারছি না।

তিনি বলেন, জেনারেল বেডের পাশাপাশি আইসিইউয়ের জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন দ্রুত বিএসএমএমইউ এর বেডের ১০০০ ফিল্ড হাসপাতাল চালু করলে হয়তো মানুষ কিছুটা উপকৃত হবে। তবে যে হারে রোগী বাড়ছে তাতে হাজার হাজার বেড প্রয়োজন। সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পারলে হাসপাতালে বেড বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামলানো যাবে না। দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বেড সংকটের কারণে রোগী ভর্তি নিচ্ছে না হাসপাতালটি। গত মঙ্গলবার থেকে অধিকাংশ রোগীকে ভর্তির জন্য হাসপাতালে এসে ফিরে যেতে হয়েছে।

মুগদা হাসপাতালের পরিচালক ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, গত কয়েকদিন থেকে রোগীর চাপ বেড়েছে, মঙ্গলবার থেকে নতুন রোগী ভর্তি করা কঠিন হয়ে গেছে। প্রতিদিন আমরা রিলিজ দিতে পারি ৩০-৪০ জন রোগী। কিন্তু ভর্তির জন্য শতাধিক রোগী আসছে। বেড খালি না থাকায় রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। জুলাই মাসের শুরু থেকেই বেডের তুলনায় অতিরিক্ত ৩০-৪০ জন রোগী ভর্তি করে রেখেছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এখন অতিরিক্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। গতকাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে কোভিড ডেডিকেটেড ২৭৫ বেডের বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিল ৩৩৮ জন। কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালেও মাত্র ৩টি শয্যা খালি আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, এখন পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তা সামাল দেয়ার জন্য প্রত্যেক হাসপাতালে বেড বাড়াতে হবে, অক্সিজেন-আইসিইউ বাড়াতে হবে, দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ দিতে হবে এবং আরো ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করতে হবে। ভারতের মতো সেই অবস্থা যদি আমাদের দেশে হয় তাহলে সামাল দিতে পারব না। তাই আগে থেকেই সব হাসপাতালে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কী অবস্থা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতাল এখন রোগীতে পরিপূর্ণ। তাই এখানে ফিল্ড হাসপাতাল চালু করা হচ্ছে। শিগগিরই রোগী ভর্তি শুরু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা শয্যা সংখ্যা বাড়িয়েছি, ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির প্রক্রিয়া চলমান আছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালেও শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোই মহামারী মোকাবিলার একমাত্র পথ নয়। সংক্রমণের যে শৃঙ্খল আছে সে শৃঙ্খলটি ভেঙে দিতে হবে। মানুষের কাছ থেকে মানুষের মধ্যে যদি সংক্রমণ না ছড়ায় তা হলেই হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।



poisha bazar

ads
ads