এনআইডি নিয়ে ‘যুক্তি যুদ্ধ’ করতে চায় নির্বাচন কমিশন


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৪ জুন ২০২১, ১১:৩২

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের দায়িত্বে নেয়ার উদ্যোগে ‘যুক্তির যুদ্ধে’ অবতীর্ণ হতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিজেদের হাতে গড়া জনসম্পৃক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগটি কোনোক্রমেই হাতছাড়া করতে চায় না দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত এই সাংবিধানিক সংস্থাটি।

ইসি কর্তৃপক্ষ মনে করে, প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া মানেই বিষয়টির নিষ্পত্তি নয়। এটি শুধু চেয়ার, টেবিল নয় যে বললেই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এত বড় একটি বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার আগে অবশ্যই ইসির সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।

অবশ্য নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে এ সেবা বিভাগটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে সরকার। ইসির সব ধরনের যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে নতুন করে আবারো তাগাদাপত্র দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি নেয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের কারোরই এনিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।

এদিকে নতুন দায়িত্ব পেয়ে খুশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, এনআইডি সেবা কার্যক্রম স্বরাষ্ট্রের সুরক্ষা সেবা বিভাগে আসায় খুবই ভালো হয়েছে। এটি এখন যথাস্থানে আসছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন কার্যক্রমের দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কাছে ন্যস্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে গত মাসে চিঠি দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব স্বাক্ষরিত ‘জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে সুরক্ষা সেবা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্তকরণ’ শিরোনামে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘১৭ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাঠানো পত্রের আলোকে সরকার জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম আইনানুগভাবে নির্বাচন কমিশন হতে সুরক্ষা সেবা বিভাগে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এমতাবস্থায়, নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এ চিঠি পাওয়ার পরই সরকারের এ সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করে নির্বাচন কমিশন। এ সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে গত ৮ জুন জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রম নিজেদের কাছে রাখার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠনো হয়। চিঠিতে এনআইডির কাজ অন্য বিভাগে গেলে ভোটার তালিকা করা ও তা হালনাগাদ, নির্বাচনসহ বিভিন্ন সমস্যা হবে বলে জানায় ইসি। এটি সংবিধানবিরোধী বলেও দাবি করা হয় কমিশনের পক্ষ থেকে। কিন্তু এতসবের পরও আগের সিদ্ধান্তেই অটল থেকে এনআইডি সেবা কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দিতে গত ২০ জুন ইসিকে তাগাদাপত্র দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব শফিউল আজিম স্বাক্ষরিত চিঠিটি ইসি সচিবকে পাঠানো হয়।

ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের বুঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু কমিশনের কোনো কথাই সরকার কর্ণপাত করেনি। এতে নির্বাচন পরিচালনাসহ কমিশনের অন্যান্য কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে। তবে তারা এখনো আশা করছেন, সরকার কমিশনের যুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাও আশাবাদী সরকারের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করলে তারা বিষয়টি নিশ্চয়ই বুঝবেন।

বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি এনিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা টেবিল-চেয়ার না যে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম। এটা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। সেখানে আমাদের আরো যে যুক্তি আছে সেগুলো তুলে ধরব। এরপর সরকার কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে না নেবে এটা পরের কথা।’

হস্তান্তরের প্রজ্ঞাপন হলেও আলোচনার সুযোগ থাকছে কি-না এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ‘থাকছে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান তো এটা। কীভাবে নেবে, না নেবে এ বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। আমি বলেছি অনেকবার যে, কমিশন চায় এনআইডি আমাদের কাছে থাকুক।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবশ্যই কিছু যুক্তি আছে। আমাদেরও কিছু যুক্তি আছে, এগুলো নিয়ে ডায়লগ হবে। তাদের বক্তব্য হলো- এই সেবা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকে না এবং সেই যুক্তিটা ঠিক। আর আমাদের যুক্তি হলো- এই কাজটা আমাদের অনেক পরিশ্রমের ফসল। এই কাজটা করার জন্য আমাদের কয়েক হাজার নিবেদিত কর্মী তৈরি হয়েছে এবং তারা অত্যন্ত প্রফেশনাল। এতদিনের ভুল-ভ্রান্তি শেষে সব পেরিয়ে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তি সম্পন্ন কাজ তারা তৈরি করতে পেরেছে। এটার জন্য নির্বাচন কমিশন গর্ববোধ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলেছিলাম যে, এতগুলো লোক আবার তৈরি করা, আবার ১২ বছর ঘুরে অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের পক্ষে সম্ভব না। তাদের যুক্তি হলো- সরকারের জিনিস তারা নিয়ে যাবে। তোমরা তো সরকার না। আমরা বলি, আমরা সরকার না কিন্তু সরকারের যখন যা দরকার হয়, আমরা সরকারের সেসব সেবা দিতে পারি।’

এনআইডি সেবা চলে গেলে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অসুবিধা হবে। নিশ্চয়ই সচিব পর্যায়ে এ বিষয়ে কথাবার্তা হবে। আমাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো তাদের জানাব।’

নির্বাচন কমিশন থেকে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে একটি চিঠি দেয়া হয়েছিল তার উত্তরে তারা কী বলেছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘তারা শুধু বলেছেন যে আগের সিদ্ধান্তেই আছেন। এটার ওপর অনেক কাজ। আমাদের সঙ্গে উনারা বসবেন, অবকাঠামো নিয়ে হিসাবপত্র আছে সেগুলো নিয়ে প্রক্রিয়া আছে তার ওপর সিদ্ধান্ত হবে। আমরা তো আমাদের অবস্থান অনেক আগেই বলেছি।’

সিইসি বলেন, ‘সরকারের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে চ‚ড়ান্ত হয়েছে এরকম বলা যায় না। তারা নিতে চায়, আমরা দেব না এ রকমও বলা যায় না। সে রকম অবস্থানে আমরা নেই। আমাদের বসতে হবে তাদের সঙ্গে এটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কথা। বসে আমাদের যে অবস্থান আছে সেটা তাদেরকে বুঝাবো, সিদ্ধান্ত কী হবে তখনকার টা তখন দেখা যাবে। এখন তো আগেই বলা যাবে না।’

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কমিশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেবিনেট তো আমাদের কাছে উচ্চ পর্যায়। কেবিনেট থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। তাদেরকে আমরা উত্তর দিয়েছি। আমরা এই পর্যায়ে আছি। তারা যদি এ বিষয়ে আমাদের কাছে মতামত অথবা পরামর্শ বা তারা কী করতে চায় সেটা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের সচিবের সঙ্গে বসে তখন আমাদের বক্তব্য তুলে ধরা হবে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এলে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এনআইডি সেবা এখন যথাস্থানে আসছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এনআইডি নিয়ে যেসব কথা হচ্ছে তা অবান্তর। আমরা জেনেবুঝেই এনআইডি সেবাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনছি। এখানে সবার মতামত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেয়া হয়েছে।

 



poisha bazar

ads
ads